মুক্তদেশ ডেস্ক: মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে যে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছেন, তা বাস্তবে কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে সংঘাতের পথে ঠেলে দিতে পারে।
তবে এটি ঘটবে কেবল তখনই, যদি বেসেন্ট সত্যিই সেই হুমকি বাস্তবায়ন করেন। কারণ এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনও একই ধরনের হুমকি দিয়েছিল। বিশেষ করে চীনের ক্ষেত্রে বেসেন্ট তা বাস্তবায়ন করবেন কি না, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। কারণ ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল চীন কিনে থাকে। একই সময়ে ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের সঙ্গে ভঙ্গুর বাণিজ্যিক সমঝোতা বজায় রাখার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা এড়ানোর চেষ্টা করছে।
সোমবার বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে “বিশ্বজুড়ে আর্থিক সংযোগের ওপর অর্থনৈতিক আক্রমণ” চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন। মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের অজনপ্রিয় যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চেষ্টা চলার মধ্যেই তিনি এ ঘোষণা দেন।
বেসেন্ট কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। তবে তার উচ্চপ্রচারিত সংবাদ সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কোম্পানি ও দেশগুলোর বিরুদ্ধে তথাকথিত সেকেন্ডারি স্যাংশন বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি।
ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। একই সঙ্গে তেহরানের জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও চীন। ফলে ইরানি সরকারের অবশিষ্ট রাজস্বের উৎসগুলো সত্যিকার অর্থে বন্ধ করে দিতে চাইলে চীনা কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু না করে তা করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের তেল কেনা যেকোনো দেশ বা কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেননি।
নতুন পদক্ষেপটি সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ানোর হুমকি থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক চাপের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে মনোযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীনকে বাদ দিয়ে এ ধরনের অভিযান চালানো হলে ইরানের ওপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে চীনা কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করলে বেইজিং পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এর একটি কারণ হলো, চীনা কোম্পানিগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করলে বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সংঘাত শুরু হতে পারে। আর এটি ঘটবে এমন এক সময়ে, যখন সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের কথা রয়েছে—অর্থাৎ সম্ভাব্য বৈঠকের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে।
সোমবার চীনকে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে কি না, সরাসরি জানতে চাইলে বেসেন্ট বলেন, “কেউই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে নয়।” তবে তিনি জানান, তিনি “নীরব কূটনীতি” পছন্দ করেন এবং বলেন, “আমরা কারও নাম প্রকাশ করতে যাচ্ছি না।”
ওয়াশিংটনভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের সিনিয়র ফেলো ক্রেইগ সিঙ্গেলটন বলেন, “বেসেন্ট চীন নিয়ে করা প্রশ্নগুলো অনেকটাই এড়িয়ে গেছেন। আগামী মাসের শীর্ষ বৈঠকের আগে কৌশলগতভাবে এটি যুক্তিসংগত। তবে কৌশলগতভাবে এর ফলে বেইজিংয়ের এই ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে যে, বড় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গুরুতর মূল্য চাপাতে ওয়াশিংটন অনিচ্ছুক।”
চীন দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা অবৈধ।
চীনের রাষ্ট্রীয় খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমিত রাখা এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বজায় রাখার জন্য বেশির ভাগ নিষেধাজ্ঞা মেনে চললেও বেইজিং বেসরকারি ছোট পরিশোধনাগারগুলোকে—যেগুলোকে ‘টিপট রিফাইনার’ বলা হয়—বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে ইরানের অপরিশোধিত তেল আমদানি ও পরিশোধনের সুযোগ দিয়ে আসছে।
মে মাসে চীন অভ্যন্তরীণ কোম্পানিগুলোকে পাঁচটি পরিশোধনাগারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা না মানার নির্দেশ দেয়। এ সময় চীনের বৃহৎ ব্যাংকগুলো বেইজিংয়ের নির্দেশনা এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারানোর ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, “নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগের কৌশল কোনো সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে না। এগুলো শুধু এমন উত্তেজনা বাড়াবে, যা কারও স্বার্থে আসে না।”
যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের বিরুদ্ধে কার্যকর ও বড় ধরনের ব্যবস্থা নেয়—যেমন কোনো চীনা ব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করে—তাহলে বেইজিং এটিকে “শুধু অস্থিতিশীল ও অপমানজনক পদক্ষেপ হিসেবেই নয়, ট্রাম্প ও শির মধ্যে আগে হওয়া বাণিজ্যিক সমঝোতার লঙ্ঘন হিসেবেও” দেখবে বলে মনে করেন হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মাইকেল সোবোলিক।
তার মতে, এর জবাবে চীন এমন কিছু পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এর মধ্যে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে আরও বিধিনিষেধ আরোপ অথবা যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ রপ্তানি সীমিত করার মতো পদক্ষেপ থাকতে পারে।
ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা আরও বাড়ার আশঙ্কা
বৃহত্তর অর্থে বেসেন্টের নতুন নিষেধাজ্ঞা অভিযান ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে তৈরি হওয়া ব্যাপক অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সংকটস্থল হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ ও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
এর ফলে তেল ও গ্যাসের দামে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। পরিবহন, সার এবং অন্যান্য উৎপাদন উপকরণের খরচ বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মধ্যে পড়েছে। পণ্য পরিবহন ও বিমার খরচ বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে বেসেন্ট স্বীকার করেছেন যে অতিরিক্ত দ্রুত বা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে দেশ ও কোম্পানিগুলোকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সুযোগ দেওয়া হবে। কারণ এসব নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বৈশ্বিক বাজারেও পড়তে পারে।
বেসেন্ট বলেন, “আমরা সবাইকে তাদের ভুল আচরণ সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছি। আমি কেন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চাইব?”
রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল।
তখন যুক্তরাষ্ট্র ৩০টিরও বেশি দেশের একটি জোট গড়ে তোলে। তারা রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করে, ব্যাংকগুলোকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং মস্কোর প্রযুক্তি পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে।
এসব পদক্ষেপ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলেও দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে পারেনি। রাশিয়া চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর দিকে বাণিজ্য ঘুরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।
অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
রাশিয়ার জ্বালানি থেকে আয় কমানোর মার্কিন প্রচেষ্টাকেও জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকির সঙ্গে ভারসাম্য রাখতে হয়েছিল। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে রাশিয়ার আয়ও বেড়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলো রুশ তেলের জন্য একটি মূল্যসীমা নির্ধারণ করে। কিন্তু তাতেও যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
চীনকে লক্ষ্য করলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে
তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে সংঘাত অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে। এতে শুধু চীন নয়, ভারত, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক এবং সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপদেষ্টা ভ্যালি নাসর।
নাসর বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করে নিজের সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তির মধ্যে অনেক বড় একটি যুদ্ধে পরিণত করছে।”
