মুক্তদেশ ডেস্ক: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। এক দশক আগেও বিদ্যুৎ ও শিল্পের প্রধান জ্বালানি ছিল দেশীয় গ্যাস। কিন্তু উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ কমে যাওয়া, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে ধীরগতি এবং চাহিদার লাগামহীন বৃদ্ধিতে এখন এলএনজি ও আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্ভরতা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকটের কাছে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দামে অস্থিরতা দেখা দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতে।
এই ঝুঁকির বাস্তব চিত্র আবারও সামনে এসেছে গত ২১ জুলাই থেকে এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায়। টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে ৪৫০ মিলিয় ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ফলে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ে। আবাসিক কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বাসা-বাড়িতেও হাহাকার শুরু হয়।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, কয়েক দিনের গ্যাস সংকটে অনেক কারখানাকে সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদনে যেতে হয়েছে। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (তিতাস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ পারভেজ আমাদের সময়কে বলেন, তিতাস গ্যাস মূলত পেট্রোবাংলা থেকে প্রাপ্ত গ্যাস গ্রাহকদের বিতরণ করে থাকে। তিতাসের কমবেশি প্রায় ১৯শ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদা রয়েছে। তবে গ্যাসের স্বল্পতায় তিতাস এলাকায় চাহিদার পুরো গ্যাস যাচ্ছে না। ফলে যতটুকু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, সেটা গ্রাহকদের গুরুত্ব বিবেচনায় সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তিতাস সুনির্দিষ্টভাবে বিদ্যুৎ, সার, শিল্প, বাণিজ্যিক আবাসিক বিভিন্ন গ্রাহকদের গ্যাস বিতরণ করে থাকে। এলএনজি টার্মিনাল কবে ঠিক হবে বা কবে নাগাদ সরবরাহ বাড়বে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি পেট্রোবাংলা মনিটর করছে। তবে আমরা জানতে পেরেছি- যত দ্রুত সম্ভব মেরামত করে গ্যাস সরবরাহ করা যায় সেই চেষ্টা চলছে।
একটি টার্মিনাল বন্ধে নড়বড়ে পুরো ব্যবস্থা
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশে এলএনজি গ্রহণের সক্ষমতা সীমিত। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা দিয়ে পুরো ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এটি শুধু কারিগরি সমস্যা নয়; বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতারও ইঙ্গিত বহন করে। কারণ শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নগর গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ এখন আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যখন বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ
বাংলাদেশের আমদানিকৃত অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারও ওই অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহের প্রভাবে দ্রুত অস্থির হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, অঞ্চলটিতে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে পারে। এলএনজির স্পট মার্কেটের মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে। জাহাজ চলাচল ও বীমা ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। আমদানির সময়সীমা দীর্ঘ হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এসব কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
দেশীয় গ্যাসে বিনিয়োগের অভাব
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধারাবাহিক বিনিয়োগের অভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতায় বাংলাদেশকে দ্রুত আমদানিনির্ভর হতে হয়েছে। সরকার অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরে নতুন গ্যাস ব্লক ইজারা দিতে উন্মুক্ত করা করেছে, প্রোডাক্টশন শেয়ারিং চুক্তি বা উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি (পিএসসি) সংশোধন, বাপেক্সের মাধ্যমে নতুন কূপ খনন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব ফল পেতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে কয়েকটি পদক্ষেপ ছাড়া ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।
শুধু আমদানি নয়, দরকার জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন কৌশল। যার মধ্যে রয়েছে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো। সমুদ্রে দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা। অতিরিক্ত এলএনজি টার্মিনাল ও বিকল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল কত দিন বন্ধ থাকবে? বিকল্প ব্যবস্থা কী? দীর্ঘমেয়াদে আর কতটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে? দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন কোনো বড় কর্মসূচি কবে শুরু হবে? মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে সরকার কীভাবে সেই চাপ মোকাবিলা করবে?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাম্প্রতিক এলএনজি সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা এখনও কয়েকটি আমদানিনির্ভর অবকাঠামোর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা যত বাড়বে, এই ঝুঁকিও তত বাড়বে।
সামগ্রিক ব্যবস্থায় সরকার কি ভাবছে? জানতে চাইলে জ¦ালানি বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব আমাদের সময়কে বলেন, এমনিতেই বাংলাদেশে জ¦ালানির সংকট ক্রমবর্ধমান। এদিকে যদি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ে তাহলে সংকট আরও বাড়বে। ফলে সরকার মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় জরুরি প্রস্তুতি শুরু করেছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, ফেব্রুয়ারি পর থেকে যুদ্ধপরিস্থিতিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত সেটা নিয়ে ভাবছে জ¦ালানি বিভাগ। যার মধ্যে অন্যতম হলো ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ ৯০ দিনের চাহিদার সমপরিমাণে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার ছয়টি দেশের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১৬ হাজার ৮০ কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমেও জ্বালানি তেল কেনা অব্যাহত থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যুদ্ধপরিস্থিতি খারাপ হলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় এলএনজি আমদানি। তবে সরকার গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে ধারাবাহিকভাবে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারের পরিকল্পনানুযায়ী, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও প্রায় ৬০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হবে। এ ছাড়া গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে আগামী ১৩ বছরে ৭৮টি এলএনজি কার্গো আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেয়।
এদিকে জ¦ালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরকার চীনের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যদিও এটা বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ।
