মুক্তেদেশ ডেস্ক: ইউক্রেনীয় রেলওয়েজের তথ্য অনুযায়ী, পোল্যান্ড-ইউক্রেন সীমান্তের কাছে একটি ট্রেনের ইঞ্জিনে আঘাত হানা রুশ ড্রোন হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বরিস জনসন এবং সাবেক সিআইএ প্রধান ডেভিড পেট্রিয়াসকে বহনকারী একটি ট্রেন।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রিই সিবিহা এই হামলাকে বলেছেন, “পুতিনের সন্ত্রাস সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর দরজায় কড়া নাড়ছে।”
রোববার রাত থেকে ইউক্রেনজুড়ে ৪৫০টিরও বেশি রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত এবং ৪০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, তারা ৪০৫টি ড্রোন ও চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
সাধারণত কিয়েভ বা পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রের তুলনায় অপেক্ষাকৃত শান্ত পশ্চিম ইউক্রেনও এসব হামলায় বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই হামলার কারণে ইউক্রেনের সঙ্গে সীমান্তবর্তী দেশ পোল্যান্ডেও বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়।
ইউক্রেন ও পোল্যান্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশের সীমান্তের দোরোহুস্ক-ইয়াহোদিন সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে ১ কিলোমিটারেরও কম দূরে একটি লরিও হামলার শিকার হয়।
উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কর্মরত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রতিষ্ঠান ডেইলি হিউম্যানিটির পরিচালক কাটেরিনা সারগাটস্কোভা ওয়ারশগামী একটি ট্রেনে ছিলেন এবং হামলাটি প্রত্যক্ষ করেন।
তিনি জানান, ট্রেনটি ইতোমধ্যে রাতের বেলা দুই ঘণ্টার জন্য থামার পর পোলিশ সীমান্তের দিকে এগোচ্ছিল। সকাল প্রায় ৯টার দিকে যাত্রীদের ট্রেন থেকে নেমে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়।
তিনি বলেন, “এবার পরিস্থিতির আবহ আলাদা ছিল। আমাদের খুব দ্রুত সরে যেতে বলা হয়। এরপর আমি প্রথম ড্রোনটি শুনতে পাই।”
“সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে শাহতেদ (Shahed) ড্রোন দেখা ও শোনা খুবই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা।”
ট্রেনটিতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত ট্রেন
ইউক্রেনীয় রেলওয়েজ পরিচালিত ওই রেলপথে হামলার সময় ঘটনাস্থলে থাকা এক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ, যিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি, জানান, তিনি কিয়েভ থেকে পোল্যান্ডের শেলমের দিকে যাওয়া একটি রাতের ট্রেনে ছিলেন।
তিনি বলেন, “আমরা সীমান্তে ১০ ঘণ্টা কাটিয়েছি এবং তিনবার আমাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। তৃতীয়বার সরিয়ে নেওয়ার সময় একটি ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের ট্রেনের সামনে এসে একটি লোকোমোটিভ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।”
রেলওয়ে কর্মকর্তারা যাত্রীদের একটি হ্রদের পাশে ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই অর্থনীতিবিদ ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়াকে “সময়োপযোগী ও সুশৃঙ্খল” বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, “তারা আমাদের যথেষ্ট আগে সতর্ক করেছিল এবং কীভাবে সরিয়ে নিতে হবে তার একটি পরিকল্পনা ছিল, যা সবাই অনুসরণ করেছে।”
তিনি আরও জানান, ট্রেনে ওঠার সময় কন্ডাক্টর যাত্রীদের সতর্ক করেছিলেন যে যাত্রাপথে তাদের সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তার কামরায় থাকা একজন নারী ও তার আট বছর বয়সী ছেলে ২০২২ সাল থেকে প্রতি মাসে ওয়ারশ ও কিয়েভের মধ্যে যাতায়াত করছিলেন। তাদের কখনো এভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়নি বা ট্রেন হামলার শিকার হয়নি।
ওই ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ বলেন, “এটি স্পষ্টতই পুতিন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঘটনা।”
জনসন ও পেট্রিয়াস কি লক্ষ্যবস্তু ছিলেন?
ইউক্রেনীয় রেলওয়েজ জানিয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা উপদেষ্টার পাশাপাশি সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং সাবেক সিআইএ প্রধান ডেভিড পেট্রিয়াসকে বহনকারী একটি ট্রেন ড্রোন হামলার কিছুক্ষণ আগে সীমান্ত পার হয়েছিল।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছে:
“সম্ভবত এই রুশ ড্রোনের লক্ষ্য ওই কূটনৈতিক ট্রেনটিও হতে পারে। রুশ হামলার অব্যাহত হুমকির কারণে বাস্তব সময়ে ট্রেনের সময়সূচি পর্যালোচনা করে ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেশন ছেড়ে যায়।”
বরিস জনসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এ লিখেছেন:
“পুতিনের কী বিকৃত যুক্তি ছিল, যার কারণে তিনি আজ সকালে পোলিশ সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ইউক্রেনীয় লোকোমোটিভ উড়িয়ে দিলেন, তা আমি জানি না। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ইউক্রেনীয়রা প্রতিদিন যে ধরনের এলোমেলো ও অর্থহীন হামলার মুখোমুখি হচ্ছে, এটি তারই একটি উদাহরণ—এমনকি বেসামরিক রেলপথেও।”
পূর্বাঞ্চলের দোনেৎস্ক অঞ্চলে তিনজন নিহত হন এবং দক্ষিণাঞ্চলের মাইকোলাইভ অঞ্চলে ৭১ বছর বয়সী এক নারী নিহত হন।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিবিহা বলেন, রুশ হামলা “শুধু আমাদের রাষ্ট্রীয় সীমান্তে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়।”
তিনি X-এ লেখেন:
“এটি পুতিনের সন্ত্রাস, যা সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রিয় অংশীদাররা, রুশ বর্বররা আপনাদের দরজায় এসে পৌঁছেছে।”
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি টেলিগ্রামে লেখেন:
“ইউক্রেনীয়রা প্রতিদিন লড়াই করছে, যাতে এসব হামলা ইউরোপের আরও গভীরে ছড়িয়ে না পড়ে। তারা নিজেদের জীবন দিয়ে এই আগ্রাসনকে আরও বিস্তৃত হওয়া থেকে ঠেকাচ্ছে।”
পোল্যান্ডের সতর্কতা
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক রোববার সতর্ক করে বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা আরও তীব্র হতে পারে এবং এর প্রভাব পোল্যান্ডেও পড়তে পারে।
রুশ ড্রোন হামলার পর তিনি ওয়ারশতে একটি জরুরি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
টাস্ক বলেন, “আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাস রাশিয়ার পক্ষ থেকে অত্যন্ত তীব্র কর্মকাণ্ডের সময় হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এই উত্তেজনা আমাদের ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়তে পারে—এ সম্ভাবনা আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না।”
টাস্ক জানান, পোল্যান্ডের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থা এবং মিত্র দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে থেকেই এমন হামলার সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করেছিল।
তিনি বলেন, “আমরা জানতাম, রাশিয়ার পরিকল্পনার মধ্যে ইউক্রেনীয় সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রগুলোকে অচল, পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং সম্ভবত ধ্বংস করার চেষ্টাও থাকতে পারে।”
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি, যিনি চলতি সপ্তাহে কিয়েভ সফর করেছিলেন, রোববারের হামলার পর X-এ লিখেছেন:
“পুতিন উত্তেজনা বাড়াচ্ছেন।”
পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্সিন কেরভিনস্কি বলেন:
“আমরা এসব ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। রাশিয়া মুক্ত বিশ্বের শত্রু।”
রাশিয়ার বক্তব্য
রাশিয়া দাবি করেছে, তারা পশ্চিম ইউক্রেনের এমন “রেলওয়ে অবকাঠামো” লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যা ইউরোপ থেকে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে:
“পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউক্রেনের রেলওয়ে অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রয়েছে। এসব অবকাঠামো ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হয়।”
ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয় দেশই একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা বাড়িয়েছে। দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুদ্ধের প্রভাব এখন সামনের সারির যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার বলেন, জেলেনস্কির উচিত “রাশিয়ায় ডিজেল জ্বালানির স্থাপনা ধ্বংস করা বন্ধ করা”, কারণ এর ফলে রাশিয়ায় জ্বালানির সংকট তৈরি হচ্ছে।
ট্রাম্প বলেন:
“তাকে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে দিন, কিন্তু ডিজেল জ্বালানির ওপর নয়। কারণ তিনি সেখানে ঘাটতি তৈরি করছেন।”
তিনি আরও বলেন, জ্বালানির ঘাটতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্টি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে নয়।
লিথুয়ানিয়াতেও সতর্কতা
লিথুয়ানিয়ায় রাজধানী ভিলনিয়াসের বিমানবন্দর একটি সম্ভাব্য ড্রোন দেখা যাওয়ার খবরের পর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সতর্কতার জবাবে ন্যাটো অন্তত একটি যুদ্ধবিমান আকাশে পাঠায়। পরে জানা যায়, কথিত ড্রোন আসলে একঝাঁক পাখি ছিল।
লিথুয়ানিয়ার কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রায় ৪০ মিনিট পর বিমানবন্দরটি আবার চালু করা হয়।
