এম. হাসান : মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত চাপে থাকলে বাইরে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে হওয়া নিছক মনের ব্যাপার নয়—কেন খোলা বাতাসে কিছুক্ষণ থাকলে এতটা স্বস্তি লাগে, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
মূল কথা
- মানসিক চাপ বা ক্লান্তির সময় বাইরে বেরিয়ে গেলে ভালো লাগার পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে।
- প্রকৃতির মধ্যে কিছু সময় কাটালে অতিরিক্ত কাজ করা মস্তিষ্ক বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেতে পারে।
- এর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে থাকতে হয় না—অল্প সময়ের বিরতিও উপকার করতে পারে।
অস্থির লাগছে, কারও সঙ্গে তর্কের মধ্যে আছেন, কিংবা অফিসের কাজ থেকে একটু বিরতি দরকার—এমন নানা পরিস্থিতিতে একটি বাক্য বেশ মানিয়ে যায়: “আমার একটু খোলা বাতাস দরকার।”
অনেকের ক্ষেত্রেই বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার এই তাগিদ প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত—মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত চাপে পড়লে এটি যেন স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এমনটা কেন হয়?
বাইরে বেরিয়ে আসার উপকারিতা হয়তো সহজেই বোঝা যায়, তবে প্রকৃতি কেন আমাদের এত ভালো অনুভব করায়, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কিছুটা জটিল। প্রকৃতির মনস্তাত্ত্বিক ও জ্ঞানীয় প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেছেন, খোলা বাতাসে শ্বাস নেওয়া কেন এতটা স্বস্তিদায়ক মনে হয়, এতে মস্তিষ্কে কী ঘটে এবং বাইরে কতক্ষণ থাকলে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
খোলা বাতাসে শ্বাস নিলে এত ভালো লাগে কেন?
মুখে সূর্যের আলো পড়ছে, এমন অবস্থায় বাইরে একটু বিরতি নিলে তাৎক্ষণিকভাবে ভালো লাগতে পারে। কিন্তু ঠিক কেন এমন হয়?
এর উত্তর একেবারে সরল নয়।
ভারমন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং নেচার অ্যান্ড কগনিশন ল্যাবের পরিচালক এমিলি স্কট বলেন, “প্রকৃতির মনস্তাত্ত্বিক, শারীরবৃত্তীয় ও জ্ঞানীয় প্রভাব নিয়ে যত বেশি গবেষণা হচ্ছে, আমরা ততই বুঝতে পারছি যে প্রকৃতি আমাদের যেভাবে অনুভব করায়, তার কারণ অন্য অনেক ঘটনার মতোই একেবারে স্পষ্ট বা সরল নয়।”
তবে গবেষকদের কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সিভার কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জ্যানেট ট্রামেল বলেন, “কেউ কেউ মনে করেন, মানুষ জৈবিকভাবেই প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অভিযোজিত। তাই প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো আমাদের পুনরুজ্জীবিত করে এবং সুস্থতার জন্য উপকারী।”
অন্যদিকে, ড. ট্রামেলের মতে, উপকারের কারণ প্রকৃতি নিজে নাও হতে পারে; বরং প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকা সৌন্দর্যের মতো বৈশিষ্ট্যগুলোই এর জন্য দায়ী হতে পারে। তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াটি যাই হোক না কেন, গবেষণা দেখায় যে প্রকৃতির সংস্পর্শ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।”
মানসিক চাপের সময় বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদের ব্যাখ্যা হিসেবে ড. স্কট ‘বায়োফিলিয়া হাইপোথিসিস’-এর কথা উল্লেখ করেন। এই ধারণা অনুযায়ী, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি সহজাত প্রয়োজন মানুষের রয়েছে। তিনি বলেন, “মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশে বিবর্তিত হয়েছে এবং আমাদের বিবর্তনের অধিকাংশ সময় সেখানেই কেটেছে। আমরা যখন মানসিকভাবে চাপে থাকি বা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন প্রায়ই সবকিছু থেকে দূরে সরে যেতে চাই। বাইরে বেরিয়ে যাওয়া সেই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ পাওয়ার একটি নির্ভরযোগ্য উপায় হতে পারে।”
বাইরে বের হলে মস্তিষ্কে কী ঘটে?
কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির জ্ঞানীয় স্নায়ুবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক অ্যামি ম্যাকডোনেল বলেন, আমাদের আধুনিক পরিবেশগুলো সব সময় খুব একটা আরামদায়ক নয়। ফলে আমরা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারি।
ড. ম্যাকডোনেল ব্যাখ্যা করেন, “আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আধুনিক, ঘরোয়া ও শহুরে পরিবেশে ক্রমাগত মনোযোগ ধরে রাখা, নানা বিভ্রান্তি ছেঁকে বাদ দেওয়া, নোটিফিকেশনের জবাব দেওয়া, যান চলাচল সামলানো, চারপাশ পর্যবেক্ষণ করা, প্রযুক্তি ব্যবহার করা, বাধা সামলানো এবং এক কাজ থেকে আরেক কাজে দ্রুত বদলাতে হয়। এসবের জন্য প্রচেষ্টাসাপেক্ষ, নির্দেশিত মনোযোগ দরকার।”
সময়ের সঙ্গে এই ধারাবাহিক চাহিদাগুলো আমাদের বেশ ক্লান্ত করে তুলতে পারে। এখানেই বাইরে বেরিয়ে যাওয়া উপকারী হতে পারে।
ড. ম্যাকডোনেল বলেন, প্রকৃতির মধ্যে থাকলে আমরা যা দেখছি বা শুনছি, সেদিকে এতটা কঠোরভাবে মনোযোগ দিতে হয় না। বরং প্রকৃতি আরও স্বাভাবিক ও অনায়াসে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। “পাতার নড়াচড়া, পাখির ডাক, পানির প্রবাহ বা আলোর বদলে যাওয়া নকশার মতো নতুন কিছু আমরা ইচ্ছা করে মনোযোগ না দিলেও লক্ষ্য করতে পারি। এই প্রক্রিয়াকে কখনো কখনো ‘সফট ফ্যাসিনেশন’ বলা হয়।”
‘সফট ফ্যাসিনেশন’-এর ধারণা হলো, প্রকৃতি আমাদের মনোযোগ এতটাই আকর্ষণ করে যে আমরা আগ্রহী থাকি, কিন্তু দৈনন্দিন কাজের মতো অতিরিক্ত প্রচেষ্টাসাপেক্ষ মনোযোগের প্রয়োজন হয় না।
ড. ম্যাকডোনেলের ২০২৪ সালের একটি গবেষণায়, যা Scientific Reports জার্নালে প্রকাশিত হয়, প্রকৃতির মধ্যে ৪০ মিনিট হাঁটার সঙ্গে শহুরে পরিবেশে ৪০ মিনিট হাঁটার তুলনা করা হয়। পরে দেখা যায়, প্রকৃতির মধ্যে হাঁটা অংশগ্রহণকারীরা মনোযোগ-সংক্রান্ত পরীক্ষায় শহুরে পরিবেশে হাঁটা অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় ভালো ফল করেছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের ধারণা, এর কারণ হতে পারে প্রাকৃতিক পরিবেশ হাঁটার সময় মস্তিষ্কের মনোযোগ-নিয়ন্ত্রণকারী নেটওয়ার্কগুলোকে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিয়েছিল। ফলে পরে কঠিন মনোযোগের কাজ করার জন্য তারা আরও ভালোভাবে প্রস্তুত ছিল।”
অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির মধ্যে হাঁটা মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশেও প্রভাব ফেলতে পারে, যেগুলো মানসিক চাপ ও একই ধরনের নেতিবাচক চিন্তায় বারবার আটকে থাকার সঙ্গে যুক্ত।
ড. ম্যাকডোনেল বলেন, “শেষ পর্যন্ত আমরা মনে করি, মস্তিষ্কের এসব পরিবর্তনই ব্যাখ্যা করতে পারে কেন প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর পর মানুষ নিজেকে বেশি মনোযোগী, সুখী এবং কম চাপগ্রস্ত বলে অনুভব করে।”
খোলা বাতাসে বিরতি নিলে কত দ্রুত উপকার পাওয়া যায়?
বাইরে থাকার আদর্শ সময় কত, তা বিশেষজ্ঞরা এখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। তবে ড. ম্যাকডোনেল জানান, ক্রমবর্ধমান প্রমাণ বলছে, প্রকৃতির উপকার বেশ দ্রুতই অনুভূত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক পরিবেশে মাত্র ১০ মিনিট বসে থাকা বা হাঁটাও কলেজপড়ুয়া তরুণদের মেজাজ, মনোযোগ ও মানসিক চাপের সূচকে উন্নতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
কত ঘন ঘন বাইরে যাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ড. স্কট এমন গবেষণার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে প্রকৃতির মধ্যে বেশি ঘন ঘন সময় কাটানোর সঙ্গে উন্নত মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার উপকার একপর্যায়ে স্থির হয়ে যেতে পারে।
প্রকৃতির মধ্যে থাকার “ন্যূনতম কার্যকর মাত্রা” নির্ধারণের চেষ্টা এখনো চলছে। ড. ম্যাকডোনেল বলেন, “এখন পর্যন্ত প্রমাণ বলছে, তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ঠিক কতটা প্রকৃতি যথেষ্ট, কার জন্য কতটা প্রয়োজন এবং কোন ফলাফলের ক্ষেত্রে কতটা উপকার হয়—এসব আমরা এখনো নির্ধারণ করছি।”
অল্প খোলা বাতাসও অনেক উপকার করতে পারে
ভালো খবর হলো, খোলা বাতাসে বিরতি নেওয়ার জন্য জটিল কিছু করার দরকার নেই।
ভালো বোধ করার জন্য বাইরে গিয়ে ব্যায়াম করা বা দীর্ঘক্ষণ হাঁটা জরুরি নয়। যদিও ব্যায়ামের শারীরিক, জ্ঞানীয় ও মানসিক স্বাস্থ্যগত উপকার রয়েছে বলে জানান ড. ম্যাকডোনেল। পরেরবার খোলা বাতাসে যাওয়ার সময় ড. ট্রামেল যে কাজই বেছে নিন, সেটিতে সচেতনভাবে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন—এমনকি শুধু বসে আবহাওয়া উপভোগ করলেও।
তিনি বলেন, “কাজটি কী, তার চেয়ে আপনি কতটা মনোযোগ দিয়ে সেটিতে যুক্ত হচ্ছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বসে থাকা, ধ্যান করা, হাঁটা বা বাগান করা—যেকোনোভাবেই প্রকৃতির মধ্যে থাকার উপকার পাওয়া যায়। মূল বিষয় শুধু শারীরিক সক্রিয়তা নয়, মানসিক সক্রিয়তাও। স্মার্টফোন বা যে ই-মেইলের জবাব দিতে হবে, সেসব নিয়ে ভাবার বদলে আশপাশের গাছপালা বা দৃশ্যের দিকে মনোযোগ দিলে প্রকৃতির মধ্যে কাটানো সময়ের উপকার সর্বাধিক করা যায়।”
অর্থাৎ, পরেরবার যখন মনে হবে আপনার একটু খোলা বাতাস দরকার, তখন সেই তাগিদকে গুরুত্ব দেওয়াই ভালো।
