মুক্তদেশ ডেস্ক: একজন মানুষ এবং একটি কম্পিউটার মিলে যদি এমন কিছু তৈরি করতে পারে, যা সারা বিশ্বকে মুগ্ধ করে—তাহলে কেমন হয়? পরিচয় হোক ছিগুয়াং-এর সঙ্গে। ১৯৯১ সালে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি চশমার দোকানের মালিক। তাঁর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি চীনা স্বর্গীয় জগতের একটি ভিডিও বিদেশে ৫০ লাখেরও বেশি ভিউ পেয়েছে।
তিনি চীনে দ্রুত বিস্তার লাভ করা একটি নতুন আন্দোলনের অংশ—যাকে বলা হচ্ছে ‘হস্তনির্মিত অর্থনীতি’ (Handcrafted Economy)। কম খরচের এআই প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতা যেখানে উদ্যোক্তা হওয়ার নতুন পথ খুলে দিচ্ছে।
সাদা জেড পাথরের একটি করিডর মেঘের সমুদ্রের গভীরে চলে গেছে। উঁচু স্বর্গীয় প্রাসাদ স্তরে স্তরে উল্টে থাকা ছাদের ওপরে উঠে গেছে। আর ভাসমান স্বর্গীয় আবাসগুলোর মাঝ দিয়ে লাল মুকুটের সারস উড়ে বেড়াচ্ছে।
কোনো সাবটাইটেল বা সংলাপ ছাড়াই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এই এআই-নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওটি চার দিনেরও কম সময়ে বিদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ৫০ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে।
অনেক বিদেশি দর্শক ভেবেছিলেন, এত নান্দনিক দৃশ্য হয়তো কোনো পেশাদার চলচ্চিত্র স্টুডিও বা অভিজ্ঞ থ্রিডি অ্যানিমেশন দলের তৈরি।
কিন্তু অনলাইনে ছিগুয়াং নামে পরিচিত এই নির্মাতার বাস্তব জীবন অনেক বেশি সাধারণ। ১৯৯১ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সিচুয়ান প্রদেশের চেংদুতে জন্ম নেওয়া ছিগুয়াং বর্তমানে একটি সাধারণ অপটিক্যাল বা চশমার দোকান চালান। দোকানে ক্রেতাদের সেবা দেওয়ার ফাঁকে অবসর সময়ে তিনি নিজে নিজে এআই দিয়ে ছবি ও ভিডিও তৈরির প্রযুক্তি শিখেছেন। এভাবেই তিনি চীনা স্বর্গীয় জগতের সেই ভাইরাল দৃশ্যটি তৈরি করেন।
ছিগুয়াংয়ের রাতারাতি আন্তর্জাতিক পরিচিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সাফল্যের ঘটনা নয়। এটি চীনে নতুন এক প্রবণতার বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘শৌছুও’ অর্থনীতি বা হস্তনির্মিত অর্থনীতি।
এই শব্দটি ছোট পরিসরে সাধারণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে নিজের হাতে ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এখানে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন লাইন নয়, বরং ব্যক্তিগত দক্ষতা ও শ্রমই প্রধান ভূমিকা পালন করে।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘Hand-Crafting Everything’ বা ‘সবকিছু হাতে তৈরি’ হ্যাশট্যাগটি ১০ কোটিরও বেশি ভিউ পেয়েছে। বিভিন্ন অ্যাপ স্টোরে একক ডেভেলপাররা এমন এআই-চালিত টুল তৈরি করছেন, যেগুলো প্রযুক্তি জায়ান্টদের সমর্থনপুষ্ট পণ্যের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করছে।
কম খরচ, ব্যাপক সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং নমনীয় ও খণ্ডিত কর্মপদ্ধতিনির্ভর এই আন্দোলন চীনে উদ্যোক্তা হওয়ার ধারণাকেই নতুনভাবে গড়ে দিচ্ছে।
দুই মানুষ, স্বর্গের এক স্বপ্ন
ছিগুয়াংয়ের ভাইরাল স্বর্গীয় ভিডিওটি দেখে খুব কম দর্শকই বুঝতে পেরেছিলেন যে এর পেছনে কোনো বিশাল স্টুডিও নয়, বরং মাত্র দুজন মানুষ এবং শত শত বাতিল করা এআই-চেষ্টা রয়েছে।
ছিগুয়াং গ্লোবাল টাইমস-কে বলেন, চীনা পুরাণের বিশাল ও অলৌকিক দৃশ্য—স্বর্গীয় প্রাসাদ এবং প্রাচীন গ্রন্থে বর্ণিত ভাসমান জগত—তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে আকৃষ্ট করত।
পরে তিনি আরেক নির্মাতা শুয়েলি শিয়ানজং-এর কাজ দেখতে পান। এটি তাঁর অনলাইন নাম। ওই নির্মাতার এআই-নির্মিত দৃশ্যে স্বতন্ত্র প্রাচ্য নান্দনিকতা ও মিনিমালিস্টিক ফাঁকা জায়গার ব্যবহার তাঁকে মুগ্ধ করে।
ছিগুয়াং বলেন, এআই সাধারণ মানুষের সামনে থাকা অনেক বাধা দূর করতে পারে—এটা তিনি তখন উপলব্ধি করেন। এতদিন ধরে তাঁর মনে থাকা কল্পনার ছবিগুলো অবশেষে দৃশ্যমান করে তোলা সম্ভব হলো।
শুয়েলি শিয়ানজংও এর আগে একই ধরনের উপলব্ধিতে পৌঁছেছিলেন। বহু বছর ধরে তিনি চীনা ফ্যান্টাসি সাহিত্যে বর্ণিত স্বর্গীয় প্রাসাদগুলোকে দৃশ্যমান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রচলিত থ্রিডি মডেলিং ও লাইভ-অ্যাকশন শুটিং একজন ব্যক্তির জন্য ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
এআই-নির্ভর প্রযুক্তি সেই পরিস্থিতি বদলে দেয়। অবসর সময়ে তিনি টেক্সট-টু-ইমেজ এবং ইমেজ-টু-ভিডিও প্রযুক্তি শেখা শুরু করেন। এভাবেই চীনা ফ্যান্টাসি-ভিত্তিক দৃশ্য নির্মাণের তুলনামূলক অপরিচিত একটি ক্ষেত্রে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেন।
শেষ পর্যন্ত দুজন সৃজনশীল অংশীদারে পরিণত হন। তবে তাঁদের সহযোগিতার ধরন বেশ অনানুষ্ঠানিক।
শুয়েলি শিয়ানজং বলেন, তাঁরা সাধারণত আলাদাভাবে কাজ করেন। পরে নিজেদের তৈরি কাজ পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে মতামত ও অনুপ্রেরণা নেন। একে অপরের কাজ থেকে নান্দনিক ধারণা গ্রহণ করে নিজের সৃষ্টিতে ব্যবহার করেন। বর্তমানে এই ক্ষেত্রের অধিকাংশ নির্মাতাই এভাবেই সহযোগিতা করেন।
তবে তাঁদের সৃজনশীল অংশীদারত্ব সহজ হলেও এআই নিয়ে তাঁদের সংগ্রাম মোটেও সহজ ছিল না।
‘চীনা স্বর্গীয় দরবার’-এর মতো একটি ভিডিও তৈরির প্রক্রিয়া দর্শকদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি শ্রমসাধ্য।
ছিগুয়াং প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করে বলেন—
প্রথমে পুরো দৃশ্যের আবহ কল্পনা করতে হয় এবং প্রতিটি শটের ক্যামেরা মুভমেন্ট ঠিক করতে হয়। এরপর এআই ইমেজ জেনারেশন টুল ব্যবহার করে প্রতিটি ফ্রেমের জন্য উচ্চমানের স্থিরচিত্র তৈরি করতে হয়। স্থাপত্যের খুঁটিনাটি, রঙের বিন্যাস, আলো এবং কম্পোজিশন নিয়ন্ত্রণ করতে বারবার প্রম্পট পরিবর্তন করতে হয়।
এরপর নির্বাচিত ছবিগুলো এআই ভিডিও-জেনারেশন মডেলে দিয়ে ক্যামেরার অনুভূমিক চলন, ভেসে থাকা মেঘ, বাতাসে দুলতে থাকা পোশাকের মতো গতিশীল প্রভাব যোগ করা হয়। তারপর তৈরি হওয়া ভিডিওগুলো বাছাই করে বিকৃত বা ত্রুটিপূর্ণ অংশ বাদ দিতে হয়, ক্লিপগুলো সম্পাদনা করতে হয় এবং সবশেষে আবহের সঙ্গে মানানসই সংগীত বেছে নিতে হয়।
ছিগুয়াং বলেন, এআই প্রায়ই বিকৃত স্থাপত্য, বেঁকে যাওয়া চরিত্র অথবা অস্বাভাবিক নড়াচড়া তৈরি করে। মাথায় একটি নিখুঁত দৃশ্য কল্পনা করার পরও বহুবার চেষ্টা করেও সেটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয় না।
দুই বছর নিজে নিজে শেখার পর ছিগুয়াংয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো প্রচলিত, গণহারে তৈরি চীনা প্রাচীন নান্দনিকতার বাইরে বেরিয়ে আসা।
তাঁর মতে, প্রচলিত উদ্যোক্তা হওয়ার ধারণার সঙ্গে হস্তনির্মিত অর্থনীতির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
তিনি বলেন, মাত্র একজন মানুষ ও একটি কম্পিউটার দিয়েই শুরু করা যায়। ধারণাকে সরাসরি কনটেন্ট বা পণ্যে রূপ দেওয়া সম্ভব। শুরুতেই বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। তবে প্রতিটি কঠিন কাজ এবং প্রতিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নির্মাতার ওপরই পড়ে।
তিনি আরও বলেন, এআই-সহায়িত হস্তনির্মাণ মডেল অনেক কঠিন প্রযুক্তিগত বাধা দূর করে। কারও যদি ভালো রুচি ও কল্পনাশক্তি থাকে, তাহলে অবসর সময়েও তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন।
চংছিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গুও ই গ্লোবাল টাইমস-কে বলেন, হস্তনির্মিত অর্থনীতিকে আরও যথাযথভাবে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টির অর্থনীতি’ বা ‘গিক ক্রিয়েশন ইকোনমি’ বলা যেতে পারে। এখানে মানুষের বুদ্ধি কম্পিউটিং শক্তিকে পরিচালনা করে এবং সৃজনশীলতা স্বয়ংক্রিয় সরঞ্জামকে পথ দেখায়।
অনেক দিক থেকে এই আন্দোলন বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা মেকার অর্থনীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
তবে গুওর মতে, জেনারেটিভ এআই শুধু সৃজনশীল শিল্পে প্রবেশের খরচ কমাচ্ছে না; এটি সৃজনশীল খাতগুলোর ব্যয় কাঠামো ও উৎপাদন সম্পর্কও নতুন করে সাজাচ্ছে।
দ্রুত বেড়ে ওঠা একটি সম্প্রদায়
যেখানে ছিগুয়াং ও শুয়েলি শিয়ানজং সৃজনশীলতার জগতে স্বপ্নের দৃশ্য তৈরি করছেন, সেখানে ৩৪ বছর বয়সী শু তিং বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে ব্যবহারিক ডিজিটাল পণ্য ‘হাতে তৈরি’ করছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিয়াওহংশুতে দেওয়া একটি সাধারণ পোস্টের কথা এখনও তাঁর মনে আছে। তিনি লিখেছিলেন, “আমি এমন একটি এআই অ্যাপ তৈরি করতে চাই, যা বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা বলবে এবং তাঁদের জীবনের স্মৃতিকথা সংকলনে সহায়তা করবে। কেউ কি যোগ দিতে চান?”
প্রচলিত ইন্টারনেট শিল্পের দৃষ্টিতে ধারণাটি অবাস্তব মনে হতে পারত। একসময় একটি অ্যাপ তৈরির জন্য বড় দল ও কোটি কোটি মূলধনের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এআই সেই নিয়ম বদলে দিয়েছে।
শু তিং আগে জ্বালানি খাতে কাজ করতেন এবং তাঁর কোনো কোডিং অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু ডিপসিকসহ চীনের বিভিন্ন বৃহৎ ভাষা মডেল ব্যবহার করে তিনি ধাপে ধাপে একটি কার্যকর পণ্যের প্রোটোটাইপ তৈরি করেন।
কোনো আলাদা প্রোডাক্ট ম্যানেজার বা ইউআই ডিজাইনার ছাড়াই তিনি নিজে বাজার গবেষণা ও পণ্য নকশার কাজ সম্পন্ন করেন।
শু তিং বলেন, অতীতে অনেক ভালো সৃজনশীল ধারণা শুধু অতিরিক্ত খরচের কারণে পরিত্যক্ত হয়েছে। এখন এআই মডেলের টোকেনের খরচ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সহজ হয়েছে এবং এই ক্ষেত্রে নতুন মানুষের প্রবেশও বাড়ছে।
তাঁর নিয়োগের পোস্ট প্রকাশের পরদিনই অসংখ্য ব্যক্তিগত বার্তা আসে। এতে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর ধারণাটির বাস্তব বাজার চাহিদা রয়েছে।
সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক লি নিং বলেন, প্রচলিত উদ্যোক্তা ব্যবস্থায় গবেষণা, কর্মী, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার পরীক্ষা করতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। ফলে অনেক উদ্ভাবক শুরু করার আগেই পিছিয়ে যান।
তাঁর মতে, এআই এসব খরচকে সংকুচিত করেছে। অল্প কয়েকজনের দল স্বাধীনভাবে কাজ করে এমন ফলাফল অর্জন করতে পারে, যার জন্য একসময় শত শত কর্মীর প্রয়োজন হতো। এতে আরও অনেক মানুষ নিজেদের ব্যবসা শুরু করার সাহস পাচ্ছেন।
শুধু খরচের পার্থক্য নয়, হস্তনির্মিত দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ও সহযোগিতার ধরনও বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভিন্ন।
বড় কোম্পানিতে একটি প্রকল্প শুরু থেকে বাজারে আসা পর্যন্ত নির্দিষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য ফলাফল দেওয়ার চাপ থাকে। এতে নতুন ও প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে থাকা ধারণাগুলোর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে ছোট হস্তনির্মিত দলগুলো তাদের আকারের সুবিধা পায়। তারা দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে পারে এবং বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিজেদের পণ্য উন্নত করতে পারে।
শুয়েলি শিয়ানজং হস্তনির্মিত অর্থনীতি ও প্রচলিত উদ্যোক্তা ব্যবস্থার মধ্যে চারটি মূল পার্থক্য চিহ্নিত করেছেন:
- প্রবেশের বাধা কম;
- সৃজনশীলতাই মূল, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম শুধু বাহন;
- আনুষ্ঠানিক কোম্পানি বা নির্দিষ্ট দল ছাড়াই নমনীয়ভাবে সহযোগিতা করা যায়;
- পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ কম হওয়ায় আর্থিক বিপর্যয়ের ভয় ছাড়াই বিশেষায়িত ছোট বাজারে কাজ করা সম্ভব।
চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবাবার ক্লাউড কম্পিউটিং শাখা আলিবাবা ক্লাউডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তাদের ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্ম ModelScope-এর ইনোভেশন জোনে প্রায় ২৩ হাজার এআই অ্যাপ্লিকেশন তৈরি হয়েছে। এর প্রায় ৯৫ শতাংশই একক নির্মাতারা তৈরি করেছেন।
‘২০২৬ চায়না ওয়ান পারসন কোম্পানি (OPC) ইন্ডাস্ট্রি হোয়াইট পেপার’ ও বিভিন্ন খাতের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চীনে নিবন্ধিত একক ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানির (OPC) সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি।
নির্মাতাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
এআই যদি প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে সবার জন্য সুযোগের ব্যবধান কমিয়ে দেয়, তাহলে সাফল্য আসলে কোন বিষয় নির্ধারণ করবে?
হস্তনির্মিত অর্থনীতির সঙ্গে এগিয়ে চলা ব্যক্তিদের জন্য এআই যুগ একই সঙ্গে অসাধারণ স্বাধীনতা এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অভূতপূর্ব স্বাধীনতার পাশাপাশি প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁদের স্থিতিস্থাপকতার পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।
ছিগুয়াংয়ের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সৌন্দর্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা—অর্থাৎ সহজাত নান্দনিক বিচারবোধ ও কল্পনাশক্তি।
শু তিংয়ের মতে, নতুনদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ মূলধন নয়; বরং বাস্তব জীবনের অপূর্ণ চাহিদা শনাক্ত করার তীক্ষ্ণ ক্ষমতা।
তিনি বলেন, এআই কাজটি বাস্তবায়নে অত্যন্ত দক্ষ। কিন্তু কী তৈরি করতে হবে, সেটা নির্ধারণ করা অনেক বেশি কঠিন।
প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে বাস্তব ব্যবহারকারীর মূল্য বা উপকারে রূপান্তর করা।
তাঁর মতে, প্রকৃতপক্ষে যে চাহিদাগুলো যথাযথভাবে পূরণ হচ্ছে না, সেগুলো শনাক্ত করে প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে ব্যবহারকারীর জন্য মূল্যবান করে তুলতে হবে। প্রযুক্তি নির্ধারণ করে আপনি পণ্য তৈরি করতে পারবেন কি না। কিন্তু ব্যবহারকারীকে বোঝা, বারবার উন্নতি করার ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা নির্ধারণ করে একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ কত দূর যেতে পারবে।
তবে সঠিক অন্তর্দৃষ্টি থাকলেও ধারণা থেকে বাজার পর্যন্ত পথ মোটেও মসৃণ নয়। হস্তনির্মিত পণ্যের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই যাত্রায় বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে।
শুয়েলি শিয়ানজং বলেন, এআই সহজে কপি ও নকল করার সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে একক নির্মাতাদের নিজেদের কাজের স্বত্ব রক্ষায় আইনি লড়াই করার খরচ অত্যন্ত বেশি।
যখন কোনো কাজ নকল করার খরচ তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার খরচের তুলনায় অনেক কম হয়, তখন সৃজনশীল কাজের উৎসাহ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অধিকার ছাড়াও নির্মাতাদের সাময়িক অনলাইন জনপ্রিয়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ছিগুয়াং লক্ষ্য করেছেন, প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম সাধারণত দ্রুতগতির, সংঘাতনির্ভর ছোট ভিডিওকে অগ্রাধিকার দেয়। অথচ ধীরগতির ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ প্রকাশনা সহজে দর্শক পায় না।
তিনি ভিউ বাড়ানোর জন্য গতানুগতিক বাণিজ্যিক নাটক তৈরির পথে যেতে চান না। বরং তিনি বৃহৎ পরিসরের গল্প বলার ক্ষমতা আরও গভীর করতে চান।
ছিগুয়াং বলেন, হস্তনির্মিত অর্থনীতি দ্রুত ধনী হওয়ার কোনো শর্টকাট নয়। এখানে কম পুরস্কারের সময়ও ধৈর্য ধরে টিকে থাকতে হয়। নতুনদের যথেষ্ট সময় দিতে হবে এবং বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যর্থতা সহ্য করার মানসিকতা থাকতে হবে।
অ্যাপ তৈরির ক্ষেত্রে শু তিং আরেকটি সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন—ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা ও মানসম্মত কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা।
প্রতিটি প্রকল্প যদি পুরোপুরি হাতে-কলমে শ্রমের ওপর নির্ভর করে, তাহলে উদ্যোক্তারা উচ্চচাপের কিন্তু কম লাভজনক আত্মকর্মসংস্থানে আটকে যেতে পারেন।
এই খাতের প্রয়োজন পরিণত কর্মপ্রবাহ, নির্দিষ্ট ডেলিভারি মানদণ্ড এবং মূল্য নির্ধারণের কাঠামো। যেসব কাজ মানসম্মত বা স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব, সেগুলো এআইয়ের হাতে দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে মানুষের সহমর্মিতা ও সমালোচনামূলক বিচারবোধকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রাখতে হবে।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে কাজ করা সেবাগুলোর ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও নৈতিক সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অধ্যাপক গুও মনে করেন, মানের অসামঞ্জস্য এই খাতের স্বাভাবিক বিকাশজনিত সমস্যা, যা বাজারের বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমাধান হতে পারে। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের সুরক্ষায় আইনগত কাঠামোর ধীর বিকাশ এবং নতুন ধরনের শাসনব্যবস্থাগত চ্যালেঞ্জের জন্য নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ প্রয়োজন।
এসব বাধা মোকাবিলায় চীনের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সহায়ক ব্যবস্থা চালু করতে শুরু করেছে।
২০টিরও বেশি শহর একক ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানির জন্য বিশেষ নীতি চালু করেছে। বেইজিং ইকোনমিক-টেকনোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এরিয়া একক উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ব্যবসা নিবন্ধন সেবা চালু করেছে, যেখানে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ব্যবসায়িক লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পূর্ব চীনের শানডং প্রদেশের ছিংদাও একক উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। সেখানে এআই উদ্ভাবকদের প্রযুক্তি উন্নয়ন থেকে শুরু করে আয় তৈরির পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
একই সময়ে একক ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানিকে ঘিরে একটি কমিউনিটি নেটওয়ার্কও গড়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২৮টি প্রাদেশিক পর্যায়ের অঞ্চল ও ৬৫টি শহরে এ ধরনের ৪২৬টি কমিউনিটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্র শুধু কাজের জায়গা দেয় না; পাশাপাশি নেটওয়ার্কিং আয়োজন, সম্পদ-সমন্বয় এবং পরামর্শও প্রদান করে। এর মাধ্যমে আগে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করা একক নির্মাতারা একটি সংযুক্ত পরিবেশের অংশ হয়ে উঠছেন।
এখনো মূল কাজের পাশাপাশি এআই সৃষ্টি
ছিগুয়াং এখনও পূর্ণকালীনভাবে তাঁর চশমার দোকান পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি এআই দিয়ে সৃষ্টিশীল কাজ করছেন পার্শ্ব-প্রকল্প হিসেবে। এখনই এটিকে পূর্ণকালীন পেশায় পরিণত করা বা বড় আকারের আয় করার কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা তাঁর নেই।
ছিগুয়াং এবং শুয়েলি শিয়ানজং—দুজনই জানিয়েছেন, শিল্পের পরিবেশ এবং আয় করার মডেল আরও পরিণত হলে তাঁরা পূর্ণকালীন সৃজনশীল কাজে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
তবে তাঁরা হস্তনির্মিত সৃষ্টিশীলতাকে চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং একটি সূচনাবিন্দু হিসেবে দেখছেন। তাঁদের বিশ্বাস, তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে ওঠা এই সৃজনশীল আন্দোলনের সামনে এখনও বিপুল সম্ভাবনা উন্মুক্ত রয়েছে।
