মুক্তদেশ ডেস্ক: নয় মাস বয়সী মেয়ে লাবিবা আক্তারকে হারানোর পর তার বাবা-মা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছেন শিশুটির একটি নীল পোশাক। গত জুনে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় লাবিবা। রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে তাকে টিকা দেওয়ার উপযুক্ত বয়স হয়েছে—এ তথ্য তার বাবা-মাকে জানানো হয়নি।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব এবং টিকাদানে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে গেলে প্রাণঘাতী রোগের প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তার একটি সতর্কবার্তা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত মার্চের মাঝামাঝি প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর ৯ অক্টোবর পর্যন্ত সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২ হাজার। এর মধ্যে ২২ হাজার রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেশি।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯৪ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা কতটা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ডব্লিউএইচও এই মাত্রার টিকাদানকে অপরিহার্য বলে মনে করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এ লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে যায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা ডব্লিউএইচওর নথিপত্র এবং এক ডজনেরও বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও কিছু সমস্যার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোটি কোটি শিশুর তথ্য তালিকায় না থাকা, প্রস্তুতিতে ঘাটতি এবং পর্যাপ্তসংখ্যক অভিভাবকের কাছে পৌঁছাতে না পারা।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচওর টিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেন, “এটি প্রতিটি দেশের জন্যই একটি বাস্তব সতর্কবার্তা।”
তিনি বলেন, টিকাদানের মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার চেয়ে সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।
মার্ক জিটের ভাষায়, “শেষ পর্যন্ত এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা প্রাদুর্ভাব থামাতে পারবে। কিন্তু এর মধ্যে অনেক মানুষ হামে আক্রান্ত হবেন, আর কেউ কেউ মারাও যাবেন।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে বলেছিলেন, প্রাদুর্ভাব বন্ধ করতে সরকার সম্ভাব্য সবকিছু করছে। তবে এই প্রতিবেদন তৈরির জন্য অক্টোবরে পাঠানো অতিরিক্ত প্রশ্নের জবাব দেয়নি সরকার।
‘ছেলেকে দাফন করার পরই তারা এসেছিল’
১৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকাগুলোর একটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট। সেখানে গত জুলাইয়ে দুই বছর বয়সী আরমান হোসাইন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তার টিকা দেওয়া হয়নি। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারকে তাদের তিন চাকার অটোরিকশাটি বিক্রি করতে হয়েছিল। আরমানের চার বছর বয়সী বোনও টিকা পায়নি, তবে সে বেঁচে গেছে।
আরমানের বাবা ২৬ বছর বয়সী আমিন মিয়া বলেন, সময়মতো টিকা দেওয়ার জন্য সিলেটের প্রত্যন্ত গ্রামে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি।
তিনি বলেন, “আমার ছেলেকে দাফন করার পরই তারা এসেছিল।”
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি এক হাজার হামে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে দুই থেকে তিনজন মারা যান। তবে অপুষ্টিসহ নানা কারণে দরিদ্র দেশগুলোতে এই রোগ আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সিলেট অঞ্চলের ছাতক শহরে ৩০ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি হুমায়ুন রশিদের নয় মাস বয়সী মেয়ে লাবিবা আক্তারও গত জুনে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তারও টিকা দেওয়া হয়নি।
জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকা দেওয়ার ন্যূনতম বয়স নয় মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছিল। ফলে এপ্রিলেই লাবিবার টিকা পাওয়ার সুযোগ ছিল।
লাবিবার বাবা বলেন, “আমাদের জানাতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি।”
গত মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন বলেছিলেন, জরুরি টিকাদান কর্মসূচির ফলে সংক্রমণের হটস্পটগুলোতে রোগীর সংখ্যা ‘প্রায় শূন্যে’ নেমে এসেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন হামে আক্রান্ত হয়েছেন। উচ্চ জ্বর, কাশি ও শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি সৃষ্টিকারী এই রোগে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মে মাসের পর সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশে যখন হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, তখন বিশ্বের বিশেষ করে ধনী দেশগুলোতে টিকা নেওয়া নিয়ে অনীহাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মতো ব্যক্তিদের বক্তব্য এ সংশয়কে আরও উসকে দিচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মূল বাধা টিকার বিরোধিতা নয়; বরং টিকা পাওয়ার সুযোগের অভাব এবং এ বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি।
রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যাহত টিকাদান
সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে সফলতার উদাহরণ ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজের টিকাদানের হার ছিল ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ছিল ৯৩ শতাংশ।
দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় মূলত সেই অল্পসংখ্যক শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনতে, যাদের শরীরে প্রথম ডোজের পর পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না।
কিন্তু একই বছর রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীরা ধর্মঘটে যান, টিকা কেনার আদেশে বিলম্ব হয় এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত টিকা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রথম ডোজের টিকাদানের হার কমে ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ হারের চেয়ে এই হার কয়েক শতাংশ কম।
প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হামসহ বিভিন্ন রোগের টিকাদানসংক্রান্ত সরকারি তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
এতে বলা হয়, প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু হিসাবে দেখা গেছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে—কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই হার ১০০ শতাংশেরও বেশি। এর অর্থ, টিকার ডোজ গণনা কিংবা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল থাকতে পারে।
জরুরি কর্মসূচিতে বাদ পড়েছে লাখ লাখ শিশু
হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল। শুরুতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে বলেও মনে হয়েছিল।
এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর নতুন রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। সরকার দাবি করেছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী লক্ষ্যভুক্ত সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে কর্মসূচি প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।
জুনে পরিচালিত আরেকটি নিয়মিত স্বাস্থ্য কর্মসূচির জন্য তৈরি তালিকায় একই বয়সসীমার শিশুদের সংখ্যা হামের টিকাদান কর্মসূচির তালিকার তুলনায় ৪০ লাখ বেশি পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট হয়, জরুরি কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়েছিল।
১৪ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, “এখানে একটি ঘাটতি রয়েছে।” সে সময় হামের সংক্রমণ আবার বাড়ছিল। তিনি শিশুদের টিকা না পাওয়ার কারণ হিসেবে অভিভাবকদের অনীহা কিংবা শিশুদের অসুস্থতাকে দায়ী করেন।
তবে সমস্যার আরও কিছু দিক সামনে এসেছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা এপ্রিল ও আগস্ট মাসে সরকার, ডব্লিউএইচও এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বৈঠকের নথিতে দেখা যায়, দ্রুত পদক্ষেপ নিতে গিয়ে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
১৯ এপ্রিলের বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে সরকার প্রচলিত চার দফা প্রস্তুতি যাচাইয়ের পরিবর্তে মাত্র এক দফা যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এসব যাচাইয়ের মধ্যে রয়েছে টিকা সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত রেফ্রিজারেটর আছে কি না, টিকা কতটা নিরাপদে রাখা যাবে এবং কতসংখ্যক শিশুকে টিকা দিতে হবে—এসব বিষয় নিশ্চিত করা।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, এক দফা যাচাইয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলা প্রস্তুত থাকলেও সব জেলা পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না।
সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলো
বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুরা।
বাংলাদেশের হাম ও রুবেলা নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির সভাপতি এবং মহামারিবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “প্রস্তুতি যাচাই যথাযথভাবে করা না হলে সাধারণত সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুরাই টিকা থেকে বঞ্চিত হয় এবং এর মূল্য তাদেরই দিতে হয়।”
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী হায়দার বলেছেন, এপ্রিলের টিকাদান কর্মসূচি মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে চালু করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের টিকাদান কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেওয়া তাজুল ইসলাম আবদুল বারী বলেছেন, এ ধরনের কর্মসূচির জন্য সাধারণত কয়েক মাসের পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়।
আগস্টের বৈঠকে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা হয়। কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যাদের টিকা দেওয়া হয়নি, তাদের অনুপাত জরুরি কর্মসূচির আগে ৮২ শতাংশ ছিল, পরে তা বেড়ে ৮৫ শতাংশ হয়।
নথিতে বলা হয়, “এই হার প্রায় অপরিবর্তিত থাকা টিকাদানের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিকেই তুলে ধরে।”
এপ্রিল ও আগস্টের বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও ডব্লিউএইচও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি। তবে বাংলাদেশে সংস্থাটির উপপ্রতিনিধি ডা. রাজেশ নারওয়াল বলেছেন, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে সরকারকে সহায়তা দিতে ডব্লিউএইচও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘাটতি যেন আবার তৈরি না হয়, সে জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও সহনশীল করে তুলতে হবে।”
সিলেটে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হামে ১৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদকেরা সেপ্টেম্বরে যেসব ১৬টি পরিবারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তাদের মধ্যে আটটি পরিবার জানিয়েছে, তারা টিকা দেওয়ার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকর্মীকে আসতে দেখেনি। অন্তত ছয়টি পরিবার বলেছে, তাদের এলাকায় কোনো শিশু হামে মারা যাওয়ার পরই স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে গিয়েছিলেন।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সরকার নতুন একটি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। এর লক্ষ্য আগে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা।
এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, সে জন্য আমরা গ্রাম পর্যায়ের মানুষকেও সম্পৃক্ত করব।”
তবে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন হয় না। অন্যদিকে সরকারি তথ্য বলছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছেন। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, এই বয়সী শিশুরা মোট হামের রোগীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এ ছাড়া ছয় মাস বা তার কম বয়সী শিশুদের শরীরে প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত এ বয়সী শিশুরা মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে কিছুটা সুরক্ষা পেয়ে থাকে।
ডব্লিউএইচও বলছে, আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার পাশাপাশি বাংলাদেশকে এই চ্যালেঞ্জও সামলাতে হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরে সিলেটের ১০০ শয্যার শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীদের চাপে সব ওয়ার্ডই কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রয়টার্সের প্রতিবেদকেরা যেদিন হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন, সেদিন সেখানে ১৭৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
হামের প্রাদুর্ভাবে প্রাণ হারানো লাবিবা আক্তারের নীল পোশাকটি এখনও ঝুলছে সিলেটের সেই গ্রামে, যেখানে তার বাবা-মা বসবাস করেন। পোশাকটি যেন টিকাদানে অবহেলা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে হারিয়ে যাওয়া একটি শিশুর স্মৃতি বহন করছে।
সূত্র: রয়টার্স।
