মুক্তদেশ ডেস্ক: পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে প্রত্যাশিত ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম (iPS) কোষ আবিষ্কারের পর ২০ বছর পেরিয়ে গেছে। প্রযুক্তিটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন হলো—এটি কি শেষ পর্যন্ত রোগে ভুগছেন এমন মানুষের চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠবে?
২০০৬ সালের ১১ আগস্ট, কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিনিয়া ইয়ামানাকা ঘোষণা করেন, তিনি ইঁদুরের ত্বকের কোষ থেকে আইপিএস কোষ তৈরিতে সফল হয়েছেন। এসব কোষ থেকে বিভিন্ন ধরনের টিস্যু ও অঙ্গ তৈরি হতে পারে। ২০১২ সালে তিনি এ গবেষণার জন্য শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
সেই গবেষণার সুফল অবশেষে চলতি বছরের মার্চে বহু রোগীর জন্য চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। জাপান সরকার প্রথমবারের মতো আইপিএস কোষ থেকে উদ্ভূত দুটি পণ্য অনুমোদন করেছে—পারকিনসন রোগের চিকিৎসায় ‘Amchepri’ এবং হৃদ্রোগের চিকিৎসায় ‘RiHEART’।
নিজস্ব এই জাপানি প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ এগিয়ে নিতে সরকারের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ২০১৩ সাল থেকে সরকার এক দশকে গবেষণার জন্য প্রায় ১১০ বিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৬৯ কোটি মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করেছে এবং ব্যবহারিক প্রয়োগ ত্বরান্বিত করতে নতুন নীতিও গ্রহণ করেছে।
এর অংশ হিসেবে সরকার ‘শর্তসাপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ অনুমোদন’ ব্যবস্থা চালু করে। এর আওতায় সাধারণভাবে অনুমোদনের জন্য যথেষ্ট নয়—এমন তুলনামূলক ছোট পরিসরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলের ভিত্তিতেও পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসার পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির অনুমোদন দেওয়া সম্ভব।
তবে বর্তমানে অনুমোদন পাওয়া দুটি পণ্যই ‘অস্থায়ী অনুমোদন’ পর্যায়ে রয়েছে। এখন এসব চিকিৎসা থেকে পাওয়া তথ্য ও ফলাফলের দিকে নজর থাকবে।
পণ্য উন্নয়ন বড় চ্যালেঞ্জ
একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পণ্য উন্নয়নের জটিলতা। পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসা জীবন্ত কোষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এগুলোর পরিবহন ও ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় মান বজায় রেখে ধারাবাহিকভাবে পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবস্থাও নির্মাতাদের গড়ে তুলতে হয়।
তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর iPS সেল রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন ২০১৫ অর্থবছর থেকে শিল্প-একাডেমিয়া যৌথ গবেষণায় যুক্ত ছিল। কিন্তু নতুন কোনো পণ্য তৈরি না করেই চলতি বছর সেই সহযোগিতা শেষ হয়েছে।
পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসাকে এগিয়ে নিতে নেওয়া নীতিগুলোর ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ও উপেক্ষা করা যায় না।
২০১৪ সালে জাপান সরকার পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে এ ধরনের চিকিৎসা পরিচালনার জন্য নিয়মকানুন নির্ধারণ করা হয়।
চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসার পরিকল্পনা তৈরি, বিশেষজ্ঞ কমিটির পর্যালোচনা এবং স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি জানানোর মাধ্যমে পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ পায়।
কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর iPS সেল রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশনের একটি গবেষণাভবন। ছবিটি ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে কিয়োটোর সাকিও ওয়ার্ডে তোলা। সরকারি সহায়তায় পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসার প্রসারে জাপানজুড়ে প্রতিষ্ঠিত গবেষণা কেন্দ্রগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি। (মাইনিচি/তেতসুরো হাতাকেয়ামা)
এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৭৭০টি নোটিফিকেশন জমা পড়েছে। তবে এর বেশির ভাগই এমন চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত, যার খরচ রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয় এবং যেগুলো স্বাস্থ্যবিমার আওতায় নেই। বিপরীতে খুব অল্পসংখ্যক চিকিৎসার লক্ষ্য হচ্ছে ওষুধ বা চিকিৎসাপণ্য হিসেবে সরকারি অনুমোদন পাওয়া।
এর মধ্যে অনেক চিকিৎসাই প্রসাধনমূলক উদ্দেশ্যে, যেমন বলিরেখা দূর করার জন্য দেওয়া হয়। আবার ব্যথা উপশম বা ডায়াবেটিসের চিকিৎসার মতো কিছু দাবির পেছনে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত গ্রীষ্ম থেকে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার চিকিৎসায় পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসা নেওয়া দুই রোগীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
অন্য একটি ঘটনায়, ক্যানসার প্রতিরোধের দাবি করা একটি চিকিৎসা নেওয়ার পর দুই রোগীর গুরুতর সংক্রমণ দেখা দেয়।
এ ধরনের ঘটনা পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসার পুরো ক্ষেত্রটির ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করতে পারে।
তাই রোগীরা যাতে উদ্বেগ ছাড়াই চিকিৎসা নিতে পারেন, সে জন্য বর্তমান আইনটির মৌলিক সংস্কার জরুরি।
বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরুর আগে অনুমোদন দেওয়ার সময় প্রস্তাবিত চিকিৎসার যথার্থতা পর্যাপ্তভাবে যাচাই করা হয় না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন চিকিৎসার যৌক্তিকতা যাচাইয়ের কাঠামো, রোগীদের তথ্য দেওয়ার পদ্ধতি এবং বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা কমিটির কার্যক্রমের মান উন্নয়নের উপায় নিয়ে ভাবছে।
‘স্বপ্নের চিকিৎসা’ নিয়ে প্রত্যাশা
তা সত্ত্বেও একসময় ‘স্বপ্নের চিকিৎসা’ হিসেবে বিবেচিত এই প্রযুক্তি নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা এখনও অনেক বেশি।
২০০৭ সালে ইয়ামানাকা মানবদেহের ত্বকের কোষ থেকে আইপিএস কোষ তৈরিতে সফল হওয়ার পর বহু রোগী ব্যবহারিক চিকিৎসায় এর প্রয়োগের আশায় তাঁকে ই-মেইল পাঠাতে শুরু করেন।
সে সময় ইয়ামানাকা বলেছিলেন, “এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে আমার ওপর অনেক বড় দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করি।”
এখন প্রশ্ন হলো—জীববিজ্ঞানের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা এই গবেষণা তার সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত সফল ও কার্যকর চিকিৎসায় রূপ নিতে পারবে কি না।
