হোলি আর্টিজানের সেই রাত, এক দশকেও মুছে যায়নি যে ক্ষত
মু্ক্তদেশ ডেস্ক: ঢাকার গুলশান লেকপাড়ের যে স্থানে একসময় ছিল হোলি আর্টিজান বেকারি, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে একটি বহুতল আবাসিক ভবন। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এক দশক আগে এই জায়গাটিই বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার কেন্দ্রস্থল ছিল। গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়ক, কূটনৈতিক এলাকার কঠোর নিরাপত্তাবলয় এবং লেকপাড়ের শান্ত পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের রাতটি বাংলাদেশকে এক নতুন ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।
আজ ১ জুলাই, সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো। সময়ের হিসাবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের আতঙ্ক, স্বজন হারানোর আর্তনাদ, বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের কয়েকজন তরুণের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা এখনো বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইতিহাসে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।
২০১৬ সালের ১ জুলাই ছিল শুক্রবার। সন্ধ্যার পর গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। ইফতারের কিছুক্ষণ পর অস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র হাতে কয়েকজন তরুণ রেস্তোরাঁয় ঢুকে জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। পরে র্যাব, সোয়াট, বিজিবি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন।
প্রথম দফায় জিম্মিদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাতে গিয়ে হামলাকারীদের ছোড়া বিস্ফোরকে গুরুতর আহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান। পরে দুজনই মারা যান। আহত হন আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য। রাতভর গুলশানের রাস্তায় উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করেন জিম্মিদের স্বজনেরা। ভেতরে তাঁদের প্রিয়জনেরা জীবিত আছেন কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না।
পরদিন, ২ জুলাই সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। সাঁজোয়া যান দিয়ে রেস্তোরাঁর দেয়াল ভেঙে কমান্ডোরা ভেতরে প্রবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযান শেষ হয় এবং জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জনকে। তবে অভিযান শেষে প্রকাশ পায় হামলার প্রকৃত ভয়াবহতা। রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ২০ জিম্মির মরদেহ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক। পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ ওই হামলায় মোট নিহত হন ২২ জন।
যাঁরা প্রাণ হারিয়েছিলেন
হোলি আর্টিজান হামলায় নিহতের সংখ্যা ২২—এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে ২২টি পরিবারের অসহনীয় শোক এবং অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্ন। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে ছিলেন ফারাজ হোসেন, অবিন্তা কবির ও ইশরাত আখন্দ। ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে নিহত হন তারিশি জৈন।
ইতালির নিহত নাগরিকরা ছিলেন ক্লাউদিয়া কাপেল্লি, ভিনচেনসো দালেস্ত্রো, মার্কো তোন্দাৎ, নাদিয়া বেনেদিত্তি, সিমোনা মন্তি, ক্রিস্তিয়ান রসি, মারিয়া রিবোলি, আদেলে পুলিজি ও ক্লাউদিয়া দান্তোনা।
জাপানের নিহত নাগরিকরা ছিলেন ওকামুরা মাকাতো, কোয়ো ওগাসাওয়ারা, হাসিমাতো হিদেকো, তানাকা হিরোশি, সাকাই ইউকু, শিমুধুইরা রুই এবং কুরুসাকি নুবুহিরি।
নিহত সাত জাপানি নাগরিক বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগিতা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মৃত্যু শুধু মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক আস্থার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। একইভাবে ইতালীয় নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড ইউরোপজুড়ে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে। কূটনৈতিক এলাকার মতো উচ্চনিরাপত্তা অঞ্চলে বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে এমন হামলা বাংলাদেশের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
হোলি আর্টিজান হামলার নিষ্ঠুরতা ছিল পরিকল্পিত এবং সুসংগঠিত। তদন্ত, আদালতে উপস্থাপিত তথ্য এবং জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, হামলাকারীরা জিম্মিদের ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করার চেষ্টা করেছিল। কয়েকজন বাংলাদেশি মুসলিম সুরা পাঠ করতে পারায় প্রাণে বেঁচে যান। অন্যদিকে বিদেশি জিম্মিদের ওপর নৃশংসভাবে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়, যা এই ঘটনার বর্বরতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
