এম. হাসান : পারমাণবিক বোমা হামলার ৮১তম বার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার হিরোশিমা বিশ্বের নেতাদের প্রতি পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে শহরটি সতর্ক করে বলেছে, সামরিক সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্রকে “ভয় দেখানোর হাতিয়ার” হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং “পরাশক্তিগুলোর একতরফা ও কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ” আন্তর্জাতিক আইনকে লঙ্ঘন করছে।
বার্ষিক স্মরণানুষ্ঠানে পাঠ করা শান্তি ঘোষণায় (Peace Declaration) হিরোশিমার মেয়র কাজুমি মাতসুই বলেন,
“পারমাণবিক অস্ত্রের অমানবিকতাকে খাটো করে দেখা এবং নিজেদের সমৃদ্ধির জন্য শক্তি প্রয়োগকে গ্রহণযোগ্য মনে করা প্রতিশোধের এক অবিরাম চক্র সৃষ্টি করতে পারে, যার পরিণতিতে আবারও হিরোশিমা বা নাগাসাকির মতো ট্র্যাজেডি ঘটতে পারে।”
তার এই সতর্কবার্তা আসে এমন এক সময়ে, যখন পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT)-এর সর্বশেষ পর্যালোচনা সম্মেলন কোনো ঐকমত্যভিত্তিক দলিল গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ইরান যুদ্ধ এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনসহ বিভিন্ন সংঘাত বিশ্বকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
মাতসুই বলেন,
“আপনারা (নীতিনির্ধারকেরা) নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, পারমাণবিক অস্ত্রের যেকোনো ব্যবহার মানবজাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ এবং নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্ন কেবল বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। উদাহরণ সৃষ্টি করে নেতৃত্ব দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।”
সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে নীরবতা পালন
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে, ঠিক যে মুহূর্তে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট মার্কিন বি-২৯ বোমারু বিমান এনোলা গে (Enola Gay) থেকে ইউরেনিয়াম বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়েছিল, সেই সময় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
বোমা বিস্ফোরণের ফলে ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ আনুমানিক ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
তীব্র গরম উপেক্ষা করে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্কে জড়ো হন। শহর কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারের অনুষ্ঠানে ১২১টি দেশ ও অঞ্চল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যা একটি নতুন রেকর্ড।
তরুণদের শান্তির বার্তা
অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ১৯ বছর বয়সী জ্যাসপার লরেনসন এবং ১৮ বছর বয়সী লানা মুনিয়ান প্রথমবারের মতো এই অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন।
লরেনসন বলেন,
“আমার মনে হয়, এখনকার অনেক তরুণ শান্তির ধারণার প্রতি আরও বেশি উন্মুক্ত এবং যুদ্ধ উসকে দেওয়ার বক্তব্যে আগের মতো আগ্রহী নয়।”
জাপানের তিন অ-পারমাণবিক নীতি
বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে জাপানের দীর্ঘদিনের তিন অ-পারমাণবিক নীতি—নিজস্ব ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন না করা, অধিকার না করা এবং প্রবেশ করতে না দেওয়া—পুনর্বিবেচনা করা উচিত কি না, তা নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক বাড়ছে।
অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, জাপান এখনও এই তিন নীতি অনুসরণ করছে। যুদ্ধকালীন পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার একমাত্র দেশ হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া জাপানের দায়িত্ব।
তবে অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভবিষ্যতেও এই নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি শুধু বলেন, সরকার বর্তমানে এই নীতি “অনুসরণ করছে”।
এনপিটি সম্মেলনের ব্যর্থতা
চলতি বছরের মে মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এনপিটি পর্যালোচনা সম্মেলন টানা তৃতীয়বারের মতো কোনো ঐকমত্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়।
মেয়র মাতসুই এ ব্যর্থতার জন্য এমন রাজনৈতিক নেতাদের দায়ী করেন, যারা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে অন্যদের দোষারোপ করেন।
তিনি বলেন,
“তাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিকে দুর্বল করছে এবং এনপিটি চুক্তির বাধ্যবাধকতাকে উপেক্ষা করছে।”
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেন,
“ক্ষমতা ও জবরদস্তির নামে আবারও পারমাণবিক হুমকির ভাষা শোনা যাচ্ছে।”
জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল ইজুমি নাকামিৎসু অনুষ্ঠানে গুতেরেসের বার্তা পাঠ করে শোনান। সেখানে বিভেদের পরিবর্তে সংলাপের পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
হিবাকুশাদের সংখ্যা কমছে
পারমাণবিক বোমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া হিবাকুশাদের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে। হিরোশিমা সিটির তথ্য অনুযায়ী, সরকারি স্বীকৃত হিবাকুশাদের গড় বয়স এখন ৮৬ বছরেরও বেশি।
মেয়র মাতসুই তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“পারমাণবিক অস্ত্র বিলুপ্তিকে আন্তর্জাতিক সমাজের সাধারণ ও স্বাভাবিক মূল্যবোধে পরিণত করতে হবে।”
তিনি আরও আহ্বান জানান, জাপান যেন আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (TPNW)-এর পর্যালোচনা সম্মেলনে অন্তত পর্যবেক্ষক (Observer) হিসেবে অংশগ্রহণ করে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ছাতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় জাপান এখনও এই চুক্তিতে যোগ দেয়নি।
প্রার্থনা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
অনুষ্ঠান শুরুর আগে ভোর থেকেই বহু মানুষ এ-বোমা ভিকটিমস সেনোটাফ স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে ও প্রার্থনা করে নিহতদের স্মরণ করেন।
তাদের মধ্যে ছিলেন ইউকিয়ো কোকুফু, যিনি দ্বিতীয় প্রজন্মের হিবাকুশা। তার বাবা, মা ও বড় ভাই হিরোশিমায় বোমা হামলার শিকার হয়েছিলেন।
তার বাবা সরাসরি বিস্ফোরণের আঘাত থেকে রক্ষা পেলেও মা ও বড় ভাই তেজস্ক্রিয়তার শিকার হন। চিকিৎসার পর তার মা বেঁচে যান, কিন্তু মাত্র দেড় বছর বয়সে তার বড় ভাই মারা যায়।
কোকুফু নিজে বোমা হামলার অভিজ্ঞতা না পেলেও ছোটবেলা থেকে বাবা-মায়ের মুখে সেই বিভীষিকার গল্প শুনে বড় হয়েছেন। তিনি সারাজীবন মায়ের শরীরে কেলয়েড দাগও দেখেছেন।
বর্তমানে ৭৬ বছর বয়সী কোকুফু নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী পারমাণবিক বোমা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সংগঠন নিহোন হিদানকিও-এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের সদস্যদের সঙ্গে কাজ করছেন। তারা নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস তুলে ধরছেন এবং শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
তিনি বলেন,
“যুদ্ধ ভয়াবহ। যেকোনো মূল্যে এটি এড়াতে হবে। যুদ্ধে শুধু সৈন্যরা নয়, তাদের আশপাশের নিরীহ মানুষও নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধ আসলে হত্যা।”
দ্বিতীয় পারমাণবিক হামলা
হিরোশিমায় বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক হামলার তিন দিন পর, জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এর ছয় দিন পর জাপান মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
