মুক্তদেশ ডেস্ক: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিকে স্তম্ভিত করে দিলেও দেশটিতে ক্ষমতার বড় ধরনের পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এই যুদ্ধের শুরুতে লড়াইয়ের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের হাতেই ছিল—এ বিষয়ে খুব কম মানুষেরই সন্দেহ ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মহসেন রেজায়ি গত রোববার বলেছেন, “যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে ইরান।” তিনি পারস্য উপসাগর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার এবং হামলায় সৃষ্ট সব ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণও দাবি করেন। তিন সপ্তাহ আগেও তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কণ্ঠে এমন আত্মবিশ্বাস কল্পনা করা কঠিন ছিল।
ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূচনা হয়। এরপর মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের হাজারো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে তাদের সামরিক শক্তির প্রমাণ দেয়। এ সময় তাদের একমাত্র উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ছিল নিজেদের বাহিনীর ভুলে সংঘটিত কিছু ঘটনা।
তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের অজান্তেই এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, যা তাদের পরিকল্পনার চেয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। যদিও এর বেশিরভাগই ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করেছে। এখন পর্যন্ত এসব হামলায় ইসরায়েলে ১২ জন নিহত হয়েছেন, যা গত বছরের স্বল্পস্থায়ী সংঘাতের তুলনায় কম।
উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন পর্যন্ত রক্ষা করা গেছে। তবে তাদের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছে।
নিয়ন্ত্রণ ফসকানোর নেপথ্যে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রতিদিন ইরানে হামলা চালিয়ে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখলেও যুদ্ধের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়সীমা দিলেও সম্প্রতি বলেছেন, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করেই এই যুদ্ধের অবসান ঘটানো হবে।
তবে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন এসেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এতে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়েছে ওয়াশিংটন।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক পিটার নিউম্যান বলেন,
“হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। আমার মনে হয়, এখন যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ইরানের হাতে।”
ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে আন্তর্জাতিক জোট গঠনের আহ্বান জানালেও এখনো কোনো দেশ সাড়া দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, শত শত তেলবাহী ট্যাংকারকে নিরাপত্তা দেওয়া বিশাল সামরিক সম্পদের বিষয় এবং তবুও সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। কারণ, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা বিস্ফোরকবোঝাই ছোট নৌকাও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।
সব মিলিয়ে ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তেহরানের হাতেই রয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আশা করেছিল, তার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।
নিউম্যান আরও বলেন, “ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেনি। সেখানে শাসনব্যবস্থা দুর্বল মনে হলেও এখনো স্থিতিশীল।”
এদিকে লেবানন ফ্রন্টেও হিজবুল্লাহ প্রত্যাশার তুলনায় বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় সেখানে ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় আট লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেও সংগঠনটির আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বিপুল সামরিক শক্তির মুখে হিজবুল্লাহর প্রধান লক্ষ্য এখন টিকে থাকা।
