খেলা ডেস্ক: বিশ্বকাপের মঞ্চে গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও আফ্রিকার নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসা মরক্কো। তবে আন্ডারডগ হিসেবে মাঠে নামলেও চাপ তৈরি করে প্রথমে এগিয়ে যায় মরক্কো। ম্যাচের ২১তম মিনিটে গোলটি করেন ইসমাইল সাইবারি। অবশ্য দ্রুতই ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোলে সমতা পায় ব্রাজিল
ব্রাজিলের রক্ষণভাগের মাঝখান চিরে দারুণ এক নিখুঁত পাস বাড়ান ব্রাহিম দিয়াজ, আর সেই বল ধরে সামনে ছুটে যান। তিনি তখন ব্রাজিলের দুই সেন্টার-ব্যাকের মাঝখানে। গোলরক্ষক আলিসনও লাইন ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে ছিলেন। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় বলটি তুলে জালে পাঠান সাইবারি।
তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না ব্রাজিলের সংকট, দুর্দান্ত গোলে সমতায় ফিরল সেলেসাও। ম্যাচের ৩২তম মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোলে স্বস্তি ফিরেছে ব্রাজিল শিবিরে।
ব্রুনো গিমারায়েসের বাড়ানো পাস থেকে পেনাল্টি এলাকার বাঁ দিকের প্রান্তে বল পান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এরপর তিনি ভেতরের দিকে কেটে ডান পায়ে বল নিয়ে অসাধারণ এক শক্তিশালী শট নেন। তার সেই দুর্দান্ত প্রচেষ্টা সরাসরি জালের ছাদের দিকে গিয়ে আঘাত করে, গোলরক্ষকের কোনো সুযোগই ছিল না।
এই ম্যাচটি শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, বরং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ। একদিকে ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক, সৃজনশীল ফুটবল; অন্যদিকে মরক্কোর শৃঙ্খলাপূর্ণ রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং লড়াকু মানসিকতা। গ্রুপ-‘সি’ এর সবচেয়ে সেরা ম্যাচ এটি হতে যাচ্ছে নিঃসন্দেহে।
রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের সামনে নতুন শুরুর চ্যালেঞ্জ। ব্রাজিল সবসময় বিশ্বকাপে অন্যতম ফেবারিট দল হিসেবেই মাঠে নামে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামছে সেলেসাওরা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় টুর্নামেন্টে প্রত্যাশামতো সাফল্য না পাওয়ায় দলের ওপর চাপও রয়েছে। নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল এবার আরও সংগঠিত ফুটবল খেলতে চাইছে। ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য পাওয়া এই অভিজ্ঞ কোচ জাতীয় দলের মঞ্চে নিজের কৌশল প্রমাণ করতে প্রস্তুত। ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রসহ একাধিক বিশ্বমানের খেলোয়াড় থাকায় মরক্কোর রক্ষণকে
কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। তবে দলটির জন্য বড় প্রশ্ন থাকবে তারা কি শুরু থেকেই নিজেদের ছন্দ খুঁজে পাবে, নাকি প্রতিপক্ষের শক্ত রক্ষণে আটকে যাবে।
মরক্কো আর ‘আন্ডারডগ’ নয়। এটি তারা আাগের বিশ্বকাপে প্রমাণ করেছে। ২০২২ বিশ্বকাপে ইতিহাস তৈরি করে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছানো মরক্কো এখন আর শুধু চমক নয়, তারা বিশ্ব ফুটবলের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। আশরাফ হাকিমির নেতৃত্বে মরক্কোর দল ইউরোপিয়ান লিগে খেলা অভিজ্ঞ ফুটবলারদের নিয়ে গঠিত। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সংগঠিত রক্ষণভাগ, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত আক্রমণে ওঠার ক্ষমতা। ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে মরক্কো সম্ভবত বল দখলের লড়াইয়ের চেয়ে জায়গা নিয়ন্ত্রণ ও পাল্টা আক্রমণকে বেশি গুরুত্ব দেবে। ছোট ভুলও তারা কাজে লাগাতে পারে।
বিশ্বকাপের মূল পর্বে ব্রাজিল ও মরক্কোর সাক্ষাৎ খুব বেশি হয়নি। তাদের আগের বিশ্বকাপ লড়াইয়ে ১৯৯৮ সালে ব্রাজিল ৩-০ গোলে জয় পেয়েছিল। তবে বর্তমান মরক্কো আগের সেই দলের মতো নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা নিজেদের ফুটবল সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ব্রাজিল মরক্কো এ পর্যন্ত তিনবার মুখোমুখি হয়েছে। যার মধ্যে ব্রাজিলের জয় দুটি আর অন্যটিতে জয় পেয়েছে মরক্কো।
ব্রাজিল তাদের কৌশল হিসেবে বল দখলে আধিপত্য রাখার চেষ্টা করবে উইং দিয়ে আক্রমণ তৈরি করবে। দ্রুত পাসিংয়ের মাধ্যমে মরক্কোর রক্ষণ ভাঙতে চাইবে। ব্রাজিলের জন্য দুঃসংবাদ হিসেবে বয়ে এনেছে ইনজুরির কারণে প্রথম ম্যাচ খেলছেন না নেইমার। তবুও দলটি যেহেতু ব্রাজিল তাই তাদের শক্তিমত্তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে দলের আক্রমণভাগে রয়েছে সেরা সেরা তারকা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, এনদ্রিকরা।
মরক্কো সম্ভবত নিচে নেমে শক্ত রক্ষণ তৈরি করবে। মাঝমাঠে চাপ সৃষ্টি করবে। সুযোগ পেলেই দ্রুত কাউন্টার আক্রমণে যাবে। বিশেষ করে মরক্কো দলের অন্যতম ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমি ও দলের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা ব্রাজিলের জন্য বড় হুমকি হতে পারেন।
কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও মরক্কোকে সহজ প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ নেই। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে অনেক সময় চাপ, মানসিক প্রস্তুতি ও ছোট মুহূর্তগুলো ফলাফল নির্ধারণ করে। একদিকে ব্রাজিল চাইবে শক্তিশালী শুরু দিয়ে শিরোপা অভিযানের বার্তা দিতে, অন্যদিকে মরক্কো আবারও প্রমাণ করতে চাইবে তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে স্থায়ী শক্তি। সব মিলিয়ে ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচ হতে পারে বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই, যেখানে ইতিহাসের ভার ও নতুন যুগের আত্মবিশ্বাস-দুইয়ের সংঘর্ষ দেখা যাবে।
