এম. হাসান :
দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০ ও ৩০ বছর বয়সীরা যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী, তেমনি তারাই দেশটিতে বই পড়ার নতুন জোয়ার সৃষ্টি করছেন, যা প্রকাশনা শিল্পেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের জাতীয় পাঠ জরিপ অনুযায়ী, বছরে অন্তত একটি বই (মুদ্রিত, ডিজিটাল বা অডিওবুক) পড়েন—এমন প্রাপ্তবয়স্কের হার এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কমছে। ২০১৩ সালে এ হার ছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশে।
তবে তরুণদের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। ২০ ও ৩০ বছর বয়সীরা এখনো প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই পড়েন। জরিপে দেখা গেছে, ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে বই পড়ার হার ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের ইন্টারনেট ব্যবহারবিষয়ক আরেকটি জরিপে দেখা যায়, জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের হারও এই দুই বয়সী গোষ্ঠীর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি—২০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৭১ দশমিক ১ শতাংশ।জাপানের জনপ্রিয় দৈনিক মাইনিচি এ সব তথ্য জানিয়েছে।
বইমেলায় উপচে পড়া ভিড় :
জুনের শেষ দিকে সিউলের কোএক্স (COEX) কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত সিউল আন্তর্জাতিক বইমেলায় তরুণদের এই আগ্রহ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সকাল ১০টায় মেলা শুরুর আগেই প্রবেশপথে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
দেশের বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মিনুমসা-র স্টলে ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। এছাড়া যেখানে বুকমার্ক বেছে নিলে তার সঙ্গে মিলিয়ে বইয়ের সুপারিশ দেওয়া হচ্ছিল, সেই স্টলেও দিনের সবচেয়ে দীর্ঘ সারিগুলোর একটি দেখা যায়।
বছরে ২৪টি বই পড়েছেন এক শিক্ষার্থী:
২১ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী ওহ দা ইয়ং মিনুমসার স্টলে মোটা মোটা সাহিত্যকর্ম হাতে নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি জানান, গত বছর তিনি ২৪টি বই পড়েছেন, যা দক্ষিণ কোরিয়ার একজন প্রাপ্তবয়স্কের গড় বই পড়ার সংখ্যার প্রায় ১০ গুণ। এ বছর তিনি আরও বেশি বই পড়ার লক্ষ্য নিয়েছেন। দুই বন্ধুকে নিয়ে গড়া একটি ছোট পাঠচক্র, যেখানে তারা বই বিনিময় ও পর্যালোচনা করেন, সেটিও তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। ওহ বলেন, “আমার আশপাশের মানুষ বই পড়তে ভালোবাসে বলেই আমিও বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছি।”
তিনি ই-বুকের চেয়ে মুদ্রিত বইকেই বেশি পছন্দ করেন। তার ভাষায়, “নিজের টাকা দিয়ে যখন একটি বই কিনি, তখন সত্যিই মনে হয় এটি আমার নিজের।”
প্রকাশনা বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব :
এই প্রবণতার অন্যতম বড় উদাহরণ মিনুমসা। ২০২৫ সালে সামগ্রিক বাণিজ্যিক বইয়ের বাজার ৬ দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হলেও প্রতিষ্ঠানটির আয় ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বড় প্রকাশকদের তালিকায় তাদের অবস্থান ১১তম থেকে অষ্টমে উঠে এসেছে।
প্রকাশনাটি ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে তরুণ পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সেখানে সম্পাদকরা সহজ ও বন্ধুসুলভ ভঙ্গিতে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন এবং বইয়ের সুপারিশ দেন।
বই পড়াকে ‘কুল’ বানিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
মেলার আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ ও ২০২৩ সালে যেখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ, সেখানে এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজারে।
এই প্রবণতার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। “টেক্সট-হিপ” (Text-Hip) নামে একটি নতুন ধারণা জনপ্রিয় হয়েছে, যার অর্থ—বই পড়া এখন স্টাইলিশ বা ‘কুল’। ফলে তরুণরা সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের পড়ার অভ্যাস শেয়ার করছেন এবং বইকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন। মেলায় অনেককেই বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টলে ছবি তুলতে দেখা গেছে।
৩৭ বছর বয়সী লি মুন জু জানান, তিনি মাঝে মাঝে পড়া বইয়ের প্রিয় অংশ সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন, তবে তা অন্যদের জন্য নয়, নিজের আনন্দের জন্য।
ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য বই পড়া :
প্রথমবারের মতো বইমেলায় আসা ৩৪ বছর বয়সী পার্ক জি ইয়ং বলেন, কয়েক বছর আগে ব্যক্তিগত উন্নতির উদ্দেশ্যে তিনি বই পড়া শুরু করেন।
জাতীয় পাঠ জরিপেও দেখা গেছে, বিনোদনের পর ব্যক্তিগত উন্নয়নই প্রাপ্তবয়স্কদের বই পড়ার দ্বিতীয় প্রধান কারণ। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি প্রতি সেমিস্টারে প্রায় ১০টি বই পড়েন।
বই বুঝতে এআইয়ের সহায়তা :
পার্ক নিয়মিত এআই ব্যবহার করেন। তিনি জানান, গুগলের জেমিনি (Gemini) ব্যবহার করে সাহিত্য আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেন।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির Kafka on the Shore পড়ার সময় বইয়ের বিভিন্ন উল্লেখ বা প্রতীক ব্যাখ্যা করতে জেমিনিকে বলেন। পাশাপাশি আগে পড়া বইয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন ঘরানার নতুন বইয়ের সুপারিশও নেন।
তিনি বলেন, “আমি জেমিনিকে বলি—’আমি এই বইটি পড়েছি। এখানে এই শব্দটি এসেছে। গল্পের প্রেক্ষাপটে এর অর্থটি ব্যাখ্যা করতে পারো?'”
অন্যদিকে ওহ জানান, তিনি রেপভ (Repov) নামের একটি অ্যাপে নিজের পড়া বইয়ের তালিকা সংরক্ষণ করেন এবং পড়াশোনার কাজেও এআই ব্যবহার করেন।
সবাই এআইকে স্বাগত জানাচ্ছেন না। তবে একই প্রজন্মের সবাই এআই ব্যবহারে আগ্রহী নন।
বইমেলায় আসা ২১ বছর বয়সী কিম হান বি বলেন, তিনি এআই এড়িয়ে চলেন, কারণ এর তথ্যসূত্রকে তিনি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। তার পরিবর্তে তিনি বই ও গবেষণাপত্র থেকে তথ্য খুঁজে নিতে পছন্দ করেন। ওহ অবশ্য মনে করেন, এআই-ই বই পড়ার নতুন জোয়ারের অন্যতম কারণ।
তার ভাষায়, “আমার মনে হয় এআইয়ের কারণেই বই পড়ার এই নতুন জোয়ার এসেছে। মানুষ এত বেশি এআই ব্যবহার করছে যে তারা নিজেরা পড়া ও চিন্তা করার সময় হারিয়ে ফেলছে। পরে তারা বুঝতে পারছে, নিজের চিন্তাশক্তি গড়ে তুলতে এবং নিজেকে প্রকাশ করতে আবার বইয়ের কাছেই ফিরে যেতে হবে।”
Previous Articleরোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে ৫ হাজারকে ফেরত নিতে রাজি মিয়ানমার: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী
Next Article ঢাবির ৬ অধ্যাপককে অব্যাহতি, সাদেকা হালিমকে বহিষ্কার
Related Posts
Add A Comment
