মুক্তদেশ ডেস্ক: সেরারা জানেন কখন মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে হয়। প্রচলিত একটি কথা আছে—‘মানুষের মনে আরও কিছু দেখার আকাঙ্ক্ষা রেখে বিদায় নাও।’ কিন্তু ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো যখন পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা নামালেন, তখন তিনি দর্শকদের প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু দেখিয়ে ফেলেছেন। এটাই তাঁর ভুল। এ কারণেই পর্তুগালের জার্সিতে তাঁর শেষ কয়েকটি বছর ভালোবাসা ও সম্মানের পরিবর্তে উপহাস ও বিদ্রূপের মধ্য দিয়ে কেটেছে। আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসি যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছেন, রোনালদোর ভাগ্যে তা জোটেনি।
ক্যারিয়ারের শেষ দিকে অনেকের কাছেই রোনালদো রবার্তো মার্তিনেজের দলের সম্পদ না হয়ে বরং বোঝা হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর বয়স—এ বছরের গ্রীষ্মে ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলেছেন—এবং মাঠে পরিশ্রম করার অনীহা পর্তুগালের সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করেছেন অনেকে।
এসব অভিযোগের পেছনে বাস্তবতা রয়েছে। আর এ কারণেই পর্তুগালের কোচ হিসেবে মার্তিনেজের উত্তরসূরি হোর্হে জেসুসের ভূমিকা রোনালদোর আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে।
গত মাসে উয়েফা নেশনস লিগের সূচিতে জেসুস যখন রোনালদোর মাঠে থাকার সময় সীমিত করতে শুরু করেন, তখন দুজনের বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নেয়। নিজের প্রতি আচরণের প্রতিবাদে ব্যক্তিগত বিমানে চড়ে দল ছেড়ে চলে যান রোনালদো। এর পর তাঁকে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও নামমাত্র জরিমানা করা হয়। রোনালদোর অবসরের ঘোষণার পরদিনই আসন্ন ম্যাচগুলোর জন্য পর্তুগাল দল ঘোষণা করার কথা জেসুসের।
এভাবে একটি বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটাটা ছিল বেশ বিশৃঙ্খল ও বিব্রতকর। কারণ, নিজের সেরা সময়ে রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার সত্যিই ছিল গৌরবোজ্জ্বল।
২০১৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে পর্তুগালকে শিরোপা জিততে অনুপ্রাণিত করেছিলেন রোনালদো। ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ম্যাচের শুরুতেই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হলেও সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের উদ্দেশে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন এই তারকা। প্রথম ও শেষ আন্তর্জাতিক গোলের মধ্যে ব্যবধান ২২ বছর।
ইএসপিএন—সব খেলার খবর এক জায়গায়
গত মাসে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী মেসিও আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক গোলের তালিকায় ২০ গোল পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন মেসি। বর্তমানে সক্রিয় কোনো ফুটবলারই আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেননি।
বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু (৯৪ গোল), পোল্যান্ডের রবার্ট লেভানডফস্কি (৯২ গোল) এবং ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন (৯১ গোল)—তাঁরা যত চেষ্টাই করুন না কেন, রোনালদোর গোলসংখ্যা হয়তো দীর্ঘদিন অক্ষত থাকবে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২৩৪টি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও রোনালদোর দখলে। এ ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় স্থানে মেসি, তাঁর ম্যাচসংখ্যা ২০৮। ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ (২০৬) কিংবা কাতারের হাসান আল-হায়দোস (১৯৩) যদি আরও তিন-চার বছর খেলা চালিয়ে না যান, তাহলে এই রেকর্ডও রোনালদোর দখলেই থেকে যাবে।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২৩ বছর ধরে গোল করা ও এতগুলো ম্যাচ খেলার পরিসংখ্যান তাঁর অসাধারণ দীর্ঘস্থায়িত্বেরই প্রমাণ। তবে পাঁচ বছর আগে, যখন ইরানের ফরোয়ার্ড আলি দাইয়ের ১০৮ গোলের বিশ্বরেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন, তখনই যদি রোনালদো আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাতেন, তাহলে হয়তো তাঁর উত্তরাধিকার বা ফুটবলীয় অর্জনের মর্যাদা এতটা ক্ষুণ্ন হতো না। সময়কে আটকে রাখা সম্ভব নয়—এই বাস্তবতা মেনে নিতে না পারার কারণেই তাঁর ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্বকাপ কখনো জিততে পারেননি রোনালদো। ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর শেষ প্রচেষ্টারও সমাপ্তি ঘটে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেনের কাছে হেরে। তবে পর্তুগালকে যে তিনি বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে তুলে এনেছেন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
কাতারে অনুষ্ঠিত ২০২২ বিশ্বকাপেই প্রথম রোনালদোর সামর্থ্যের অবনতি স্পষ্ট হতে শুরু করে। ওই আসরে মাত্র একটি গোল করেছিলেন তিনি। কোচ ফার্নান্দো সান্তোস তাঁকে একপর্যায়ে দল থেকে বাদও দেন। তাঁর পরিবর্তে খেলতে নেমে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গনসালো রামোস হ্যাটট্রিক করলে মনে হয়েছিল, রোনালদোর পথচলা বুঝি শেষ।
কিন্তু নতুন কোচ মার্তিনেজের অধীনে তিনি খেলা চালিয়ে যান। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপেও অংশ নেন, যদিও একটি গোলও করতে পারেননি। সামর্থ্য কমে আসার পরও এ বছরের বিশ্বকাপে তাঁকে দলে রাখা হয়েছিল। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুটি গোল করার পর তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি ফিরে এসেছি!’
তত দিনে রোনালদো নিজের পুরোনো ছায়ামাত্র হয়ে উঠেছেন। শেষ দুটি বিশ্বকাপ ও শেষ ইউরোতে তাঁর পারফরম্যান্সের অবনতি, পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলে সৌদি আরবের আল নাসরের হয়ে খেলা—সব মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর অতীতের গৌরবের গল্প আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তাঁরা রোনালদোর অসাধারণত্বের গল্প শুনলেও মাঠে দেখেছেন একজন বয়স্ক খেলোয়াড়কে, যিনি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছেন।
তবে ২০০৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রোনালদো যখন নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন, তখন তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের দুর্দান্ত। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের প্রভাব বা তাৎক্ষণিক স্মৃতির পক্ষপাত (রিসেন্সি বায়াস) একসময় কেটে যাবে। তখন এই সেরা রোনালদোকেই মানুষের মনে রাখা উচিত এবং রাখবে।
তাঁর ছিল অবিশ্বাস্য গতি, চোখের পলকে করা এমন সব স্টেপওভার, যাতে যেকোনো ডিফেন্ডারকে সহজেই পরাস্ত করতে পারতেন। ছিল অসাধারণ শক্তি, শারীরিক সামর্থ্য এবং লাফ দেওয়ার দুর্দান্ত ক্ষমতা। এমন উচ্চতা ও দূরত্ব থেকে তিনি হেডে গোল করতেন, যা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হতো।
গোল করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার। আর নিজের সেরা সময়ে ফ্রি-কিকেও ছিলেন বিশ্বের সেরা। এর প্রমাণ পেতে ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে তাঁর করা ফ্রি-কিকের গোলটি দেখলেই যথেষ্ট।
মার্ক ওগডেনের সর্বশেষ সংবাদ
ইএসপিএন অ্যাপ ডাউনলোড করে মার্ক ওগডেনের নিউজ অ্যালার্ট চালু করলে সর্বশেষ সংবাদ ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সরাসরি পাওয়া যাবে।
রোনালদো যদি ফ্রান্স, স্পেন কিংবা জার্মানির মতো ইউরোপের ফুটবল পরাশক্তির হয়ে খেলতেন, তাহলে অন্তত একটি বিশ্বকাপ এবং আরও কয়েকটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে পারতেন। তবে পর্তুগালকে ফুটবলের সেই পরাশক্তিদের কাতারে তুলে আনতে তাঁর অবদান নিশ্চিতভাবেই রয়েছে।
২০০৩ সালে রোনালদোর আন্তর্জাতিক অভিষেকের আগে পর্তুগাল তাদের ইতিহাসে মাত্র তিনটি বিশ্বকাপ ও তিনটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। কিন্তু রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পর্তুগাল কখনোই বিশ্বকাপ বা ইউরোতে খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়নি। তাঁর সময়ে দলটি ছয়টি বিশ্বকাপ ও ছয়টি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েছে।
এসব টুর্নামেন্টের বেশির ভাগ সময়ই রোনালদো নিজের কাঁধে দলকে টেনে নিয়ে গেছেন। ২০১৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। হ্যাঁ, ফাইনালের বেশির ভাগ সময় তিনি মাঠের বাইরে ছিলেন। কিন্তু আগের ম্যাচগুলোতে তাঁর অবদান না থাকলে পর্তুগালের পক্ষে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানোই কঠিন হতো।
বর্তমানে পর্তুগাল একটি তারকাসমৃদ্ধ দল। স্কোয়াডের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই তাদের বিকল্প খেলোয়াড় রয়েছে। ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা, জোয়াও নেভেস, পেদ্রো নেতো, ভিতিনিয়া ও নুনো মেন্দেসের মতো তারকারা দলটিকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী জাতীয় দলে পরিণত করেছেন।
এখন আর পর্তুগালের রোনালদোকে প্রয়োজন নেই। অন্তত ২০২০-এর দশকের রোনালদোকে তো নয়ই।
নিজের সেরা সময়ের রোনালদো থাকলে পর্তুগাল বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট হতো। কিন্তু সমস্যা হলো, জেসুস যে বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন, তা হলো—বয়সী রোনালদো আর সেই মহান রোনালদো নন।
রোনালদোবিহীন নতুন পথচলা শুরু করার ক্ষেত্রে জেসুস সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তবে নিজের সময় যে অনেক আগেই শেষ হয়ে এসেছে, তা বুঝতে রোনালদোর একটু বেশি দেরি হয়ে গেছে।
তবু ফুটবল যখন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে স্মরণ করবে, তখন সেই খেলোয়াড়কেই মনে রাখা উচিত, যিনি ছিলেন অসাধারণ, অপ্রতিরোধ্য ও দুর্দান্ত। সেই রোনালদোকে নয়, যিনি কখন বিদায় নিতে হয়, তা বুঝতে পারেননি।
