মুক্তদেশ ডেস্ক: দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা শেষে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম চালুর পথে বড় অগ্রগতি হয়েছে। নতুন বদলি নীতিমালা অনুযায়ী অনলাইনভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষক বদলি কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নীতিমালায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থলকে একই এলাকায় রাখার বিষয়টি। এজন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মস্থলের তথ্য যাচাই করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাস ডাবল প্লাস সিস্টেমের সঙ্গে এপিআই সংযোগ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সম্প্রতি এক চিঠিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (স্কুল ও কলেজ) কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলি নীতিমালা-২০২৬ জারি করা হয়েছে।’
এ নীতিমালার আলোকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর টেলিটকের কারিগরি সহায়তায় অনলাইনে বদলি কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
নীতিমালার অনুচ্ছেদ ৩-এর উপানুচ্ছেদ ৩.৮ (গ) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থল- যদি তা সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে হয়- তাহলে বদলির ক্ষেত্রে তা অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এ অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্তমান কর্মস্থলের তথ্য যাচাই করা হবে। এ তথ্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাস ডাবল প্লাস ডেটাবেজে সংরক্ষিত রয়েছে। শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরের মাধ্যমে একজন সরকারি চাকরিজীবীর নাম, পদবি ও কর্মস্থল যাচাই করা সম্ভব। এ কারণে মাউশিকে আইবাস ডাবল প্লাসের সঙ্গে এপিআই সংযোগ স্থাপন করে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বদলিপ্রত্যাশী অনেক শিক্ষক এ উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মনে করলেও নীতিমালার কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এক শিক্ষক তৈয়মুর রশিদ বলেন, ‘বদলিব্যবস্থা চালু হওয়া আমাদের জন্য স্বস্তির খবর। তবে যদি শুধু একই অধিদপ্তরের মধ্যে বদলি সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে অনেক শিক্ষক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।’
শিক্ষকদের দাবি, তারা একই প্রশ্নপত্র, একই পরীক্ষাপদ্ধতি এবং একই মেধাতালিকার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। তাই স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃঅধিদপ্তর বদলির সুযোগ থাকা উচিত।
কারিগরি শিক্ষক পরিষদের নেতারা জানিয়েছেন, দেশে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে কারিগরি থেকে শুধু কারিগরিতে বদলির নিয়ম থাকলে অনেক শিক্ষক কখনোই বদলির সুযোগ পাবেন না।
একটি বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মো. মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘কারিগরি প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদ কম। ফলে একই অধিদপ্তরের মধ্যে বদলি সীমাবদ্ধ থাকলে আমাদের অনেকেই সারাজীবন এক জায়গায় আটকে থাকতে পারেন।’
এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদরা মনে করেন, বদলি প্রক্রিয়া চালু হওয়া শিক্ষকদের মানসিক চাপ কমাবে এবং কর্মদক্ষতা বাড়াবে। শিক্ষাবিদ ড. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘একজন শিক্ষক যদি দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকেন, তাহলে তার পেশাগত মনোযোগ কমে যেতে পারে। তাই বদলিব্যবস্থাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।’
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা মনে করছেন, সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা হলে বদলিব্যবস্থা শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রাজধানীর একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় বদলি হলে শিক্ষকরা ন্যায্য সুযোগ পাবেন। তবে একইসঙ্গে শূন্যপদ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে হবে, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষক সংকটে না পড়ে।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষক বদলি কার্যক্রমকে স্বচ্ছ, দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, ডিজিটাল সফটওয়্যার ও আইবাস ডাবল প্লাসের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হলে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং বদলি প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থল অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক শিক্ষকের জন্য স্বস্তি বয়ে আনলেও আন্তঃঅধিদপ্তর বদলির সুযোগ না থাকলে বৈষম্যের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তাই বাস্তব অভিজ্ঞতা ও শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নীতিমালাটি আরও পরিমার্জনের দাবি উঠছে।
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সুপারিশে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের জন্য আন্তঃঅধিদপ্তর বদলিব্যবস্থা চালুর দাবিতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা। গতকাল কারিগরি শিক্ষক পরিষদের পক্ষ থেকে এ স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। শিক্ষকদের দাবি, বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত বদলি কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রস্তাবিত নীতিমালায় কেবল সমঅধিদপ্তরের মধ্যে বদলির সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষক বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বৈষম্যের শিকার হতে পারেন বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
