মুক্তদেশ ডন: একসময় সমৃদ্ধ প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে উপকূলীয় জনগোষ্ঠী, মৎস্য ও কৃষিকে টিকিয়ে রাখা সিন্ধু বদ্বীপ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে, ভাঙনের শিকার হচ্ছে এবং দেবে যাচ্ছে। বদ্বীপের নিম্নাঞ্চলে পর্যাপ্ত মিঠাপানি ও পলি পৌঁছাচ্ছে না। ফলে ঠাট্টা, সুজাওয়াল ও কেটি বন্দরের উপকূলীয় এলাকাগুলো ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। নদী ও সমুদ্রনির্ভর জীবিকা ছেড়ে বাসিন্দাদের অনেকেই অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
মঙ্গলবার পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলে এক বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এ উদ্বেগের কথা জানান। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, বদ্বীপের অবক্ষয় শুধু সিন্ধুর উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সংকট নয়। ম্যানগ্রোভ ধ্বংস, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভেতরে ঢুকে পড়া এবং প্রাকৃতিক উপকূলীয় ব্যবস্থার ক্ষয় করাচিকেও বন্যা, লবণাক্ততা ও জলবায়ুজনিত অন্যান্য ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।সূত্র : দ্য ডন
পানি বিশেষজ্ঞ নাসির মেমন রচিত বইটির নাম দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারিং ডেল্টা: ইকোলজিক্যাল ডেভাস্টেশন অ্যান্ড ইমপেরিল্ড লাইভলিহুড ইন দ্য ইন্দাস ডেল্টা।
অনুষ্ঠানে নাসির মেমন বলেন, সিন্ধু বদ্বীপ নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। তবে তরুণ প্রজন্মের কাছে বিষয়টি সহজবোধ্য করে তুলতে এবং সংকট সম্পর্কে বৃহত্তর সচেতনতা তৈরি করতে তিনি বইটি ইংরেজিতে লিখেছেন।
আর্টস কাউন্সিলে ‘দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারিং ডেল্টা’ বইয়ের প্রকাশনা
তিনি বলেন, বদ্বীপের ধীরে ধীরে অবনতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে সেচ অবকাঠামো নির্মাণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ১৮৫৯ সালে আপার বারি দোয়াব খাল নির্মাণের মধ্য দিয়ে বদ্বীপের পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাঁধ ও খাল নির্মাণসহ বিভিন্ন হস্তক্ষেপ নদী ব্যবস্থায় পানির বণ্টন ও প্রাপ্যতাকে আরও বদলে দেয়।
নাসির মেমন সমুদ্রে প্রবাহিত পানিকে ‘অপচয়’ হিসেবে বর্ণনা করার দীর্ঘদিনের প্রবণতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের বক্তব্য নদী ও বদ্বীপের প্রাকৃতিক কার্যপ্রণালি সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচয়। তাঁর ভাষায়, “বদ্বীপ ও জেলেদের জন্য পানি কি অপচয়? এটা কতটা অমানবিক!” তিনি বলেন, বদ্বীপের প্রতিবেশব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সমুদ্রে মিঠাপানি পৌঁছানো অপরিহার্য। বদ্বীপের পানির প্রয়োজনকে প্রাকৃতিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
লেখক আরও সতর্ক করে বলেন, বদ্বীপের অবক্ষয় ঠাট্টা, বাদিন ও সুজাওয়ালের মানুষের ওপর ইতিমধ্যে গুরুতর সামাজিক প্রভাব ফেলছে। ঐতিহ্যবাহী জীবিকার উৎসগুলো ক্রমেই সংকুচিত হওয়ায় এসব এলাকার জনগোষ্ঠী ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের’ মুখে পড়েছে।
ম্যানগ্রোভ বন উজাড় হয়ে যাওয়াও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ব্যাপকতার আরেকটি প্রমাণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। নাসির মেমন বলেন, “এই পুরো অবক্ষয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত করাচির ওপরও পড়বে।” তিনি আরও বলেন, মহানগরটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে; তাই বিষয়টিকে আর শুধু ঠাট্টা বা বাদিনের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সাংবাদিক শাবিনা ফারাজ বলেন, সিন্ধু বদ্বীপকে শুধু ‘সিন্ধুর সমস্যা’ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, সিন্ধু একটি জাতীয় প্রতিবেশব্যবস্থা, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে। তিনি বলেন, “সিন্ধু শুধু সিন্ধুর বিষয় নয়। একটি সুস্থ বদ্বীপ সমৃদ্ধ পাকিস্তানের জন্য অপরিহার্য, আর দেশের মানুষের এ গুরুত্ব বুঝতে হবে।”
পরিবেশবিদ আফিয়া সালাম বলেন, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ধু নদীর গুরুত্ব পড়ানো ও আলোচনা করা দরকার। এতে তরুণ প্রজন্ম বুঝতে পারবে, বদ্বীপ কোনো একটি প্রদেশের সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় সম্পদ।
সিন্ধু নদী ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এহসান লাঘারি বলেন, বইটিতে বিভিন্ন ঘাটতির পাশাপাশি এমন কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে, যা ফেডারেল ও সিন্ধু সরকার বিবেচনা করতে পারে। বদ্বীপের পরিস্থিতির উন্নতিতে সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
লেখক নূরুল হুদা শাহ বলেন, এই সংকট ভূমি ও নদীর সঙ্গে সমাজের দুর্বল হয়ে পড়া সম্পর্কেরও প্রতিফলন। মানুষ প্রায়ই জমিকে শুধু ব্যবহারিক উপযোগিতার দৃষ্টিতে দেখে; এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে না। তাঁর মতে, মানুষ সিন্ধু নদীর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি না করলে নদী, বদ্বীপ এবং নদীতীরবর্তী জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো পুরোপুরি বুঝতে পারবে না।
