মু্ক্তদেশ ডেস্ক: ভারতের তরুণ সমাজ রাজপথে। তাঁরা সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহি দাবি করছেন। তাঁদের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বড় একটি অংশের প্রতি তরুণদের তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণা ও অবজ্ঞা। কিছু সংবাদমাধ্যমের চাটুকারিতাকে ব্যঙ্গ করছেন তাঁরা। এমন সব পোস্টার তরুণদের বিক্ষোভে দেখা যাচ্ছে যেখানে ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে অনেক সাংবাদিকের তথাকথিত ‘ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক নিয়ে রসিকতা করা হচ্ছে। দ্য ওয়ার
মূলধারার বা ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম বলতে সাধারণত প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র ও টিভি নিউজ চ্যানেলগুলোকে বোঝায়। ভারতে এমন সংবাদমাধ্যম প্রচুর রয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৯০০টি বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারে রয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকই সংবাদ পরিবেশন করে থাকে।
‘গোদি মিডিয়া’
সত্যি বলতে, ভারতের তরুণ সমাজের ক্ষোভের বড় অংশটিই টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলগুলোর ওপর গিয়ে পড়েছে। ‘গোদি’ বা ‘লেজ গুটিয়ে থাকা পোষা মিডিয়া’ শব্দটি এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই লড়াইয়ের নেতৃত্বে রয়েছে এমন এক প্রজন্ম, যাদের টিভি নিউজ দেখার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই, আবার নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাসও নেই।
বর্তমানে ভারতে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের অর্ধেকের বেশি বলছেন, সংবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই তাঁদের প্রধান উৎস। তাহলে, গত ১২ বছরের প্রতিবেদন ও টেলিভিশন খবরের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে কেন তাঁরা এত সোচ্চার?
এর একটি উত্তর হতে পারে, বেশির ভাগ তরুণই মূলত ‘সোশ্যাল ফার্স্ট’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর। খবর জানা, খবর নিয়ে আলোচনা করা বা এতে আগ্রহ তৈরি হওয়া—এসবই ঘটছে ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের মতো তৃতীয় পক্ষের প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে। আগের প্রজন্মের মতো টেলিভিশনের প্রতি তাঁদের কোনো টান নেই কিংবা টিভির সংবাদ উপস্থাপকদের (অ্যাঙ্কর) প্রতিও কোনো অন্ধ ভক্তি নেই।
অথচ ভারতে দীর্ঘ দিন ধরে এই সংবাদ পাঠকেরা সুপারস্টারের মর্যাদা ভোগ করেছেন; মাঠে রিপোর্ট করার সময় লোকজন তাঁদের চারপাশে ভিড় জমাত, একই টিভি সাংবাদিকদের সঙ্গে সেলফি তুলতে বা অটোগ্রাফ নিতে লাইন ধরে দাঁড়াত। কিন্তু তরুণ দর্শকরা সামাজিক মাধ্যমমুখী, তারা খবর পরিবেশনে সততা এবং জবাবদিহি দাবি করে।
সাংবাদিকতার মুখোমুখি হওয়া ও মেনে নেওয়ার মতো অন্য জটিল কারণ হলো—জনগণ ও সাংবাদিকতার মধ্যকার চুক্তি বা বিশ্বস্ততার ভাঙন। তরুণেরা কেবল তাঁদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো—যেমন বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক কল্যাণমূলক ব্যবস্থার অভাবের মতো সংবাদ পুরোপুরি চেপে যেতেই দেখেনি; বরং বছরের পর বছর ধরে যেসব নিউজ চ্যানেলের কাজ ছিল জনগণের দাবি তুলে ধরা, তারা উল্টো জনগণের সেই চাওয়া-পাওয়াকে পদ্ধতিগতভাবে বিতর্কিত বা ছোট করেছে।
অনেক টেলিভিশন চ্যানেল তাদের বুলেটিনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বলেছিল—কোনো করোনা–সংকট ছিল না, শিক্ষার কোনো জরুরি সংকট ছিল না। অথচ অধিকাংশ শিশু যে অনলাইন শিক্ষার নাগালই পায়নি সেটার স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রায় দুই বছর ভারতের বেশির ভাগ স্কুল বন্ধ ছিল।
এখন আবার এসব টিভি চ্যানেল বলতে শুরু করেছে, দেশে কোনো চাকরির সংকটও নাকি নেই। অথচ তরুণ শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থা আর জালিয়াতিতে ভরা পরীক্ষাপদ্ধতি পেরিয়ে শেষমেশ চাকরির বাজারে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন।
জনগণ ও সাংবাদিকতার মধ্যকার এই ভাঙা চুক্তি জোড়া লাগাতে ভারতীয় সাংবাদিকতা এখন কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ভারতের সংবাদব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
