মুক্তদেশ ডেস্ক: বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে তিন দিন আগে। ছোট দলগুলোর ম্যাচে সেই উত্তেজনা কতটা জমে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তাই সবার চোখ ছিল আজ ভোরে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। কারণ মাঠে মুখোমুখি হয়েছিল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে থাকা দুই দল—ব্রাজিল ও মরক্কো। অনেকের চোখে, গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে বড় ম্যাচও ছিল এটি।
তবে শেষ পর্যন্ত ১–১ গোলে ড্র হওয়ায় রাত জাগার পুরো প্রতিদান হয়তো দর্শকেরা পাননি। বিশেষ করে ব্রাজিল সমর্থকদের হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ব্যক্তিগত ঝলকে পাওয়া গোলটি ছাড়া প্রথমার্ধে ব্রাজিল ছিল অনেকটাই বিবর্ণ। বরং ২১ মিনিটে ইসমায়েল সাইবারির গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর জয়ের দাবিদার মনে হচ্ছিল মরক্কোকেই।
মরক্কোর ‘ফ্লুইড ফুটবল’ সামলাতে ব্রাজিলের মাঝমাঠ ছিল ছন্দহীন। কাসেমিরোকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। রক্ষণেও রজার ইবানিয়েজের দুর্বলতা চোখে পড়ে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তাই আনচেলত্তি কাসেমিরো ও ইবানিয়েজকে তুলে ফাবিনিও ও দানিলোকে মাঠে নামান। তাতে কিছুটা স্থিতি ফেরে ব্রাজিলের খেলায়।
গত কয়েক বছরে ফুটবলে নিজেদের অবস্থান বদলে দেওয়া ‘আটলাসের সিংহ’ মরক্কোও অবশ্য ব্রাজিলের অগোছালো মাঝমাঠের সুযোগ নিতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধে বরং ব্রাজিল কিছুটা উন্নতি করে। তবে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচের যোগ করা সময়ে (৯৯ মিনিট) নিল এল আয়নাউয়ির দুরপাল্লার শট আলিসন ঠেকাতে না পারলে ব্রাজিলকে হার নিয়েই মাঠ ছাড়তে হতে পারত।
মরক্কোর শক্তির জায়গা ছিল মাঝমাঠ। সেখানে ব্রাজিলের উপস্থিতি ছিল অনেকটাই ফিকে। সেই পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত দক্ষতায় দলকে জাগানোর চেষ্টা করেন ভিনিসিয়ুস—যেন প্রয়োজনের মুহূর্তে হাজির হলেন দলের ত্রাতা হয়ে।
ভিনির সেই জেগে ওঠার পেছনে ছিল মরক্কোর প্রথম গোল। লুকাস পাকেতার ভুলে বল হারায় ব্রাজিল। ব্রাহিম দিয়াজের নিখুঁত থ্রু পাস ধরে দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে ঢুকে আলিসনের মাথার ওপর দিয়ে চিপ শটে গোল করেন সাইবারি। দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের বিপক্ষে বিশ্বকাপে এটাই মরক্কোর প্রথম গোল।
গোল খাওয়ার পর ব্রাজিল ঘুরে দাঁড়ানোর বদলে আরও অগোছালো হয়ে পড়ে। মাঝমাঠে একের পর এক বল হারায় তারা। ফলে ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটেই ১২টি শট নিতে পারে মরক্কো।
এরপরই ভিনিসিয়ুসের জাদু। ৩২ মিনিটে ব্রুনো গিমারেসের পাস পেয়ে বাঁ প্রান্ত থেকে বক্সে ঢোকেন তিনি। নিজের পরিচিত কাট–ইন মুভে এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডান পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জালে জড়ান। দৃশ্যটা মনে করিয়ে দেয় রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে তাঁর অসংখ্য গোলের মুহূর্ত—আর ডাগআউটে সেই পরিচিত আনচেলত্তি।
ব্রাজিলের জার্সিতে নিজের ৫০তম ম্যাচে ভিনিসিয়ুস দলকে হার থেকে বাঁচালেন। জাতীয় দলের প্রয়োজনে তাঁকে সবসময় পাওয়া যায় না—এমন সমালোচনার জবাবও যেন দিলেন তিনি।
তবে আনচেলত্তির দুশ্চিন্তা থাকবে রাফিনিয়াকে নিয়ে। প্রথমার্ধে তাঁকে প্রায় খুঁজেই পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কোর পোস্ট লক্ষ্য করে একটি শট নিতে পেরেছেন মাত্র।
চিন্তার আরেক জায়গা লুকাস পাকেতা। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে তাঁর দুর্দান্ত অ্যাক্রোবেটিক শটটি গোল হতে পারত, কিন্তু মরক্কোর গোলকিপার ইয়াসিন বুনু অসাধারণভাবে ঠেকান। ওই মুহূর্ত ছাড়া পাকেতাকে খুব একটা কার্যকর মনে হয়নি। তিনি দৌড়েছেন, পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু ব্রাজিলের সৃজনশীল মাঝমাঠ তৈরি করতে পারেননি।
মরক্কোর বিপক্ষে এই ড্র ব্রাজিলকে হার থেকে বাঁচিয়েছে ঠিকই, তবে আনচেলত্তির সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে—বিশ্বকাপ জিততে হলে ভিনিসিয়ুসের ঝলকের পাশাপাশি মাঝমাঠকেও আরও শক্তিশালী হতে হবে।
