মুক্তদেশ ডেস্ক: মিনারুল হকের বাগানে এখন আর মৌসুমের সেই কোলাহল নেই। কয়েক সপ্তাহ আগেও থাই চিয়াংমাই, ব্রুনেই কিং, রেড পালমার কিংবা হানিডিউ আমগাছের নিচে ভিড় করতেন ক্রেতারা। কেউ গাছ থেকে পছন্দের আম বেছে নিচ্ছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার আগেই বুকিং দেওয়া আম বুঝে নিচ্ছেন। এখন সেই গাছগুলোর বেশির ভাগই ফলশূন্য। শেষ মৌসুমের বারি-৪ আম ঝুলছে হাতে গোনা কয়েকটি গাছে। সেগুলোও আর কয়েক দিনের অতিথি।
তবে মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই বিক্রি হয়ে গেছে বাগানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আমগুলো। কারণ, এগুলো সাধারণ কোনো আম নয়। কোনোটি কলার মতো লম্বাটে, কোনোটি পাকলেও খোসায় লাল আভা ধরে রাখে, আবার কোনোটি ‘মধুর’ মতো মিষ্টি স্বাদের জন্য পরিচিত। এসব ব্যতিক্রমী আমই বদলে দিয়েছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার খিতাপচর গ্রামের কৃষক মিনারুল হকের (৬০) জীবন।
এবারের মৌসুমে দেশি জাতের আম্রপালি ও বারি-৪ এর পাশাপাশি তাঁদের বাগানে ছিল থাইল্যান্ডের বারোমাসি কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই, চিয়াংমাই, হানিডিউ ও কিং অব চাকাপাত, ব্ল্যাক স্টোন, ব্রুনেইয়ের ব্রুনেই কিং, যুক্তরাষ্ট্রের রেড পালমার এবং চীনের রেড আইভরিসহ ১৩ জাতের আম। এসব বিরল আম দেখতে, স্বাদ নিতে ও কিনতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন। মৌসুমজুড়ে প্রায় ১০ হাজার কেজি আম বিক্রি করে আয় হয়েছে ৮ লাখ টাকার বেশি। মিনারুল হক বলেন, ‘ভয়ে ভয়ে এসব বিদেশি জাতের আমের চারা লাগিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আমাদের আবহাওয়ায় ফলন হবে কি না। কিন্তু ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি ক্রেতারও অভাব হয়নি। আগামী মৌসুমে আরও বড় পরিসরে আমের চাষ করব।
’বরই দিয়ে শুরু
ছয় বছর আগেও মিনারুল হকের অধিকাংশ জমি ছিল অনাবাদি। জোয়ারের সময় লোনা পানি ঢুকে পড়ত। আগাছায় ভরা সেই জমিতে চাষাবাদের কথা কেউ ভাবতেন না। অন্যদিকে তাঁর দুই ছেলে তানভীরুল হক ও সাইদুল হক উচ্চমাধ্যমিকের পর চাকরির আশায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও সফল হচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তাঁরা চাকরির পেছনে না ছুটে বাবার পরিত্যক্ত জমিতেই ভবিষ্যৎ গড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মাত্র ৩৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ৭০টি বরইগাছ লাগিয়ে শুরু হয় তাঁদের যাত্রা। সেই উদ্যোগই আজ ১০ একরজুড়ে বিস্তৃত ‘মেসার্স হক অ্যাগ্রো ফার্ম’-এ পরিণত হয়েছে।
মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই বিক্রি হয়ে গেছে বাগানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আমগুলো। কারণ, এগুলো সাধারণ কোনো আম নয়। কোনোটি কলার মতো লম্বাটে, কোনোটি পাকলেও খোসায় লাল আভা ধরে রাখে, আবার কোনোটি ‘মধুর’ মতো মিষ্টি স্বাদের জন্য পরিচিত।
বর্তমানে বাগানটিতে রয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার ফল গাছ। আমের পাশাপাশি বরই, পেয়ারা, মাল্টা, কলা, ডাব ও সুপারির বাগান রয়েছে। আছে মাছের ঘের, গরু, ছাগল ও হাঁসের খামার। খামারের বর্জ্য থেকেই তৈরি হয় জৈব সার, আবার সেই সারই ব্যবহার করা হয় ফল গাছে। পুরো খামারটি এখন সমন্বিত কৃষিব্যবস্থার একটি উদাহরণ।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বাগানের প্রতিটি জাতের আমেরই রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। আম্রপালি ও বারি-৪ উচ্চ ফলনশীল ও বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয়। বারোমাসি কাটিমন বছরে একাধিকবার ফল দেওয়ার সক্ষমতার জন্য পরিচিত। ব্যানানা ম্যাঙ্গো আকারে লম্বাটে, আর রেড পালমার পাকলে খোসায় লালচে আভা ফুটে ওঠে। অন্যদিকে থাই চিয়াংমাই, থাই কিউজাই, ব্রুনেই কিং, হানিডিউ, ব্ল্যাক স্টোন ও কিং অব চাকাপাত জাতগুলো আকার, রং, স্বাদ, সুগন্ধ এবং পাকার সময়ের দিক থেকে একে অন্যের থেকে ভিন্ন। ফলে মে মাস থেকে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে আম সংগ্রহ করা যায়। এতে দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে বিভিন্ন জাতের আম সরবরাহ সম্ভব হয়।
