মুক্তদেশ ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। হল সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে দুই অতিথির বিরুদ্ধে ‘সমকামী কর্মকাণ্ডে’ জড়ানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে রোববার (২ আগস্ট) বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষ তাদের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে।
ঘটনার পর সন্ধ্যায় এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়। এদিকে, হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবি ও ঘটনার বিষয়ে ছাত্রদল-শিবির পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে। তবে প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
জানা যায়, শনিবার শহীদুল্লাহ হলের এজিএস ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে দুই অতিথির ‘সমকামী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে ধারণ করা কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দুই ব্যক্তিকে ক্ষমা চাইতে এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবেন না বলে বলতে শোনা যায়। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি তদন্তে নামে হল প্রশাসন।
এর ধারাবাহিকতায় রোববার বিকেলে হল প্রশাসনের উদ্যোগে তদন্ত কার্যক্রম চলছিল। এ সময় হল সংসদের এজিএস ইব্রাহীম খলিল ও তার রুমমেটকে তদন্ত কমিটির সামনে ডাকা হয়। তদন্ত চলাকালে হল সংসদের নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি ছাত্রদল ও শিবিরের নেতা-কর্মীরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে হলের বাইরে ছাত্রদলপন্থী কয়েকজন শিক্ষার্থী বিক্ষুব্ধ হয়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরে তারা প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করলে সেখানে উপস্থিত শিবিরপন্থি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোছাদ্দিক আল হক শান্ত অভিযোগ করেন, এজিএস ইব্রাহীম খলিলকে রক্ষা করতে শিবির বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। তার দাবি, ঘটনার আগের দিন সিসিটিভির ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে, যাতে ঘটনার সময় এজিএস হলে ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া না যায়।
তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির কার্যক্রম চলাকালে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও সেখানে অবস্থান নেন। পরে শিবিরের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা করেন। এতে ছাত্রদলের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, শহীদুল্লাহ হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) তৌকির হাসান ছাত্রদলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির ডাকে তারা এজিএস ও তার রুমমেটকে নিয়ে তদন্তে অংশ নিতে যান। তদন্ত চলাকালে ছাত্রদলের কয়েকজন সদস্য সেখানে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
তৌকির হাসানের দাবি, পরে ছাত্রদলের সদস্যরা প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় শিবিরের এক সদস্য তাদের ছবি তুলেছেন—এমন অভিযোগ তুলে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। পরে তাঁরা প্রাধ্যক্ষের কক্ষে আশ্রয় নেন। সেখানে ঘটনার ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হলে সেটিকে কেন্দ্র করেও আবার হামলা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনাস্থলে কয়েকজন হাউস টিউটর উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এর আগে অভিযোগের বিষয়ে শহীদুল্লাহ হল সংসদের এজিএস ইব্রাহীম খলিল বলেন, তার মায়ের মামাতো ভাই চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে কিছু সময় বিশ্রামের জন্য তার কক্ষ ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিলেন। তার সঙ্গে আরও একজন ছিলেন।
ইব্রাহীম খলিলের দাবি, ঘটনার সময় তিনি হলে ছিলেন না। ক্লাস শেষে বন্ধুদের সঙ্গে মাওয়া গিয়েছিলেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন। আগে জানতে পারলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, এখন বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি
ঘটনার পর শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম ভূঞা পদত্যাগ করেছেন বলে ছাত্রদল ও শিবির উভয় পক্ষ থেকেই দাবি করা হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জানিয়েছেন, শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ পদত্যাগ করেননি।
তবে এ ব্যাপারে প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ এবং ঘটনার প্রতিবাদে রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মু. মহিউদ্দিন খান ঘটনার প্রতিবাদ জানান।
তিনি বলেন, তারা সবসময় নিয়মতান্ত্রিকভাবে ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদ করে আসছেন। কিন্তু হল সংসদের ওপর দফায় দফায় হামলা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে তিনি ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
ঘটনার বিষয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের হাউস টিউটর ড. মো. আনোয়ার হোসাইন ভূইয়া বলেন, হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটির বিষয়ে আলোচনা চলছিল। এ সময় বাইরে কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পরে তাঁদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল রতন বলেন, হল প্রশাসনের তদন্ত মিটিংয়ে সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে এবং হাতাহাতির ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই সেখানে প্রক্টরিয়াল টিম পাঠানো হয়। দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
