মুক্তদেশে ডেস্ক: চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন শুরু করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসে দুই দেশের কর্মকর্তাদের সরাসরি বৈঠকে এ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আরও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের।
অনানুষ্ঠানিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের এই আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সর্বশেষ অবশিষ্ট অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিটির মেয়াদ গত বছর শেষ হয়ে গেছে।
চীনের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই শুরু হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত এতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। নতুন কোনো চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনাও শুরু হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগের উদ্যোগগুলো চীন ও রাশিয়া অনেকাংশে উপেক্ষা করে আসছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, এ বছর মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় পারস্পরিক পরিদর্শনের ধারণাটি প্রথমে চীনের পক্ষ থেকেই উত্থাপন করা হয়। এতে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, চীন হয়তো এমন কিছু আস্থা তৈরির পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী, যা ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো চুক্তির পথ তৈরি করতে পারে।
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় গবেষণাগার এবং চীনের সমপর্যায়ের স্থাপনা পরিদর্শনের বিষয়টি উঠে এসেছে। সূত্রটি জানায়, পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনের বিষয়েও আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
সূত্রগুলো বলছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত কর্মপর্যায়ের মার্কিন ও চীনা কর্মকর্তাদের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনার বেশির ভাগই হয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—নিয়ে গঠিত ‘পি৫’ বৈঠকের পার্শ্ববৈঠকে।
পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার ধারণাটি কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিয়ে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগে অগ্রগতি ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে।
তবে চীন এখনো স্পষ্ট অবস্থানে রয়েছে যে, তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ সীমিত করতে পারে—এমন কোনো আলোচনায় তারা অংশ নেবে না।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার চীনের তুলনায় অনেক বড়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট প্রায় ৫ হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যেখানে চীনের রয়েছে প্রায় ৬০০টি। তবে চীন দ্রুত তার পারমাণবিক অস্ত্র অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে এবং আগামী এক দশকে আরও কয়েক শ ওয়ারহেড তৈরি করতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করেনি। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের কাছেও মন্তব্য চাওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার চীনে সপ্তাহব্যাপী জাতীয় দিবসের ছুটি শুরু হয়েছে। এ সময় দেশটির সব সরকারি দপ্তর বন্ধ থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টার তদারকির দায়িত্বে থাকা সাবেক ভারপ্রাপ্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল ডিন সিএনএনকে বলেন, চীনের সঙ্গে যেকোনো পারমাণবিক আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘চোখ-কান খোলা রেখে’ করতে হবে। তবে তাঁর মতে, পারস্পরিক পরিদর্শন হবে ‘অত্যন্ত মূল্যবান আস্থা তৈরির পদক্ষেপ’। এটি দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক ঝুঁকি কমাতে ভবিষ্যৎ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও কূটনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিন বলেন, ‘এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সময়। যুক্তরাষ্ট্র-চীন পারমাণবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন খুব কমসংখ্যক নিরাপত্তাবেষ্টনী রয়েছে।’
২০২৬ সালের ৭ জুলাই বেইজিংয়ের একটি সংবাদপত্রের স্টলে তোলা ছবিতে চীনা সামরিক বাহিনীর আগের দিন সাবমেরিন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষামূলকভাবে নিক্ষেপের খবর প্রকাশিত হতে দেখা যায়।
গত মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনা সমর্থন করেন। তবে ওই বৈঠকে পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, শি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার চীনের তুলনায় বড়—এই যুক্তি তুলে ধরেছেন। চীনা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে এই যুক্তি ব্যবহার করে আসছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সমপর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সীমিত করার মতো কোনো আলোচনায় যেতে না হয়।
তারপরও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের অন্যতম অগ্রাধিকার। চলতি বছরের শেষ দিকে তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আরও দুবার বৈঠক করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্রগুলো বলছে, দুই নেতা আবার বৈঠকে বসার সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন নিয়ে নিম্নপর্যায়ের আরও কিছু আলোচনা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতিহাসে পারমাণবিক স্থাপনা সরেজমিনে পরিদর্শন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-এর গুরুত্বপূর্ণ যাচাই-পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনো দেশ তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলো শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি মেনে চলছে কি না, তা নিশ্চিত করতেই এসব পরিদর্শন করা হয়।
চীনের উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয়
সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা এই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে এর মাধ্যমে দ্রুত কোনো বড় চুক্তিতে বাস্তব অগ্রগতি হবে—এমনটা মনে করছেন না তাঁরা।
কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক ‘ট্র্যাক-টু’ আলোচনায় যুক্ত থাকা এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। এটি একটি দারুণ সূচনা হতে পারে।’
তবে সংশয়বাদীরা মনে করছেন, চীন হয়তো ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা কিংবা পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে তারা আলোচনায় আন্তরিক—এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরির জন্যই এই প্রস্তাব সামনে এনেছে।
পারমাণবিক ইস্যুতে কাজ করা আরেক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘বড় কোনো শীর্ষ বৈঠকের আগে চীনারা যদি ইতিবাচক বার্তা পাঠাতে পারে, তারা সেটি করবে। এতে দুই পক্ষের যোগাযোগের সময় তাদের আরও উদার ও ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।’
ফলে পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের এই সম্ভাব্য উদ্যোগ দুই পরাশক্তির মধ্যে আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে কি না, নাকি এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য ও কৌশলগত বার্তা—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
