মুক্তদেশ ডেস্ক: ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার ব্যাপক হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। হামলায় দেশটির শিল্পকারখানা ও জ্বালানি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ হামলাকে রাশিয়ার অন্যতম ‘ঘৃণ্য হামলা’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকিতে। সেখানে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পাঁচতলা একটি আবাসিক ভবন ধসে পড়ে। বৃহস্পতিবার সকালে ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ জানায়, প্রিলুকিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ শিশুও রয়েছে। রাজধানী কিয়েভে একটি আবাসিক ভবনে রুশ হামলার পর আরও দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এতে শহরটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে চারজনে দাঁড়ায়। এর আগে ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান ভিহিভস্কি জানিয়েছিলেন, দেশজুড়ে নিহতের সংখ্যা ২৮ জন। এর মধ্যে প্রিলুকির হামলায় ২০ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। বুধবার সন্ধ্যায় কিয়েভের প্রসিকিউটররা জানিয়েছিলেন, শহরের উপকণ্ঠে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুজন নিহত হয়েছেন।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, হামলায় দেশজুড়ে ১০০ জন আহত হয়েছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্মদিনের দিনেই এই হামলা চালানো হয়। রাতে দেওয়া ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, ‘পুতিন নিজেকে এমন একটি জন্মদিনের উপহার দিয়েছেন— শিশু ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু।’
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, ব্যাপক এই হামলায় রাজধানী কিয়েভের পাশাপাশি মধ্যাঞ্চলের ওলেক্সান্দ্রিয়া ও ক্রেমেনচুক শহরেও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
জেলেনস্কি জানান, রাতভর ইউক্রেনে প্রায় ৭০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে রাশিয়া। এর অনেকগুলোই ছিল উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এ ছাড়া কয়েক ডজন শাহেদ ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়।‘রুশরা যন্ত্রণাদায়ক ও শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে হামলা চালাতে চেয়েছিল। এটি ছিল তাদের অন্যতম ঘৃণ্য হামলা।’
প্রিলুকিতে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চালান জরুরি বিভাগের কর্মীরা। খননযন্ত্র ও বেলচা দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর পাশাপাশি ভবনের ওপরের তলায় পৌঁছাতে মই ব্যবহার করেন। এ সময় ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ১৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শহরটিতে প্রায় ৫৫ জন আহত হয়েছেন।
প্রিলুকির উপমেয়র দানিলো সাভেনকো বলেন, শহরের বিশেষ করে কেন্দ্রীয় এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার শব্দ শুনে আমি ও আমার স্ত্রী দ্রুত বিমান হামলা থেকে বাঁচতে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যায়।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের সামরিক-শিল্প স্থাপনায় ‘ব্যাপক হামলা’ চালানো হয়েছে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য উচ্চনির্ভুলতার অস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া ৪৬টি জেটচালিত ড্রোন ছুড়েছে। এর ৮০ শতাংশের কিছু বেশি ভূপাতিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ড্রোন ধ্বংস করতে পেরেছিল। তবে এবার হঠাৎ এই হার কেন বেড়েছে, সে বিষয়ে বিমানবাহিনী কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
গ্রীষ্মকাল থেকে রাশিয়া দিন-রাত কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে নতুন ধরনের উচ্চগতির ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ছে।
জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জীবন রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাঁর সরকার। ইউক্রেনের হাতে থাকা ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম একমাত্র ব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট। তবে ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে এর সরবরাহ কমে গেছে।
ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সের্হি কোরেৎস্কি জানিয়েছেন, বুধবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে দেশটি নতুন করে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো (১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার) সহায়তা পেয়েছে। এই অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করা হবে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, কিয়েভসহ চেরনিহিভ, কিরোভোহরাদ, দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, পোলতাভা ও খারকিভ অঞ্চলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্টের স্থাপনা হামলার লক্ষ্য ছিল। প্রতিষ্ঠানটি ফ্লামিঙ্গো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার ড্রোন তৈরি ও সংরক্ষণ করে বলে দাবি করেছে মস্কো।
গত সপ্তাহে জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, ফায়ার পয়েন্টের তৈরি ইউক্রেনের প্রথম নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শরৎকালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি আরও দীর্ঘপাল্লার এফপি-৯ ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফায়ার পয়েন্টের দাবি, এই অস্ত্র মস্কো পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার ভেতরে চারটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে পার্ম, সামারা ও আস্ট্রাখান অঞ্চলের দুটি তেল স্থাপনা এবং একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বেসামরিক অবকাঠামোয় মস্কোর ক্রমবর্ধমান হামলার জবাবে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে যাবে ইউক্রেন।
বুধবার ইউক্রেনের কর্মকর্তারা ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিল। এরপর কিয়েভের অনেক বাসিন্দা ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেন। রাতভর রাজধানীতে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলের একটি অংশে মস্কো-সমর্থিত আঞ্চলিক গভর্নর জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় একটি গাড়িতে থাকা দুই বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় হামলায় সেখানে আরও তিনজন নিহত হয়েছেন।
