মু. হাসান শাহ্রিয়ার : ফিরিয়ে দাও আমার পিতাকে ফিরিয়ে দাও আমার মাতাকে/ফিরিয়ে দাও বৃদ্ধদের; ফিরিয়ে দাও শিশুদের/ফিরিয়ে দাও আমাকে নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে/ফিরিয়ে দাও মানবতা; যত দিন আছে মানবিক এক বিশ্ব/ফিরিয়ে দাও আমাদের সেই শান্তি চিরায়ত শান্তি। জাপানি কবি সানকিচি তোগের কবিতায় উঠে এসেছে এমন মানবিক আর্তনাদ।
এই কয়েকটি পঙ্ক্তি শুধু এক কবির আর্তনাদ নয়; এটি হিরোশিমার ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে থাকা লাখো মানুষের কণ্ঠস্বর, মানবসভ্যতার বিবেকের দীর্ঘশ্বাস। আজ ৬ আগস্ট, হিরোশিমা দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে যুদ্ধের উন্মত্ততায় পারমাণবিক বোমার আগুনে মুহূর্তেই ছাই হয়ে গিয়েছিল একটি জীবন্ত নগরী। অথচ সেই শহরের কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে থাকা গম্বুজাকৃতির একটি ধ্বংসাবশেষ অ্যাটমিক বোম্ব ডোমÑ আজ আর কেবল ধ্বংসের স্মারক নয়। একসময় যেখানে শিল্প, বাণিজ্য ও যুদ্ধমুখী রাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন ঘটত, সেই ভবনই আজ বিশ্বের কাছে শান্তি, নিরস্ত্রীকরণ ও মানবতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। সামরিক শিল্পের কেন্দ্র থেকে শান্তির স্মারকে রূপান্তরিত এই স্থাপনা প্রমাণ করে, ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষতও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধ নয়, শান্তির পথ দেখাতে পারে। ইউনেস্কো স্বীকৃত এই বিশ্ব ঐতিহ্য আজও নীরবে মনে করিয়ে দেয় মানবসভ্যতার প্রকৃত বিজয় কোনো অস্ত্রে নয়, বরং যুদ্ধহীন পৃথিবী গড়ার সম্মিলিত অঙ্গীকারে।
এ বছর ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অ্যাটমিক বোম্ব ডোমের অন্তর্ভুক্তির ৩০ বছর পূর্তি। ১৯৯৬ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার আগে ১৯৬৬ সালে হিরোশিমা সিটি অ্যাসেম্বলি ভবনটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়,
যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুদ্ধের ভয়াবহতা কখনও ভুলে না যায়। সামরিক শিল্পের কেন্দ্র থেকে শান্তির প্রতীকে রূপান্তরিত এই স্থাপনা আজও মানবসভ্যতার জন্য এক অনন্ত সতর্কবার্তা যুদ্ধ নয়, শান্তিই টেকসই ভবিষ্যতের একমাত্র পথ।
গম্বুজযুক্ত আধুনিক পাশ্চাত্য স্থাপনা : ১৯১৫ সালে ভবনটি হিরোশিমা প্রিফেকচারাল কমার্শিয়াল এক্সিবিশন হল নামে নির্মিত হয়। ১৯২১ সালে এর নাম পরিবর্তন করে হিরোশিমা প্রিফেকচারাল প্রোডাক্টস এক্সিবিশন হল এবং ১৯৩৩ সালে হিরোশিমা প্রিফেকচারাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন হল রাখা হয়। চেক স্থপতি ইয়ান লেটজেলের নকশা করা এই আধুনিক পাশ্চাত্য ধাঁচের ভবনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল নদীর তীরে অবস্থিত এর বিশাল গম্বুজ। এটি তখনকার হিরোশিমার অন্যতম দর্শনীয় স্থাপনা ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৯ সালে জাপানের হাতে বন্দি হয়ে এখানে হিরোশিমা উপসাগরের নিনোশিমা দ্বীপে আটক জার্মান যুদ্ধবন্দিদের তৈরি পণ্যের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেই প্রদর্শনীতে জার্মান মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক কার্ল ইউখহাইম প্রথমবারের মতো বাউমকুখেন কেক তৈরি করে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। পরে তিনি কোবেতে একটি সফল মিষ্টান্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন।
এই ভবনে নিয়মিত শিল্প প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু জাপান যখন ক্রমশ সামরিকবাদী হয়ে ওঠে, তখন এখানে যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে তথাকথিত ‘পবিত্র যুদ্ধের চিত্রকর্ম’ প্রদর্শন করা শুরু হয়।
প্রচণ্ড বিস্ফোরণেও টিকে ছিল ভবনটি : ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে, যুক্তরাষ্ট্রের নিক্ষেপ করা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণস্থল থেকে মাত্র ১৬০ মিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ভবনটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রচণ্ড চাপের কারণে ছাদ ধসে পড়লেও ভবনের মোটা বাইরের দেয়াল এবং গম্বুজের ইস্পাত কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে।
বোমা হামলার তিন দিন পর, ৯ আগস্ট মাইনিচি শিম্বুনের ওসাকা কার্যালয়ের এক প্রতিবেদক হিরোশিমায় প্রবেশ করেন। তিনি ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের যে ছবি তোলেন, তাতে দূরের প্রান্তে অ্যাটমিক বোম্ব ডোমকে ছায়ামূর্তির মতো দেখা যায়। এর এক মাস পর, ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বরে আরেকজন প্রতিবেদক ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির ছবি তোলেন, যা পরে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
শান্তির প্রতীক হিসেবে নতুন পরিচয় : যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের সময় শহরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা এই ধ্বংসাবশেষ ধীরে ধীরে ‘অ্যাটমিক বোম্ব ডোম’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
বিশিষ্ট স্থপতি কেনজো তাঙ্গে যখন হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্ক নকশা করেন, তখন তিনি হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, বোমার ভিকটিমদের স্মৃতিসৌধ এবং অ্যাটমিক বোম্ব ডোমকে একই সরলরেখায় স্থাপন করেন। এ বিন্যাসকে বলা হয় ‘শান্তির অক্ষ’। তবে সে সময় অনেক বাসিন্দাই ভবনটি ভেঙে ফেলার দাবি জানান, কারণ এটি তাদের কাছে যুদ্ধের বিভীষিকাময় স্মৃতি ফিরিয়ে আনত।
শিশুদের আহ্বানে বদলে যায় জনমত : ভবনটি সংরক্ষণ নাকি ভেঙে ফেলা হবেÑ এ নিয়ে বিতর্ক চলার সময় হিরোশিমা পেপার ক্রেন অ্যাসোসিয়েশন নামে স্থানীয় শিশুদের একটি সংগঠন সংরক্ষণের পক্ষে আন্দোলন শুরু করে। তাদের এই উদ্যোগ জনমতকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। অবশেষে ১৯৬৬ সালের জুলাই মাসে হিরোশিমা সিটি অ্যাসেম্বলি সর্বসম্মতিক্রমে অ্যাটমিক বোম্ব ডোম সংরক্ষণের প্রস্তাব অনুমোদন করে। ১৯৬৭ সালে প্রথম সংরক্ষণকাজ শুরু হয়। ফাটলগুলোয় সিনথেটিক রজন প্রবেশ করিয়ে সেগুলো মজবুত করা হয় এবং ভবনের ভেতরে শক্তিশালী করা হয় ইস্পাতের কাঠামো দিয়ে। ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচ দফা সংরক্ষণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবারই লক্ষ্য ছিল বোমা হামলার ক্ষতচিহ্ন অক্ষুণ্ন রেখে ভবনটিকে টিকিয়ে রাখা।
এখনও সতর্কবার্তা বহন করছে : ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো অ্যাটমিক বোম্ব ডোমকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে হিরোশিমা সফরে আসা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিক ও পর্যটকরা এই বোমার ভিকটিমদের স্মৃতিসৌধে ফুল অর্পণের সময় এই ভবনটিও প্রত্যক্ষ করেন। বিশ্ব থেকে এখনও পারমাণবিক অস্ত্র বিলুপ্ত হয়নি, আর বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র সংঘাতও অব্যাহত রয়েছে। এমন বাস্তবতায় হিরোশিমার অ্যাটমিক বোম্ব ডোম আজও মানবজাতিকে পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে চলেছে।
হিরোশিমা প্রিফেকচারে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ৬ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে ৪২ লাখ ২০ হাজার ছিলেন বিদেশি পর্যটক। তবে স্থানীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, পর্যটকদের শুধু জনপ্রিয় দুটি স্থানে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো প্রিফেকচারের বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্য উৎসাহিত করা। তাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ কোটি পর্যটক আকর্ষণ করা। হিরোশিমা শহরের নাকা ওয়ার্ডে অবস্থিত অ্যাটমিক বোম্ব ডোম ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থলের কারণে হিরোশিমা আন্তর্জাতিকভাবে ‘শান্তির রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। ফলে পর্যটন সম্পদের দিক থেকে অঞ্চলটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
