মুক্তদেশ ডেস্ক: কৃষির উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং বারবার দেখা দেওয়া ঘাটতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক বাজেটে কৃষি খাতে অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে পাকিস্তানের কিসান বোর্ড।
কৃষক সংগঠনটি গমের জন্য প্রতি ৪০ কেজিতে ৫,০০০ রুপি এবং আখের জন্য ৭০০ রুপি সহায়তা মূল্য নির্ধারণেরও দাবি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, কৃষিকাজ থেকে লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা ইউরিয়ার সংকট, বিদ্যুতের উচ্চ বিল, ফল খাতে কম মুনাফা এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত বন্ধ থাকার সমালোচনা করেছে। দাবি পূরণ না হলে তারা আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। সূত্র : ডন
কৃষিতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর তাদের দাবি বিবেচনার যোগ্য। দেশটির জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ২২ শতাংশ এবং প্রায় ৬০ শতাংশ জনগোষ্ঠী কোনো না কোনোভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। একইভাবে বাড়তি বরাদ্দকে অদক্ষ মূল্য-ভর্তুকির আরেকটি অজুহাতও বানানো উচিত নয়।
কৃষকদের সহায়তার জন্য প্রশাসন নির্ধারিত মূল্য, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি এবং অন্যান্য নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে পাকিস্তান কয়েক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এতে বাজারব্যবস্থা বিকৃত হয়েছে, অদক্ষ উৎপাদন উৎসাহিত হয়েছে এবং ছোট কৃষকদের চেয়ে প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগী উৎপাদকরাই বেশি লাভবান হয়েছেন।
এর পরিবর্তে সরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষির উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্তকারী কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করা। পানি ব্যবস্থাপনা, সেচের দক্ষতা বৃদ্ধি, খামার থেকে বাজার পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ, সংরক্ষণব্যবস্থা, গবেষণা, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা এবং উন্নত বীজ প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
কৃষির যান্ত্রিকীকরণকেও অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে আনতে হবে। যৌথভাবে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থা এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা গেলে কৃষকদের ওপর বিপুল মূলধনী বিনিয়োগের চাপ না দিয়েই যান্ত্রিকীকরণ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ফলন ও পণ্যের মান বাড়ানো। এর জন্য প্রয়োজন আধুনিকায়ন, বাজারব্যবস্থা থেকে কৃষিকে চিরস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া নয়।
কৃষকরা যদি অনিশ্চিত বাণিজ্যনীতি, বিকৃত কৃষি উপকরণের বাজার, অর্থায়নে দুর্বল সুযোগ, অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং ফসলের বাজারে সরকারি কর্মকর্তাদের খামখেয়ালি হস্তক্ষেপের মুখোমুখি হন, তাহলে তারা কখনোই বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারবেন না। কৃষকদের এমন নীতি প্রয়োজন, যা সরকারি ঘোষণার ওপর নির্ভরশীল না করে মূল্য ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করবে।
পাকিস্তানকে কৃষিখামারের সীমানার বাইরেও নজর দিতে হবে। শক্তিশালী কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে ফসল কাটার পরের অপচয় কমানো, কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন এবং রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। উন্নত কোল্ড স্টোরেজ, পণ্যের মান অনুযায়ী বাছাই, প্যাকেজিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবহনব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। উৎপাদন কমে গেলে এসব ব্যবস্থা মজুত সংরক্ষণের মাধ্যমে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করতে পারে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃষিকে প্রায়ই শুধু উৎপাদনের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এটি একটি সম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খলের (value chain) সমস্যা। গম, ফল, সবজি, আখ বা ধানের উৎপাদন বাড়ালেই খুব বেশি লাভ হবে না, যদি বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়ে যায়, কৃষক ন্যায্য মূল্য না পান এবং ভোক্তাদের ঘাটতি কিংবা হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হতে হয়।
তাই কৃষকদের বেশি সরকারি বিনিয়োগের দাবি যথার্থ। তবে সাফল্যের মাপকাঠি শুধু বরাদ্দের পরিমাণ হওয়া উচিত নয়; বরং সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং তার ফল কী হচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিষয়।
কৃষিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু ব্যয়বহুল ও অকার্যকর হস্তক্ষেপের আরেকটি চক্র নয়। কৃষির প্রয়োজন অবকাঠামো, প্রযুক্তি, যান্ত্রিকীকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, কার্যকর বাজার এবং এমন নীতি, যা কৃষিকে রাষ্ট্রের অনুদান ও সুবিধার ওপর নির্ভরশীল না করে প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই খাতে পরিণত করবে।
