অর্থনৈতিক ডেস্ক: কোরবানির ঈদের আগে তুলনামূলক বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। চলতি জুন মাসের প্রথম ৩ দিনে ৬০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের ১১ মাসের কিছু বেশি সময়ে (১ জুলাই-৩ জুন) ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে রেমিট্যান্স। এটি এক অর্থবছরের হিসাবে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এদিকে গত ২ মাস ধরে রেমিট্যান্স পাঠানোর শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব। এর আগে টানা ৭ মাস শীর্ষস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র নেমে গেছে পঞ্চম স্থানে।
ব্যাংকাররা বলছেন, প্রতি ঈদের আগেই প্রবাসীরা পরিবারের খরচ মেটাতে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। তবে এই দুই ঈদের আগেই রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর আগে এত রেমিট্যান্স কখনোই আসেনি। মূলত অর্থ পাচার কমে আসায় প্রবাসীরা তাদের আয় পাঠাতে বৈধ পথ বেছে নিয়েছেন। আবার ব্যাংকিং চ্যানেলেই এখন ডলারের দাম বেশি মিলছে। যে কারণে এখন কেউ ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন পথে দেশে টাকা পাঠাতে চাইছেন না। সব মিলিয়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ছে। এতে রিজার্ভেও স্বস্তি
ফিরেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি মাসের প্রথম ৩ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ৬০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। গত মে মাসে এসেছিল ২৯৭ কোটি ডলার, যা এখন পর্যন্ত একক মাস হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে একক মাস হিসেবে মার্চে রেকর্ড পরিমাণ ৩২৯ কোটি ডলার এসেছিল। অন্যদিকে গত বছর জুন মাসের প্রথম ৩ দিনে এসেছিল ২৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আর গত বছর মে মাসে এসেছিল ২২৫ কোটি ডলার।
মূলত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বেশ গতি নিয়ে বাড়ছে রেমিট্যান্স। প্রতিবেদন বলছে, গত বছর আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছিল ২২২ কোটি ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৪০ কোটি ডলার, অক্টোবরে ২৩৯ কোটি ডলার, নভেম্বরে ২২০ কোটি ডলার এবং ডিসেম্বরে ২৬৩ কোটি ডলার। চলতি বছর জানুয়ারিতে এসেছিল ২১৮ কোটি ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ২৫২ কোটি ডলার, মার্চে ৩২৯ কোটি ডলার এবং এপ্রিলে ২৭৫ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাস ৩ দিনে প্রবাসীরা ২ হাজার ৮১১ কোটি ডলার (২৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন) রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছিল ২ হাজার ১৬৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের ১১ মাস ৩ দিনে আসা রেমিট্যান্স এক অর্থবছরের হিসাবেও অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এর আগে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে ২০২০-২১ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে এসেছিল ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার (২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন)। এর পরের দুই অর্থবছরে ২১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে রেমিট্যান্স আসে। আর গত অর্থবছরে আসে ২৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বরাবরই সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসত। তবে গত আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসী আয় আসা বেড়ে যায়। গত মার্চ পর্যন্ত টানা ৭ মাস দেশটি থেকে প্রবাসী আয় আসা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। তবে এপ্রিল মাস থেকে আবার শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে সৌদি আরব। যদিও অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রই রেমিট্যান্স পাঠানোয় শীর্ষে অবস্থান করছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশে আসা ২৯৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্সের মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৫৩ কোটি ৩৩ লাখ ডলার, যা মাসিক মোট রেমিট্যান্সের ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৩৫ কোটি ১৪ লাখ ডলার। যুক্তরাজ্য থেকে ৩৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৩৪ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ২২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। এ ছাড়া শীর্ষ ১০ রেমিট্যান্স পাঠানো দেশের তালিকায় এরপর রয়েছে ওমান, ইতালি, কুয়েত, কাতার ও সিঙ্গাপুর।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুন শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী, রিজার্ভ বেড়ে হয় ২০ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংক খাতে ডলারের যে সংকট চলছিল, তা অনেকটা কেটে যাচ্ছে বলে মনে করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ডলারের দাম নিয়ে যে অস্থিরতা ছিল তাও কিছুটা কমে এসেছে। ব্যাংকগুলো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ ১২৩ টাকার মধ্যেই প্রবাসী আয় কিনছে। তবে খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা দামে।
