মুক্তদেশ ডেস্ক: হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের দেওয়া কূটনৈতিক প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জলপথটিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের গণমাধ্যম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে বিস্ফোরণের ঘটনা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে একাধিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে ওই দিন হরমুজ প্রণালিতে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেছে কি না, ইরানি কর্তৃপক্ষ তা নিশ্চিত করেনি। এর মধ্যেও জলপথটিতে জাহাজে হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহে একটি ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজেও হামলা হয়, এতে একজন নাবিক নিহত হন। সূত্র : আল জাজিরা
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় না করা কোনো জাহাজের জন্য প্রণালিটি বন্ধ রয়েছে। রোববার বিকেলে তারা একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে চলতি মাসে দ্বিতীয় একটি মার্কিন পানির নিচের ড্রোন জব্দ করার দাবি করা হয়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ কোম্পানিগুলোকে ইরান একটি সাময়িক রুট ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। এই রুটটি ইরানি কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেছে এবং এর জন্য সংশ্লিষ্ট ফি পরিশোধ করতে হবে। তবে ইরান একই সঙ্গে জানিয়েছে, মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরানি বন্দরগুলো বন্ধ থাকা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।
ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ শনিবার জানিয়েছে, যেসব জাহাজ ভাড়া দেওয়া বা পরিচালনাকারী কোম্পানি অনুমোদনহীন বলে বিবেচিত রুট ব্যবহার করতে নাবিকদের নির্দেশ দেবে, তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।
কর্তৃপক্ষটি আরও একটি বক্তব্য প্রকাশ করেছে, যেটিকে তারা একজন অজ্ঞাতনামা জাহাজমালিকের ক্ষমা প্রার্থনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেখানে ওই জাহাজমালিক দাবি করেন, প্রণালিটি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার পেছনে তার চার্টারারের বাণিজ্যিক চাপ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি
ওয়াশিংটন অবশ্য এখনো দাবি করছে, তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো সফলভাবে অন্য একটি রুট দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালি থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে।
রোববার ফক্স নিউজকে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলরত অপরিশোধিত তেলের দৈনিক পরিমাণের ‘চলতি গড়’ প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল।
১৯ সেপ্টেম্বরের এক কার্যক্রম-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করে, প্রায় দুই মাসে তাদের বাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ১০০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল সরিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করতে তারা ১২২টি বাণিজ্যিক জাহাজকে অন্য পথে পরিচালিত করেছে। এর ফলে ইরানের সব ধরনের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে তারা।
তবে তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের ধারণা তৈরি করা যায়।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, সমুদ্রপথে হামলা চালানোর মাধ্যমে ইরান সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষতি নিজেদের সীমান্তের বাইরেও ছড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, মার্কিন নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে ক্ষতি পৌঁছালেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে—এমন ধারণা করা ভুল হবে।
ক্রিগ বলেন, “তাই ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্ভবত হবে উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর চাপ ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর চেষ্টা করা, কেবল আরও মার্কিন চাপ সহ্য করে যাওয়া নয়।”
তার ভাষায়, এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে আরও আগ্রাসীভাবে জাহাজ আটকে দেওয়া, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, বাব আল-মান্দাবে হুতিদের চাপ বাড়ানো এবং সৌদি আরবের বিকল্প রপ্তানি রুটের ওপর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর চাপ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “হরমুজ, লোহিত সাগর এবং সৌদি অবকাঠামোর ওপর চাপ কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, আমরা ইতিমধ্যে তার প্রভাব দেখতে পাচ্ছি।”
আরও উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরান কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সাতটি শর্ত পূরণ করা হলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড় করে দেওয়া এবং ইসরায়েলের লেবাননে হামলাসহ সব ফ্রন্টে হামলা বন্ধ করা।
এই দাবিগুলোর বেশির ভাগই জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সমান।
তেহরান আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কাজটি ওমানের সঙ্গে ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হওয়া একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে করতে হবে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পাশাপাশি ওমানই একমাত্র অন্য দেশ, যার আঞ্চলিক জলসীমা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার বলেন, তারা নিজেদের শর্তের ব্যাপারে অনড় এবং পাকিস্তান, কাতার ও ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় থাকবেন।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মুখপাত্র আবোলফজল শেখারচি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে আরও হস্তক্ষেপ করলে “চড় খাবে”।
তিনি বলেন, “পশ্চিম এশিয়া অঞ্চল থেকে সরে যাওয়া ছাড়া আমেরিকানদের আর কোনো পথ নেই। তারা যত দ্রুত চলে যাবে, তাদের ক্ষয়ক্ষতিও তত কম হবে এবং এরপর অঞ্চলটি অবশ্যই নিরাপদ হয়ে উঠবে।”
ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মাদ আক্রমিনিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি এতটাই খারাপের দিকে যাচ্ছে যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে আবারও “সামরিক আগ্রাসন” শুরু করতে পারে।
ক্রিগ বলেন, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে, তখন ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে পাল্টা আর্থিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা না থাকায় তেহরানকে হরমুজ প্রণালিতে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখার ওপর নির্ভর করতে হবে।
তিনি বলেন, “সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধের শুরুর মাসগুলোর মতো ব্যাপক বিমান হামলায় ফিরে না গিয়ে নিয়ন্ত্রিত ক্ষয়ক্ষতির একটি চক্র অব্যাহত রাখা।”
“আগামী কয়েক সপ্তাহে আমি ট্যাংকার, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক অবকাঠামোর ওপর আরও হামলা বা হামলার চেষ্টা দেখতে পাব বলে আশা করছি। এর পর আইআরজিসির সামুদ্রিক সম্পদ, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র অবস্থান, ড্রোন বা এসব কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত জাহাজের ওপর সীমিত মার্কিন হামলা হতে পারে। হরমুজকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি এই হামলার চক্র ইতিমধ্যে আবারও শুরু হয়েছে।”
