মুক্তদেশ ডেস্ক: একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কল্পনা করুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার একটি বিব্রতকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ ভিডিওটি ধারণ করার সময় আপনি কিছুই জানতেন না, এমনকি সেটি প্রকাশের ওপরও আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। হতে পারে, আপনি জিমে ব্যায়াম করতে গিয়ে ঘেমে একাকার। কিংবা কর্মস্থলে, কোনো পানশালায় অথবা রাস্তায় হাঁটছেন। সেখানে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি আপনার ফোন নম্বর চাইতে গিয়ে আপনাকে বিরক্ত করছে। আপনি বুঝতেই পারেননি, লোকটি গোপনে আপনার ভিডিও ধারণ করছে। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যানেলে এমন নারীদের লজ্জায় ফেলার ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যারা তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে রাজি হন না।
এ সপ্তাহে ব্রিটিশ মন্ত্রীরা তথাকথিত ‘বিকৃত রুচির মানুষের চশমা’ (পারভার্ট গ্লাসেস) ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এসব চশমায় ওয়াই-ফাই সংযোগ থাকে। এগুলোর মাধ্যমে ব্যবহারকারী আশপাশের মানুষের ভিডিও ধারণ করতে পারেন। পুরুষদের একটি অংশ এসব চশমা ব্যবহার করে নারীদের হয়রানি করছেন—এমন একাধিক অভিযোগের পর সরকার এ ধরনের চশমার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
চশমার ফ্রেমে একটি ছোট আলো জ্বলে, যা দেখে বোঝার কথা যে ব্যবহারকারী ভিডিও ধারণ করছেন। কিন্তু আলোটি সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি নিষ্ক্রিয় করাও বেশ সহজ।
এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা নিঃসন্দেহে ছোট একটি সাফল্য হবে। বিশেষ করে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যে লড়াইয়ে আমরা প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছি বলে মনে হয়, সেই প্রেক্ষাপটে এটি সামান্য অর্জনই। কিন্তু এর মাধ্যমে তরুণীরা তাঁদের জীবনের ওপর অন্তত কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবেন। বিষয়টি আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গত মাসে অ্যান্ডি বার্নহাম যখন বাসে হেডফোন ছাড়া উচ্চ শব্দে গান শোনার বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন, তখন তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, রোম যখন পুড়ছে, তখন তিনি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। এরপর কী? ফ্রিজ থেকে দুধ শেষ করে খেয়ে খালি প্যাকেটটি আবার যত্ন করে ফ্রিজে রেখে দেওয়ার জন্যও কি জেল হবে?
কিন্তু এরপর দেখা গেল, প্রধানমন্ত্রী ছোটখাটো বিষয়গুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এমন এক সপ্তাহে যখন অজ্ঞাত কিছু শক্তির তৎপরতায় ইউরোপজুড়ে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে, তখনও বার্নহাম সময় বের করে শহরের ফুটপাতের মাঝখানে ভাড়ায় চালিত সাইকেল ফেলে রাখা নির্বোধ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।
এটি সত্যিই একটি সমস্যা। বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ এবং যাঁরা শিশুর স্ট্রলার কিংবা হুইলচেয়ার নিয়ে চলাচল করেন, তাঁদের জন্য এসব সাইকেল বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে জুনিয়র মন্ত্রীরাই ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের জন্য পাউন্ডল্যান্ডের দোকানগুলো টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েও কথা বলেছেন।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক কৌশলবিদ ক্লেয়ার এইনসলির সঙ্গে তাঁর নতুন বই কন্ট্রোল: হাউ উই লস্ট ইট অ্যান্ড হাউ টু টেক ইট ব্যাক (নিয়ন্ত্রণ: কীভাবে আমরা তা হারিয়েছি এবং কীভাবে তা ফিরিয়ে আনব) নিয়ে কথা বলার আগপর্যন্ত বিষয়গুলো আমার কাছে পরিষ্কার হয়নি। এরপর একটি বিষয় বুঝতে পারলাম—এসব উদ্যোগের মূল কথা হলো মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া নিয়ন্ত্রণ আবার তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া।
বইটিতে এইনসলে লিখেছেন, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সময়ে মানুষকে সাধারণত একটি পরামর্শ দেওয়া হয়—যেসব বিষয় নিজের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেগুলোর ওপর মনোযোগ দিন। ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে নিজের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা ধরে রাখুন। বাকি বিষয়গুলো নিয়ে পরে ভাবুন, যখন অপেক্ষাকৃত শান্ত মাথায় সেগুলোর মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
ব্রিটেনের ক্ষেত্রেও বার্নহাম মূলত এই পদ্ধতিই অনুসরণ করছেন। দেশটি এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভরা, আর উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কারণও কম নয়।
বাস্তবতা হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, জ্বালানি তেলের দাম কিংবা শেয়ারবাজারের দরপতন—এসব বিষয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর করার মতো তেমন কিছু নেই। শেয়ারবাজারের এই দরপতন শেষ পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে ফুলে ওঠা অর্থনৈতিক বুদ্বুদ ফেটে যাওয়ার সূচনা কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়। ট্রাম্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মূলত মার্কিন ভোটারদের। চলতি সপ্তাহে তাঁরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে আশাব্যঞ্জক সূচনা করেছেন।
কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট স্বার্থপর আচরণ যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বার্নহামের কাজের পরিধির মধ্যেই পড়ে। এসব আচরণ মানুষের জীবন, স্থানীয় বাজার ও সড়ক এবং তাঁদের প্রতিদিন চলাচলের জনপরিসর সম্পর্কে ধারণাকে প্রভাবিত করে।
লাইম বাইক অ্যাপের মাধ্যমে একটি সাইকেল আনলক করে সহজেই যাত্রা শুরু করার স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে শহুরে জীবনকে অনেক বেশি সহজ করেছে। কিন্তু এর সঙ্গে কিছুটা বিশৃঙ্খলাও যুক্ত হয়েছে।
ভাড়ায় চালিত সাইকেলের ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—তাঁরা ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেন, ফুটপাত দিয়ে দ্রুতগতিতে চলেন, পথচারীদের ধাক্কা দেন এবং ব্যবহার শেষে যেখানে-সেখানে সাইকেল ফেলে চলে যান।
তবে ব্রিটিশ পরিবহনমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডারের প্রস্তাবিত পরামর্শ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অবৈধ ও অসামাজিকভাবে সাইকেল চালানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
বড় শহরের বাইরের এলাকাগুলো থেকে এ নিয়ে নিয়মিত অভিযোগ আসছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে আরও ভয়ংকর ও আতঙ্কজনক একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বালাক্লাভা বা মুখঢাকা পোশাক পরা একদল তরুণ ডার্ট বাইক ও ই-স্কুটার নিয়ে আবাসিক এলাকায় বেপরোয়া গতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব যানবাহনের অনেকগুলোই সড়কে চলাচলের জন্য বৈধ নয়। তাদের বাধা দিতে গেলে তারা গালাগাল ও হুমকি দিচ্ছে। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে পুলিশ যেন এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
এ ধরনের অসামাজিক আচরণ অবশ্য নতুন নয়। ২০ বছর আগে কিশোরদের গাড়ি চুরি করে বেপরোয়াভাবে চালানোর ঘটনা ঘটত। কিন্তু এখন এসব কর্মকাণ্ডের কারণে যখন মা-বাবারা সন্তানদের নিয়ে পার্কে যেতেও নিরাপদ বোধ করেন না, তখন বিষয়টি সমাজের জন্য আরও গভীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ডার্লিংটনের এমপি লোলা ম্যাকইভয় তাঁর নির্বাচনী এলাকায় অবৈধ ই-বাইক চালকদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন। তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘আমাদের সম্মিলিত সামাজিক চুক্তির দৃশ্যমান অবক্ষয়’ বলে বর্ণনা করেন।
যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার বিরুদ্ধেও অভিযান
গ্রীষ্মকালে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে অভিযান চালানো হয়েছিল, সেটিও একই ধরনের উদ্যোগের অংশ।
বার্নহামের নতুন নির্বাচনী এলাকা মেকারফিল্ডে বছরের পর বছর ধরে একটি অবৈধ ময়লার ভাগাড় ছিল। সেখানে পচা আবর্জনা জমে থাকত, ইঁদুরের উপদ্রব ছিল ভয়াবহ। সাবেক এমপি জশ সিমন্স বহু চেষ্টা করেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিয়ে সেই ময়লা সরাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ভাগাড়টিতে আগুন ধরে যায়। এর ফলে কাছের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
ক্লেয়ার এইনসলে তাঁর বইয়ে জশ সিমন্সের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, লেবার পার্টির অনেক নতুন এমপির জন্য দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বছরটি ছিল ‘রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের এক কঠিন পাঠ’।
শুধু ছোটখাটো বিষয়ে অভিযান চালালেই হবে না
শেষ পর্যন্ত অ্যান্ডি বার্নহাম যদি দেশকে শুধু ছোটখাটো অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতিই দিতে পারেন, অথচ বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠে, তাহলে তাঁর এই উদ্যোগ ব্যর্থ হতে বাধ্য।
সর্বশেষ নির্বাচনের আগে কিয়ার স্টারমারও রাজনীতিবিদদের ওপর ক্ষুব্ধ ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ছোট ছোট পদক্ষেপের কথা বলতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিণতি কী হয়েছে, তা আমাদের জানা।
তবে ‘নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নাও’—এই স্লোগানটি ভোট লিভ প্রচারণার জন্য এত শক্তিশালী হয়েছিল একটি বিশেষ কারণেই। মানুষ সত্যিই নিজেদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চেয়েছিল।
লেবার পার্টি যদি সৃজনশীলভাবে এই স্লোগানের নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে, তাহলে কেমন হয়?
এমন একটি দেশ, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে কার্যকরভাবে কাজ করবে; বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের জীবনের ওপর তাদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব বিবেচনা না করে যা খুশি তা করতে পারবে না; যৌন হয়রানিকারী ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিরা নিজেদের ইচ্ছামতো আচরণ করার অবাধ সুযোগ পাবে না; আর বয়স্ক মানুষদের অন্তত এমন নিশ্চয়তা থাকবে যে তাঁরা ফুটপাত দিয়ে নিরাপদে হেঁটে যেতে পারবেন।
