মুক্তদেশ ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সিন্ডিকেট সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন অভিযোগে ছয়জন অধ্যাপককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিন শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নিয়োগ পর্যালোচনার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন, হেকেপ প্রকল্পের গবেষণা তহবিলের ব্যবহার খতিয়ে দেখতে পৃথক কমিটি এবং আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘নীল দল’-এর কার্যক্রম নিয়ে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ২৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের বিরুদ্ধে স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অধ্যাপক সাদেকা হালিম সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। তিনি ২০২২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং এর আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, ‘‘আমি বিষয়টি সম্পর্কে কিছুটা জেনেছি। আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির সুপারিশ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’’
সিন্ডিকেট সভায় শ্রেণিকক্ষে ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে অশিক্ষকসুলভ আচরণ, নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন অভিযোগে অধ্যাপক সাদেকা হালিমকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং তথ্যানুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক ড. আফরোজা শেলীকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী কর্মকাণ্ড, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারবিরোধী অপপ্রচার, নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতকে বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
একই অভিযোগে ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সারা শামসুর রউফ এবং পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম (রফিক শাহরিয়ার)-কেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এছাড়া বিভাগের বিভিন্ন অনিয়ম এবং এমফিল ও পিএইচডি গবেষণাপত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনকে সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
সিন্ডিকেটে সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব নিয়োগ পর্যালোচনা করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই করা হবে। এ লক্ষ্যে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালামকে আহ্বায়ক এবং সব অনুষদের ডিনদের সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ ছাড়া একই সময়ে বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে পরিচালিত হেকেপ (HEQEP) প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত গবেষণা কার্যক্রম এবং গবেষণা তহবিলের ব্যবহার পর্যালোচনায় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে পৃথক একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শিক্ষক, ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছে সিন্ডিকেট। এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ লক্ষ্যে উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্য এবং সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খানকে নিয়ে চার সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’ প্ল্যাটফর্মের দেওয়া ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা পর্যালোচনা করবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সেই সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. তাজমেরি এস এ ইসলাম বলেন, “জুলাই নিয়ে কটূক্তি করা এবং জুলাইবিরোধী অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আরও অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এর আগে গত সোমবার ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’-এর ব্যানারে শতাধিক শিক্ষক উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী মতাদর্শের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ‘নীল দল’ নিষিদ্ধের দাবি জানান। ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই বিষয়টি তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ ছাড়া অফিস শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) এ কে এম মাহবুব মুস্তাফা পিইঞ্জকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সিন্ডিকেট সভায় প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন মলচত্বরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে ‘জুলাই স্মৃতি স্তম্ভ’ নির্মাণের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। আগামী ৫ আগস্ট স্মৃতিস্তম্ভটির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
