মুক্তদেশ ডেস্ক: নাসিরাবাদে ভোরের আলো ফুটতেই শহরের বরফ কারখানার সামনে পুরুষ, নারী ও শিশুদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কারও হাতে বালতি, কারও হাতে বস্তা, আবার কেউ প্লাস্টিকের পাত্র নিয়ে অপেক্ষা করছে। আরেকটি প্রচণ্ড গরম দিন পরিবারের সঙ্গে কাটাতে কিছু বরফ কেনার আশায় তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে ১২ বছরের তাইমুর। স্কুলের পোশাক পরা ছেলেটি বলছে, প্রতিদিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজই হলো বরফ সংগ্রহ করা।
“আমি যদি বরফ না আনি, তাহলে বাড়িতে আমরা কীভাবে এই গরম সহ্য করব?” তাইমুর বলে। “আর ফুটন্ত পানির মতো গরম পানি আমরা খাবই বা কীভাবে?”
নিজের বরাদ্দের বরফ সংগ্রহ করার পর তাইমুর দ্রুত বাড়িতে ফিরে যায়। বরফগুলো দিয়ে আসে মায়ের কাছে। এরপর আবার স্কুলের উদ্দেশে রওনা হয়। যাত্রাপথে ঠান্ডা থাকার জন্য প্লাস্টিকের একটি পাত্রে সামান্য বরফও সঙ্গে নেয়।
সকাল ৮টার মধ্যেই সূর্যের তাপ তীব্র হয়ে ওঠে। গলে যাওয়া বরফের পানিতে মুখ ভেজায় তাইমুর।
তাইমুরের মা দ্বিতীয় সন্তানের সন্তানসম্ভবা। এর আগে তার দুটি গর্ভপাত হয়েছিল। তাই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে নিজে কারখানায় হেঁটে গিয়ে বরফ বহন করলে গর্ভাবস্থার ক্ষতি হতে পারে—এ আশঙ্কায় তিনি ভয় পান।
পাকিস্তানের এই অঞ্চলে তাপমাত্রা যত বাড়ছে, গরম থেকে সুরক্ষা পাওয়া নির্ভর করছে একজন মানুষ কী খুঁজে পেতে পারেন, কী কিনতে পারেন কিংবা নিজের মতো করে কী ব্যবস্থা করতে পারেন তার ওপর।
পাহাড় ও খেজুরগাছের বাগানে ঘেরা নাসিরাবাদ বেলুচিস্তান প্রদেশের কেচ জেলার তুরবাত শহর থেকে প্রায় ২৫ মাইল বা ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট শহর। এখানকার অধিকাংশ মানুষ মাটির তৈরি বাড়িতে বসবাস করেন।
বাসিন্দারা বলছেন, দিনে মাত্র প্রায় তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। তার ওপর ভোল্টেজ এতটাই কম থাকে যে, নির্ভরযোগ্যভাবে ফ্রিজ চালানোও কঠিন।
যেসব পরিবারের সামর্থ্য আছে, তারা সৌর প্যানেল ব্যবহার করে দিনের বেলায় পাখা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফ্রিজ চালায়। কিন্তু অন্যদের জন্য প্রতিদিন সকালে সংগ্রহ করা বরফই গরম থেকে বাঁচার একমাত্র অবলম্বন।
নাসিরাবাদের তীব্র গরম আরও বিস্তৃত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রবণতার সম্মুখসারিতে এই শহরকে নিয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক তাপপ্রবাহ সতর্কতায় তুরবাতসহ কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৪৬ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
এশিয়ায় চরম তাপ এখন ক্রমেই একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, এশিয়া বিশ্বের গড় উষ্ণায়নের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে।
ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর ছিল রেকর্ড করা ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর।
নাসিরাবাদের মানুষ এই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব অনুভব করছে এক গ্লাস পানির তাপমাত্রা, বরফের লাইনে দাঁড়ানোর সময় এবং একটি পরিবার পাখা চালিয়ে রাখার সামর্থ্যের মধ্য দিয়ে।
বরফ কারখানাই যেন শহরের শীতল থাকার কেন্দ্র
তাইমুর বরফভর্তি মপেড নিয়ে বরফ কারখানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।
নাসিরাবাদের বরফ কারখানার মালিক মোহাম্মদ হায়দার জানান, ১৯৯২ সালে তার প্রয়াত বাবা এই কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিদিন সকাল ৭টার দিকে শ্রমিকেরা কারখানের ধাতব শাটার খুলে দেন। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে আগের রাতে তৈরি করা ৪০০টি বরফের ব্লক সাধারণত বিক্রি হয়ে যায়।
কারখানাটি কার্যত নাসিরাবাদের মানুষের জন্য শীতল থাকার একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে এর সীমিত উৎপাদন বরফের ওপর নির্ভরশীল সবার চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
হায়দার জানান, প্রায় সব বরফই পানীয় পানি ঠান্ডা করার জন্য কেনা হয়। চাহিদা এত বেশি যে, অনেক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরে যান।
“মানুষ বরফ পাওয়ার আগেই যখন বরফ শেষ হয়ে যায়, তখন আমার খুব খারাপ লাগে,” তিনি বলেন। “তাদের এরপর পুরো দিন গরম পানি পান করেই কাটাতে হয়।”
সন্ধ্যায় হায়দার জানান, অনেক বাসিন্দা তার কারখানার বাইরে জড়ো হন। তিনি তাদের বিনা মূল্যে ঠান্ডা পানির কাপ দেন। একই সময়ে পরদিন সকালের জন্য আরেক দফা বরফ জমতে থাকে।
সকালের সরবরাহের সময় যারা বরফ কিনতে পারেন না, তাদের কেউ কেউ বেশি বরফ কেনা বাসিন্দাদের কাছ থেকে পরে তা কিনে নেন। হায়দারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪০ রুপিতে কেনা এক টুকরো বরফ পরে ৮০ রুপিতে বিক্রি হতে পারে।
২০২৪ সালের নটর ডেম গ্লোবাল অ্যাডাপটেশন ইনিশিয়েটিভের দেশভিত্তিক সূচকে পাকিস্তানের অবস্থান ছিল ১৪৭তম। দেশটির তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান এবং অভিযোজনের কম সক্ষমতা দেখায় যে, জলবায়ুজনিত ঝুঁকির পাশাপাশি তা মোকাবিলায় দেশটির প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাও সীমিত।
প্রতিবেশীর ফ্রিজই ভরসা
প্রতিদিন সকালে ৬৬ বছর বয়সী বিধবা রাজ বিবি কয়েক বোতল পানি ভর্তি করে এমন এক প্রতিবেশীর বাড়িতে নিয়ে যান, যার সৌর প্যানেল দিয়ে চালানো ফ্রিজ রয়েছে। প্রতিবেশী তাকে বোতলগুলো ফ্রিজে রাখার সুযোগ দেন।
নিজের বরফ কেনার কিংবা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা করার সামর্থ্য নেই বিবির। সন্ধ্যায় তিনি আবার প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে ঠান্ডা পানি সংগ্রহ করেন। আশা করেন, রাতভর অন্তত পানযোগ্য থাকবে পানি।
“দিনটা গরম আর দমবন্ধ অবস্থার মধ্যেই কেটে যায়,” তিনি বলেন। “পাখা চালানোর মতো বিদ্যুৎ নেই, আর সৌর প্যানেল কেনার সামর্থ্যও আমার নেই।”
সৌর প্যানেল থাকা পরিবারগুলোও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তাদের অনেকেরই দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল ব্যাটারি কেনার সামর্থ্য নেই। ফলে অনেক পরিবার বিছানাপত্র বাইরে নিয়ে গিয়ে খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়।
কার কোন পর্যায়ের তাপ মোকাবিলা করার সক্ষমতা আছে, তা নির্ধারিত হচ্ছে তারা অভিযোজনের কোন স্তরটি কিনতে বা ব্যবস্থা করতে পারে তার ওপর—সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ফ্রিজ, পানি কিংবা বরফ। আর যাদের এসব কেনার সামর্থ্য নেই, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
গরম থেকে বাঁচার পরামর্শ, কিন্তু বিকল্প নেই
গ্রীষ্মজুড়েই নাসিরাবাদে চরম তাপ অব্যাহত রয়েছে। আগস্ট মাসের পূর্বাভাসে পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদপ্তর বেলুচিস্তানজুড়ে অত্যন্ত গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।
মে মাসের সতর্কতায় মানুষকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে রোদে বের না হওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং পানি ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কৃষকদের কাজের সময়সূচি পরিবর্তন এবং গবাদিপশু রক্ষারও পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিন্তু এসব সতর্কতার প্রতিটি পরামর্শের পেছনে এমন একটি স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগের কথা ধরে নেওয়া হয়েছে, যা অনেক মানুষের নেই।
তাইমুর সকালের রোদ এড়িয়ে চলতে পারে না, কারণ তার পরিবার তার ওপর বরফ সংগ্রহের জন্য নির্ভরশীল।
বিবিকে পানি সংগ্রহের জন্য প্রতিবেশীর বাড়িতে হেঁটে যেতে হয়।
কৃষকেরা তাদের আয়ের উৎস বাগান ছেড়ে যেতে পারেন না।
আর নারীরা রান্নার আগুনের তাপ এড়িয়ে চলার সুযোগও পান না।
আগুনের পাশে রান্না, মাথার ওপর ৫০ ডিগ্রির তাপ
নাসিরাবাদে গ্যাস না থাকায় তীব্র গরমের মধ্যেও নারীদের কাঠ পুড়িয়ে রান্না করতে হয়। খোলা আগুনের পাশে বসে নান রুটি তৈরি করাও তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
পাকিস্তানে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) চরম তাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষেরও কেচ জেলার জন্য একটি পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু নাসিরাবাদের বাসিন্দারা বলছেন, বাস্তবে এসব সুরক্ষা ব্যবস্থার খুব কমই দেখা যায়।
পরিবর্তে তারা নিজেদের মতো করে একটি বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন—ব্যাটারি ছাড়া সৌর প্যানেল, প্রতিবেশীদের ফ্রিজ ভাগাভাগি করে ব্যবহার, পরিবারের সদস্যদের বাইরে ঘুমানো এবং প্রতিরাতে মাত্র ৪০০টি বরফের ব্লক তৈরি করা একটি কারখানার ওপর নির্ভরশীলতা।
চরম তাপের সঙ্গে লড়াইয়ে নাসিরাবাদের মানুষের বাস্তবতা তাই খুবই কঠিন: যার যতটুকু সামর্থ্য, তার ততটুকুই শীতল থাকার সুযোগ।
