মুক্তদেশ ডেস্ক: নির্বাচনী ডামাডোল বাজার আগ থেকে ঢাকা-১৭ আসনের অলিগলি চষে বেড়ান জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী স ম ডা. খালিদুজ্জামান। যদিও শুরুতে বিএনপি জোট থেকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ এখানে প্রার্থী ছিলেন। তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পেয়ে অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন জামায়াত প্রার্থী। দাঁড়িপাল্লার বিজয় নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন তার নেতাকর্মীরাও। কিন্তু দৃশ্যপটে তারেক রহমানের আগমনের পর ধানের শীষের হেভিয়েট প্রার্থীতে খেই হারায় দাঁড়িপাল্লা। গত ২৩ জানুয়ারি ভাসানটেকের বিআরপি মাঠে নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমান অংশ নেওয়ার পর থেকে পাল্টে যায় ভোটের হিসাব-নিকাশ। এখন তারেক রহমান ঘিরেই ধানের শীষের জোয়ার উঠেছে। সর্বত্র এগিয়ে তারেক রহমান। তবে প্রচারে এগিয়ে আছেন জামায়াতের প্রার্থী।
গতকাল সোমবার গুলশান, বনানী ও মানিকদি নামাপাড়া, কড়াইবস্তি ও ভাসানটেক সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা দল বেঁধে ঢাকা-১৭ আসনে প্রচার চালাচ্ছেন। ভোট চেয়ে বিতরণ করছেন লিফলেট। দলের চেয়ারম্যানের নির্বাচনী আসন, তাই যেন দিন-রাত প্রচারে নেতাকর্মীদের ক্লান্তি ছুটি নিয়েছে। নেতাকর্মীরা ভোটারদের কাছে ভোটার সিøপ পৌঁছে দেওয়াসহ ওয়ার্ডভিত্তিক নানা উদ্যোগে কাজ করে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর সর্বসাধারণের ভাষ্য, যেখানে অন্য প্রার্থী বিজয়ী হলে এমপি কিংবা মন্ত্রী হবেন আর বিএনপি চেয়ারম্যান বিজয়ী হলেই হতে পারেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তারেক রহমান ও ধানের শীষের বিকল্প ভাবনাটাই অবান্তর।
মানিকদি নামাপাড়ার বাসিন্দা হিমেল মিয়া আমাদের সময়কে বলেন, ‘আগে ভোট দেওয়ার বিষয়ে ভাবতে হতো, এবার ভাবছি না। তারেক রহমানকে ভোট দেওয়াটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। উনি একমাত্র নেতা, যিনি আগামী দিনে বাংলাদেশ পরিচালনায় অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারবেন।’
ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি ও জামায়াতসহ ১১ জন প্রার্থী ভোটে লড়ছেন। তবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ছাড়া অন্য প্রার্থীদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষজনের মধ্যে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা নেই। তাই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে তেমন কিছু চায় না তারা।
গুলশান কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী হেলিম উদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, ‘কোথায় তারেক রহমান আর কোথায় অন্য প্রার্থী। এটা যারা বুঝে না তাদের সংখ্যাটা কম।’
শুধু ভোটে জেতার পর একটু খোঁজখবর নিলেই খুশি শাসুন্নাহার। কড়াইল বস্তির বাসিন্দা পোশাক কারখানায় কাজ করেন পরিচয় দিয়ে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘আগে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা অনেক কথা দিলেও শেষে রাখেননি। এজন্য এবার ধানের শীষ ও তারেক রহমানকে ভোট দিমু।’
এদিকে গতকাল বিকালে বনানী-কাকলী ইউইএ মৈত্রী মার্কেটের সামনে ঢাকা-১৭ দলীয় প্রার্থী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে গণসংযোগ করেন দলের চেয়ারম্যান উপদেষ্টা কাউন্সিল সদস্য ও ঢাকা-১৭ নির্বাচন পরিচালনা কমিটি প্রধান সমন্নয়ক আবদুস সালাম ও যুগ্ম সমন্বয়ক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। লিফলেট বিতরণ শেষে বিশাল মিছিলে শোডাউন করেন তারা।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান জানান, ধানের শীষ ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী জোয়ার দেখে তার নির্দেশে নির্বাচন উইথড্রো করে বিএনপির পক্ষে কাজ করতে চান চেয়ারম্যান বাড়ির ছেলে কাজী এনায়েত উল্লাহ, তাদের নিজস্ব পারিবারিক ভোট আছে ১০ হাজার। মোরগ মার্কার চেয়ারম্যান এনায়েত উল্লাহ একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি। তার ভাষ্য, তারেক রহমান ধানের শীষের জন্য কাজ করতে নির্দেশ দিলেই নির্বাচন কাজে নামবেন তিনি।
রাজধানীর গুলশান, বনানী ও বারিধারাÑ বিশ্বের বহু দেশের দূতাবাস অবস্থিত ঢাকা-১৭ আসনে। এ কারণে এখানে রয়েছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বেশ শান্ত পরিবেশ। ফলে এলাকাটি পরিণত হয়েছে প্রভাবশালী রাজনীতিক, বিত্তশালী ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য শ্রেণির পছন্দের ঠিকানায়। ঠিক এর পাশেই মহাখালী, ভাসানটেকের বিশাল এলাকাজুড়ে বিভিন্ন বস্তিতে রয়েছে বহু স্বল্প আয়ের মানুষের বসবাস। কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক বস্তি এ আসনের অংশ। এজন্য ভোট এলে এসব বস্তির বাসিন্দারা হয়ে ওঠেন গুরুত্বপূর্ণ। অভিজাত আর সাধারণ শ্রেণির ভোট সমানভাবে যে টানতে পারবে, সে-ই হাসবে বিজয়ের হাসি।
গুলশান ও বনানীর বেশ কয়েকটি বাড়ির কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অ্যাপার্টমেন্ট-ভিত্তিক বাসাবাড়িতে খুব একটা ভোট চাইতে যান না বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা শুধুুু মেইন রাস্তা ও অলিগলিতে প্রচার চালাতে দেখছেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর স্বল্পসংখ্যক নারী নেতাকর্মী অনুমতি নিয়ে বাসা-বাড়ি অ্যাপার্টমেন্টে ভোট চাইতে আসেন।
গুলশান-২ মোড়ে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ক্যাম্প কার্যালয়ে কথা হয় গুলশান ২ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াত নেতা তানভীরুল ইসলামের সঙ্গে। আমাদের সময়কে তিনি জানান, আমরা ঘরে ঘরে ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি। যেখানে অনুমতি পাচ্ছি যাচ্ছি আর সেখানে অনুমতি পাচ্ছি না সেখানে সিনিয়র নেতারা যোগাযোগ রাখছেন। আশা করছি, ফলাফল দাঁড়িপাল্লার পক্ষেই আসবে।
এদিকে গতকাল দুপুরে ঢাকা-১৭ নির্বাচনী আসনের কড়াইল আনসার ক্যাম্পে হৃদরোগ প্রতিরোধ মেডিক্যাল ক্যাম্প উদ্বোধন করেছেন তারেক রহমানের সহধর্মিণী বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা জুবাইদা রহমান। এ ছাড়া বনানীর ডিওএইচএস খেলার মাঠে বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কন্টেন্ট জেনারেশন টিম আয়োজিত ‘চায়ের আড্ডা’ তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের একটি ইন্টারেক্টিভ যুব সম্পৃক্ততা অনুষ্ঠানে তরুণ ভোটার ও জাতীয় রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের মধ্যে একটি অর্থবহ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
গত শনি ও রবিবার তারেক রহমানের পক্ষে লিফলেট বিতরণ ও ভোট চেয়েছেন প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী শামিলা রহমান সিঁথি। এ ছাড়া দুই-একদিনের মধ্যে জাইমা রহমানকে নির্বাচনী প্রচারে সরাসরি বাবা তারেক রহমানের পক্ষে ভোট চাইতে দেখা যেতে পারে বলে বিএনপির মিডিয়া সেল সূত্রে জানা গেছে।
জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক মোহাম্মদ আবদুস সালাম আমাদের সময়কে বলেন, তারেক রহমান বিপুল ভোটে জিতবেন বলে শতভাগ আশাবাদী। দেশের সর্বস্তরের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তারেক রহমান।
তবে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা আশা করছেন, তাদের প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামানই এ আসনে বিজয়ী হবেন। তারা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে জামায়াতের ভোট অনেক বেড়েছে। ভোটাররা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে উন্মুখ হয়েছে আছেন।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, ঢাকা-১৭কে ‘সবার ঢাকা-১৭’ হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্যে ধানের শীষের প্রার্থী তারেক রহমানের পক্ষে একটি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে ঢাকা-১৭ হোক সবার জনপদ।
প্রসঙ্গত, আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭০৯ জন। মহিলা ভোটার ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬০ জন। তৃতীয় লিঙ্গ ভোটার ৮ জন। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১১ জন।
