মুক্তদেশ : ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা শনিবার দাবি করেছে, ইয়েমেনের কৌশলগত লোহিত সাগর উপকূলীয় শহর হোদাইদায় সৌদি আরবের বিমান হামলার জবাবে তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই এ হামলার ঘটনা ঘটল। সূত্র : এপি
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহইয়া সারি পূর্বে ধারণ করা এক ভিডিও বার্তায় বলেন, লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু ও জিজান শহরে বিশ্বের বৃহত্তম তেল কোম্পানি আরামকো-এর স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, শনিবার ভোরে ইয়ানবু ও জিজান শহরে একাধিকবার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। তবে এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আর কোনো মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে, টানা প্রায় দুই সপ্তাহ যুক্তরাষ্ট্রের রাতের হামলার পর শনিবার রাতে ইরানে নতুন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
লোহিত সাগরের উত্তেজনায় বৈশ্বিক বাণিজ্য হুমকির মুখে
হুথিরা ঘোষণা দিয়েছে, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের অবরোধ এবং বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালি সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেবে।
হুথি-নিয়ন্ত্রিত সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের প্রধান মাহদি আল-মাশাত বলেন,
“আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে এবং অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। তা না হলে অন্য সব প্রতিশ্রুতি মরীচিকা ছাড়া কিছু নয়।”
আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্য, যার মধ্যে বৈশ্বিক কনটেইনার পরিবহনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ, এই প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়।
তেলবাহী জাহাজে হামলার পর হোদাইদায় সৌদি বিমান হামলা
চলতি সপ্তাহে হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট শুক্রবার গভীর রাতে হোদাইদায় বিমান হামলা চালায়।
হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আনিস আল-আসবাহি জানান, হামলায় বন্দর এলাকা ও রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ করপোরেশনের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত দুজন আহত হয়েছেন।
তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করেছে, তারা বন্দরে হামলা চালায়নি। তাদের ভাষ্য, হোদাইদা প্রদেশে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছিল—এমন “বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে” হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ইয়েমেন সংকট সমাধানে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে “কূটনীতি ও সংলাপ”-এর আহ্বান জানান।
কাস্পিয়ান সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার নিন্দা ইরানের
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন,
“ইরানে শান্তিপূর্ণ একটি রাত কেটেছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। আগের ১৩ রাতের মতো এবার নতুন হামলার ঘোষণাও দেয়নি।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, শনিবার কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে। এতে একজন নিহত ও আরেকজন আহত হয়েছেন। তেহরান এ ঘটনাকে “আগ্রাসন” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আলাদা এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, এ বিষয়ে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাসের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ঘটনার প্রতিক্রিয়া দাবি করেছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনের কূটনৈতিক প্রতিনিধিকেও তলব করেছে ইরান।
এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক্সে লিখেছিলেন, কাস্পিয়ান সাগরে দূরপাল্লার হামলায় ইউক্রেন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, যার মধ্যে ইরানের সামরিক মালামাল বহনে ব্যবহৃত জাহাজও ছিল।
ট্রাম্প–নেতানিয়াহু বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চললেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। তাঁর কার্যালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
দুজনের সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে, যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে।
সংঘাতে নিহত সাত হাজারের বেশি
কয়েক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ থাকলেও চলতি মাসে যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর দিকে হামলা চালায়।
মার্কিন বাহিনী আবারও ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর অবরোধ জোরদার করেছে। একই সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) প্রতিবেশী দেশগুলোর বাসিন্দাদের যুক্তরাষ্ট্রের সেনাঘাঁটির কাছাকাছি না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধে দেশটিতে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া অঞ্চলজুড়ে ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য, ইসরায়েলে ২৪ জন বেসামরিক নাগরিক, এবং বিদেশি শ্রমিক ও নাবিকসহ আরও কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধ শুরুর দুই দিন পর ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর থেকে ইসরায়েলের পাল্টা বিমান ও স্থল অভিযানে লেবাননে ৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ৩৮ জন ইসরায়েলি সেনাও প্রাণ হারিয়েছেন।
