ভাষান্তর করেছেন: এম. হাসান
বারো দিন ধরে ইসরায়েল ও ইরান এমন এক যুদ্ধে লিপ্ত ছিল যা মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের অনেক ধারণাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। যদিও কোনো পক্ষই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি, ইরান এই সংঘর্ষ থেকে নেতৃত্ব অটুট রেখে এবং আঞ্চলিক মর্যাদা বাড়িয়ে বের হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, তেহরানের কৌশলবিদেরা এখন পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ (nuclear enrichment) আবার শুরু করার পরিকল্পনা করছেন বলে জানা যাচ্ছে। তারা কীভাবে নতুন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাবে বা আরেকটি আগ্রাসনের পর্ব এড়াবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তাদের দৃঢ় সংকল্প পরিষ্কার।
### “নীতি বদলাবে”, ইঙ্গিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ;
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি কাতারের আল-আরাবি আল-জাদিদকে বলেছেন যে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক অ-প্রসারণ কাঠামো (NPT) বিষয়ে “নীতিগত পরিবর্তন দেখা যাবে”। যদিও সংঘর্ষের প্রথম দিনেই ইরানের একাধিক জেনারেল এবং শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হন, তবুও কমান্ড কাঠামো অক্ষত রয়েছে এবং যেই সরকারকে ইসরায়েল ও পশ্চিমা দেশগুলো উৎখাত করতে চেয়েছিল, সেটি এখনো ক্ষমতায়। এরই মধ্যে, ইরানের পার্লামেন্ট বুধবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) সাথে সহযোগিতা স্থগিত করার বিল পাস করেছে এবং সেটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য গার্ডিয়ান কাউন্সিলে পাঠিয়েছে। ইরানের দৃষ্টিতে এই সংঘর্ষের ফলাফল এক “টেকসই গর্ব, শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক” বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক কোর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসউদ আসলাম মনে করেন, “ইরান যে ফলাফল অর্জন করেছে, সেটিই সম্ভবত তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো ছিল”। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তায় এবং আমেরিকার ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমা হামলার সহায়তায় নাতাঞ্জ, ফোর্দো ও ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানে। লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামো ধ্বংস, বৈজ্ঞানিক ও সামরিক নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করে সরকার পতনের পথ তৈরি করা। কিন্তু সাফল্য কতটা? স্যাটেলাইট চিত্র থেকে বোঝা গেছে, হামলা হয়তো কয়েক মাসের জন্য সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বিলম্বিত করতে পারে, তবে তা স্থায়ীভাবে থামাতে পারবে না — যা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
### ইরানের পাল্টা আঘাত :
যদিও প্রথম দিনেই ইরান অনেক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাকে হারায়, দেশটির সামরিক কাঠামো গুঁড়িয়ে যায়নি। ইরান শুধু ধাক্কা সামলেছে তা নয়, বরং তাদের ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী ৪০টিরও বেশি পাল্টা হামলা চালিয়েছে।ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকার করেন, “ইসরায়েল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে… ঐ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অনেক ভবন ধ্বংস করেছে।”হারেৎজ-এর সাবেক সম্পাদক আভি স্কার্ফের মতে, “যুক্তরাষ্ট্র ১২ দিনে এক বছরের সমপরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে,” এবং ইসরায়েলের নিজস্ব প্রতিরক্ষা স্টকও “শেষের পথে”। কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে হামলা ও ইসরায়েলে ভয়াবহ ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, বিশেষ করে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার জন্য তার ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছিল। ইসরায়েল, বিকল্প না পেয়ে, এই যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়। ইরান, আগেই বলেছিল আত্মরক্ষার্থে প্রতিশোধ নিচ্ছে — এবার তাদের বাহিনীও সরে দাঁড়ায়।
## সামনে কী আছে? :
যদিও যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর, তবে এই শান্তি অত্যন্ত ভঙ্গুর। ইরানি পার্লামেন্ট ইতোমধ্যে তথাকথিত “শান্তিপূর্ণ” পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার দিকে এগোচ্ছে, IAEA-এর পরিদর্শন স্থগিত করেছে এবং গোপনে সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার আভাস দিচ্ছে।এমনকি এনপিটি (NPT) থেকে সরে যাওয়ার কথাও এখন ক্রমশ জোরালোভাবে আলোচনায় আসছে।
IAEA-এর ভাষ্যতেও বিভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে। একদিকে সংস্থাটি বলছে, তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কোনো বাইরের চিহ্ন নেই, আবার অন্যদিকে সংস্থার প্রধান “গুরুতর ক্ষতির সম্ভাবনা” উল্লেখ করে পরিদর্শনের উপর জোর দিয়েছেন। যা এই কর্মসূচির ‘শান্তিপূর্ণ’ চরিত্রে সন্দেহ উসকে দিচ্ছে। ইরানের এই আগ্রাসী কৌশল সৌদি আরব ও তুরস্ককেও পারমাণবিক অস্ত্রের পথে ঠেলে দিতে পারে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর আর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারবে না।
ইসরায়েল, যে ইরানকে আবার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেখতে চায় না, গোপন অপারেশন বা সরাসরি হামলার মাধ্যমে আবারও সমৃদ্ধকরণ বন্ধের চেষ্টা করতে পারে। ইরান, এই ‘সাফল্যে’ উদ্বুদ্ধ হয়ে, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বাড়াতে পারে এবং হিজবুল্লাহ ও হুতিদের মতো গোষ্ঠীগুলোকে আবার চাঙ্গা করতে পারে, যাদের ক্ষমতা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কথার ওঠানামা, আঘাত এবং হঠাৎ পিছু হটার কারণে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে অন্য দেশগুলো নিজেরা সিদ্ধান্ত নেবে — সমন্বয়হীন ও একতরফাভাবে।
## দক্ষিণ এশিয়ার জন্য শিক্ষা :
যুদ্ধটি মধ্যপ্রাচ্যে হলেও এর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়াতেও পড়েছে। নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদে পরিকল্পনাকারীরা সম্ভবত এই যুদ্ধের মাল্টি-ডোমেইন কৌশল — বিমান হামলা, সাইবার অপারেশন, নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও কৌশলগত ধোঁয়াশা — গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। বিশেষত, এ বছরের শুরুর দিকে ভারতের সাথে পাকিস্তানের সীমিত সংঘাতের সঙ্গে তুলনা করলে। ভারত, রাজনৈতিকভাবে ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সম্ভবত গভীর আঘাতের কৌশল বিশ্লেষণ করছে; আর পাকিস্তান, প্রাকৃতিকভাবেই ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, সেই ‘সহিষ্ণুতা ও স্থিতিস্থাপকতা’ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে।জেনারেল আসলামের মতে, “ইরানের জন্য যা কার্যকর হয়েছে তা হলো ধাক্কা সামলে উঠে টিকে থাকার ক্ষমতা।”কিন্তু ভারতের পক্ষে ইসরায়েলের কৌশল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। পাকিস্তানের উচিত হবে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনী আধুনিক করা, কারণ ভবিষ্যতের সংঘাত খুব দূরে নয়। স্টিমসন সেন্টারের নন-রেসিডেন্ট ফেলো ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি মনে করেন, “পাকিস্তানের বিমান বাহিনী ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের চেয়ে ভালো (বিশেষ করে বিমান বাহিনী); অপরদিকে, ভারতের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ইসরায়েলের চেয়ে দুর্বল — কিন্তু ভারত হয়তো পাকিস্তানে গভীর হামলা চালানোর সক্ষমতা গড়তে চায়, যেমন: বিমান ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ স্থান ও মোতায়েন কেন্দ্র।”জেনারেল আসলাম আরও বলেন, “ভারত কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইসরায়েলের মতো সমর্থন পায় না।”
