মুক্তদেশ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে লন টেনিসের প্রচলন শুরু হয় ১৮৮০ সালের দিকে। তখন টেনিস বল সাধারণত কাগজের ব্যাগ বা কার্ডবোর্ডের বাক্সে বিক্রি হতো। ১৯২০-এর দশকের শেষদিকে পেনসিলভানিয়া রাবার কোম্পানি—যেটি পরে টেনিস সরঞ্জামের অন্যতম বড় ব্র্যান্ড Penn-এ পরিণত হয়—সিল করা ধাতব ক্যানের মধ্যে টেনিস বল বিক্রি শুরু করে।
এসব ক্যানের সঙ্গে একটি চাবি থাকত, যা সার্ডিন মাছের ক্যানের মতো করে উপরের অংশ খুলে দিত। তবে একবার খোলার পর সেগুলো আর পুনরায় সিল করা যেত না।
ইন্টারন্যাশনাল টেনিস হল অব ফেমের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ধাতুর সংকট দেখা দিলে কিছুদিন আবার কার্ডবোর্ডের ব্যবহার শুরু হয়। আর ক্রস মনে করতে পারেন, ১৯৫০-এর দশকেও তিনি টেনিস বল বাক্সে প্যাক করা অবস্থায় দেখেছেন।
১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে পুনরায় বন্ধ করা যায়—এমন ঢাকনা চালু হয়। ১৯৭২ সালে চাবির পরিবর্তে সহজে টেনে খোলা যায় এমন পপ-টপ ঢাকনা আসে। আর ১৯৮০-এর দশকে কোম্পানিগুলো ধাতব ক্যানের পরিবর্তে প্লাস্টিকের ক্যান ব্যবহার শুরু করে।
তাহলে টেনিস বল সিল করা ক্যানের মধ্যে কেন আসে?
সিল করা ক্যানের মাধ্যমে প্রস্তুতকারকেরা ক্যানের ভেতরের চাপ নির্দিষ্ট মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ফলে টেনিস বল যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় তার সর্বোচ্চ কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
এতে বলের বাউন্স বা লাফ ঠিক থাকে
প্রেসারাইজড টেনিস বল লাফায়, কারণ বলের ভেতরের বায়ুচাপ বাইরের বায়ুমণ্ডলীয় চাপের চেয়ে বেশি। বল যখন র্যাকেট বা কোর্টে আঘাত করে, তখন ভেতরের চাপযুক্ত বাতাস রাবারের ওপর চাপ দেয় এবং বলকে অতিরিক্ত চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া থেকে বাধা দেয়। ফলে বল আবার লাফিয়ে ওঠে।
ক্রস বলেন, “স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ১৪.৭ পিএসআই, কিন্তু বলের ভেতরের চাপ প্রায় ২৭ থেকে ২৯ পিএসআই।”
তাই ক্যানটি সিল করে ভেতরে চাপযুক্ত বাতাস রাখা হলে টেনিস বল তার প্রয়োজনীয় পরিবেশে থাকে এবং ঠিকভাবে বাউন্স করতে পারে।
আপনি চাইলে এটি পরীক্ষা করেও দেখতে পারেন। নিয়ম অনুযায়ী হার্ড কোর্টে ব্যবহৃত টেনিস বল—যাকে টাইপ ২ বা মিডিয়াম বলা হয়—১০০ ইঞ্চি উচ্চতা থেকে ফেলা হলে ৫৩ থেকে ৫৮ ইঞ্চি পর্যন্ত ফিরে লাফাতে হবে।
এতে বলের ভেতরের বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে না
ক্রস বলেন, “চাপযুক্ত বলকে চাপযুক্ত ক্যানের মধ্যে বিক্রি করা হয়, যাতে ছিদ্রযুক্ত রাবারের দেয়াল দিয়ে ধীরে ধীরে বাতাস বেরিয়ে যেতে না পারে।”
টেনিস বলের ভেতরে একটি ফাঁপা রাবারের কোর থাকে, যা পুরোপুরি বায়ুরোধী নয়। একবার এই রাবারের কোর তৈরি করে তার ওপর ফেল্ট বা লোমশ আবরণ লাগানো হলে আর সেটিতে ফুটবল বা সকার বলের মতো পাম্প দিয়ে বাতাস ঢোকানোর কোনো উপায় থাকে না।
এ কারণেই প্রেশারলেস টেনিস বল অনুশীলন ও বল মেশিনে ব্যবহারের জন্য জনপ্রিয়। এসব বলের বাউন্স আসে তুলনামূলক মোটা ও শক্ত রাবার থেকে, ভেতরের বায়ুচাপের পার্থক্য থেকে নয়।
ক্রস বলেন, “প্রেশারলেস বল বেশি দিন টেকে, কারণ এর ভেতরের বাতাস বেরিয়ে যায় না।”
এতে বলের সংরক্ষণকাল বাড়ে
সিল করা ক্যান টেনিস বলকে দীর্ঘ সময় সতেজ রাখে।
প্রেসারাইজড টেনিস বল ধীরে ধীরে বাতাস হারায়। ফলে পুরোনো দিনে কার্ডবোর্ডের বাক্সে বল প্যাক করার কারণে বল দোকানে পৌঁছানোর আগেই কিছুটা বাতাস ও বাউন্স হারিয়ে ফেলত।
তখন খেলোয়াড়দের ভালো বল বেছে নিতে বল চেপে পরীক্ষা করতে হতো। অর্থাৎ নতুন বল সত্যিই নতুন আছে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার উপায় ছিল না।
এখন আর সেই সমস্যা নেই।
উদাহরণ হিসেবে লেখক বলেন, তাঁর গ্যারেজে কয়েকটি না-খোলা টেনিস বলের ক্যান রয়েছে। কয়েক মাস আগে তিনি এক কার্টন বল কিনেছিলেন, সেখান থেকে এগুলো বাকি আছে। কিন্তু এখন সেগুলো খুললেও বল খারাপ হয়ে যাবে—এমন চিন্তা তাঁর নেই। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে রাখা হলেও খোলা অবস্থায় বা কার্ডবোর্ডের বাক্সে রাখা বলের তুলনায় সেগুলো অনেক ভালো অবস্থায় থাকবে।
ক্যানের মধ্যে টেনিস বল কত দিন ভালো থাকে?
লেখকের গ্যারেজে থাকা Penn বলের ক্যানের গায়ে কোনো মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ নেই। Wilson-এর ক্ষেত্রেও তিনি এমন কোনো তারিখ খুঁজে পাননি। তাই মনে হতে পারে, এগুলো হয়তো অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত ভালো থাকবে।
তবে বেশির ভাগ টেনিস পেশাদার না-খোলা ক্যানের বলের সতেজতার সময়সীমা ছয় মাস থেকে এক বছর বলে মনে করেন। সর্বোচ্চ সময় হিসেবে দুই বছর ধরা হয়।
কিন্তু ক্যান খুললেই সময় গণনা শুরু হয়ে যায়।
ক্রস বলেন, “খোলার পরও প্রেসারাইজড ক্যানের বল কয়েক সপ্তাহ ব্যবহার করা যায়।”
তবে উইম্বলডনে কোনো পেশাদার খেলোয়াড়কে তিন সপ্তাহ আগে খোলা বল ব্যবহার করতে দেখা যাবে না। এসব বল বরং আমাদের মতো সাধারণ খেলোয়াড়দের রোববার সকালে খেলার জন্য যথেষ্ট।
তবু কয়েক দফা জোরে খেলার পরই বলের অনুভূতিতে পরিবর্তন টের পাওয়া যায়।
ক্রস বলেন, “অপেশাদার পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় প্রতিটি সকাল বা বিকেলের ইভেন্টের জন্য নতুন বল ব্যবহার করা হয়। আর পেশাদার পর্যায়ে প্রতি নয় গেম পরপর নতুন বল ব্যবহার করা হয়।”
বল যত বেশি আঘাত পায়, তার ফেল্টের আবরণ তত বেশি ফুলে ওঠে বা এলোমেলো হয়ে যায়। এতে বাতাসের মধ্যে বলের গতি কমে যায়।
ক্রস বলেন, “এ কারণেই পেশাদার খেলোয়াড়েরা সার্ভ করার জন্য তিনটি বল নেন, তারপর সবচেয়ে বেশি ফুলে যাওয়া ফেল্টের বলটি বাদ দেন।”
টেনিস বলের ক্যান খোলার সময় ‘পসসসশশ’ শব্দ কেন হয়?
ক্যান খুললে যে স্বতন্ত্র ‘হুইশ’ বা ‘পসসসশশ’ শব্দ শোনা যায়—যার সঙ্গে প্রায়ই নতুন টেনিস বলের পরিচিত গন্ধও পাওয়া যায়—সেটি আসলে ক্যানের ভেতরের চাপযুক্ত বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার শব্দ।
ক্যানের ঢাকনা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের উচ্চচাপের বাতাস ছোট্ট খোলা অংশ দিয়ে বাইরের নিম্নচাপের পরিবেশে দ্রুত বেরিয়ে আসে। এতে শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি হয়, যা খোলার অংশ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
পুরোনো টেনিস বল কি আবার ভালো করা যায়?
হ্যাঁ। একেবারে নতুন বলের মতো হবে না, তবে আপনার প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করে কাছাকাছি অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ক্রস বলেন, “পুরোনো বল কয়েক দিনের জন্য একটি চাপযুক্ত পাত্রে রেখে আবার প্রেসারাইজ করা যায়। তবে বাইরের ফেল্টের আবরণ তখনও ফুলে থাকা বা ক্ষয়ে যাওয়া অবস্থায় থাকবে।”
টার্গেট ও টেনিস ওয়্যারহাউসে ২০ ডলারের কম দামে সাধারণ ধরনের বল প্রেসারাইজার পাওয়া যায়। আরও উন্নত ধরনের প্রেসারাইজারের দাম অনলাইনে প্রায় ৭৫ ডলার থেকে শুরু করে আরও বেশি হতে পারে।
সব টেনিস বল কি ক্যানের মধ্যে আসে?
না।
ক্রস বলেন, “প্রেশারলেস বল কার্ডবোর্ডের বাক্সে বিক্রি হয়।”
এসব বলের ভেতরের বাতাসের চাপ স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপের সমান। তাই এগুলোকে চাপযুক্ত ক্যানের মধ্যে রাখার প্রয়োজন নেই। প্রচুর পরিমাণে কিনলে প্রেশারলেস টেনিস বল জালের ব্যাগেও পাওয়া যায়।
প্রেশারলেস টেনিস বলের পেটেন্ট ১৯৫৫ সালে সুইডিশ জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান Tretorn করেছিল। ক্রস বলেন, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকায় এসব বল বেশ জনপ্রিয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রেও এগুলোর ব্যবহার বাড়ছে।
প্রেসারাইজড টেনিস বলের প্লাস্টিকের ক্যান ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে Wilson নতুন ধরনের প্রেশারলেস বল তৈরি করেছে, যার নাম Triniti। এটি প্রেসারাইজড বলের মতো প্রাণবন্ত বাউন্স, দ্রুত খেলা এবং হালকা অনুভূতি দেওয়ার চেষ্টা করে।
এসব বল পুনর্ব্যবহারযোগ্য কার্ডবোর্ডের বাক্সে বিক্রি করা হয়।
অন্য কোনো বল কি ক্যানের মধ্যে বিক্রি হয়?
কিছু বল হয়, তবে খুব বেশি নয়। কারণটা সহজ।
ক্রস বলেন, “অন্য বলগুলোকে এয়ার পাম্প দিয়ে সঠিক চাপে আবার ফুলিয়ে নেওয়া যায়।”
অবশ্য কিছু বল আছে যেগুলোতে বাতাস বা চাপের কোনো ভূমিকা নেই।
প্যাডেল বল
টেনিস বলের খুব কাছের আত্মীয় প্যাডেল বলেও ফাঁপা রাবারের কোর ও ফেল্টের আবরণ থাকে। এগুলোও চাপযুক্ত পপ-টপ ক্যানের মধ্যে বিক্রি হয়। তবে টেনিস বলের তুলনায় এগুলো নরম এবং বেশি নমনীয়।
র্যাকেটবল
ফাঁপা ও বাতাসপূর্ণ র্যাকেটবলের বাউন্স আসে মূলত রাবারের খোলস থেকে, ভেতরের বাতাস থেকে নয়। অর্থাৎ অনেকটা প্রেশারলেস টেনিস বলের মতো।
তাই এগুলো প্রায়ই ক্যানের মধ্যে বিক্রি করা হলেও ক্যানগুলো চাপযুক্ত নয়। মূলত রাবারকে সতেজ রাখার জন্যই ক্যান ব্যবহার করা হয়।
পিকলবল
টেনিস খেলোয়াড়দের চিরশত্রু পিকলবল—মজা করছি, পিকলবল খেলোয়াড়েরা কিছু মনে করবেন না!—প্লাস্টিকের তৈরি এবং অনেকটা ছিদ্রযুক্ত হুইফল বলের মতো।
এগুলো ফাঁপা এবং এতে একাধিক ছিদ্র থাকে। তাই এগুলো ব্যাগ, বাক্স বা অন্য কোনো স্বাভাবিক প্যাকেজে বিক্রি করা হয়; চাপযুক্ত পাত্রের প্রয়োজন হয় না।
ফুটবল, সকার বল ও বাস্কেটবল
বড় আকারের বাতাসপূর্ণ এসব বল সাধারণত খোলা অবস্থায় বা বাক্সে বিক্রি হয়। পরে সাইকেলের পাম্প বা এয়ার কমপ্রেসর দিয়ে বাতাস ভরা যায়।
আপনি যদি কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যারেজ বা বাড়ির নানা ড্রয়ারে পাম্পের ছোট্ট সূচযুক্ত মুখ খুঁজে থাকেন, তাহলে বিষয়টির যন্ত্রণা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন!
এসব বল একসময় বাতাস হারিয়ে ফেলবে। তবে দ্রুত একটু পাম্প করলেই আবার ব্যবহার করা যাবে।
বেসবল ও গলফ বল
এসব বলের ভেতরে শক্ত কোর থাকে এবং এতে কোনো বাতাস থাকে না। তাই এগুলোকে চাপের মধ্যে রেখে বিক্রি বা সংরক্ষণ করার প্রয়োজন নেই।
বছরের পর বছর সংরক্ষণ বা ব্যবহারের ফলে এগুলো পুরোনো ও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে কিংবা কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। কিন্তু এসব বলের ভেতরের বাতাস বেরিয়ে গিয়ে বল চুপসে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
