মুক্তদেশ ডেস্ক: রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে গৃহিণী লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজকে (১৫) হত্যায় তাদের শরীরে মোট ৩৬টি আঘাত করা হয়েছে। প্রশিক্ষিত খুনি আঙুলের ছাপ লুকাতে হাতে গ্লাভস পরে মা-মেয়ের শরীরে চাকু দিয়ে আঘাত করে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করে। হত্যাকাণ্ডের পর স্বর্ণালংকার, টাকা, মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ লুটপাট করে পালিয়ে যায় সে। এ ঘটনায় নিহত লায়লার স্বামী আ জ ম আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। তবে হত্যার দুদিন পার হলেও মামলার একমাত্র আসামি গৃহকর্মী কথিত আয়েশাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
গত সোমবার মোহাম্মদপুরের একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে লায়লা আফরোজ ও তার মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজকে হত্যা করা হয়। নাফিসা মোহাম্মদপুরের প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার বাবা আজিজুল ইসলাম রাজধানীর উত্তরার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান বলেন, হত্যার ঘটনায় নৃশংসতা দেখে ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতক একজন প্রশিক্ষিত কিলার। প্রশিক্ষিত না হলে এভাবে হত্যা করতে পারে না। এ ছাড়াও হত্যার ঘটনার পর ঘাতক বাথরুমে প্রবেশ করে ফ্রেশ হয়ে মেয়ের স্কুল ড্রেস পরে বাসা থেকে বের
হয়ে যায়। আশা করছি আমরা নেপথ্যের কারণ বের করে আসামিকে খুব দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পারব।
হত্যার শিকার মা-মেয়ে দুজনের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহত আফরোজার শরীরজুড়ে ৩০টি জখমের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া তার মেয়ে নাফিসার গলা ও বুকে ছয়টি গভীর আঘাতের ক্ষত রয়েছে। আফরোজার বাম গালে ৩টি, থুঁতনিতে ৪টি, গলার নিচে বাম পাশে ৫টি, বাম হাতে ৩টা, বাম হাতের কব্জিতে ১টি, ডান হাতের কব্জিতে ২টি, বুকের বাম পাশে ৯টি, পেটের বাম পাশে ২টা ও তলপেটের নিচে একটি গভীর জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ?অপরদিকে মেয়ে নাফিসার বুকের দুই পাশে ও গলায় ৬টি গভীর ক্ষতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধারালো ছুরিকাঘাতের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের ধারণা, আঙুলের ছাপ আড়াল করতে হাতে গ্লাভস পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মা-মেয়েকে আঘাত করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় সোমবার রাতেই মামলা করেন আ জ ম আজিজুল ইসলাম। মামলায় বাদী আজিজুল ইসলাম লিখেছেন, তিনি পেশায় একজন শিক্ষক। মোহাম্মদপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন। চার দিন আগে উল্লিখিত আসামি তার বাসায় খণ্ডকালীন গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সোমবার সকাল ৭টার দিকে তিনি কর্মস্থল উত্তরায় চলে যান। কর্মস্থলে থাকাকালে তিনি তার স্ত্রীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে তিনি বেলা ১১টার দিকে বাসায় আসেন। এসে দেখতে পান তার স্ত্রীর গলাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা। স্ত্রী রক্তাক্ত-জখম হয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। আর মেয়ের গলার নিচে ডান পাশে কাটা। মেয়ে গুরুতর অবস্থায় বাসার প্রধান ফটকে পড়ে আছে। মেয়ের এই অবস্থা দেখে তিনি দ্রুত তাকে ভবনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী আশিকের মাধ্যমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
মামলায় আজিজুল আরও লিখেছেন, তিনি বাসার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করেন। এতে তিনি দেখতে পান, আসামি সকাল ৭টা ৫১ মিনিটের সময় কাজ করার জন্য বাসায় আসে। সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটের সময় আসামি নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে বাসা থেকে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় একটি মোবাইল, একটি ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থসহ অন্য মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যায়।
আজিজুল ইসলাম জানান, ভবনের তত্ত্বাবধায়ক ও নিরাপত্তাকর্মীদের মাধ্যমে চার দিন আগে ওই গৃহকর্মীকে কাজে নেন। গৃহকর্মীর পরিচয় ও ফোন নম্বর চেয়েছিলাম। কিন্তু সে বলেছিল, আগুনে পুড়ে তার মা-বাবা মারা গেছে। সেও আগুনে দগ্ধ হয়েছিল। এসব বলে পরিচয় ও ফোন নম্বর দেয়নি।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন বলেন, আয়েশা নামে পরিচয় দেওয়া ওই তরুণীর প্রকৃত পরিচয় মেলেনি এখনও। পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে তার পরিচয় নিশ্চিত করে আসামিকে গ্রেপ্তারের।
মোহাম্মদপুর জোনের পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অভিযুক্তের কাছে কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। আশপাশের বেশিরভাগ সিসিটিভি অচল। তার প্রকৃত নাম, ঠিকানা ও কোনো ধরনের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট না থাকায় তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে বেগ পেতে হচ্ছে।
এদিকে, ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসায় মা-মেয়ে হত্যা মামলায় গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে আগামী ১৩ জানুয়ারির মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে মামলার এজাহার আসে। আদালত মামলার এজাহার গ্রহণ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান।
মা-মেয়ের দাফন সম্পন্ন
রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরে ছুরিকাঘাতে নিহত মা লায়লা আফরোজ ও তাঁর মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজের জানাজা শেষে নাটোরে তাঁদের লাশের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বাদ জোহর নাটোর শহরের গাড়িখানা কবরস্থানে মা-মেয়ের দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে নাটোর নবাব সিরাজ-উদ দৌলা সরকারি কলেজ মাঠে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন ভোরে নাটোর শহরের বড়গাছা এলাকায় নিজ বাড়িতে পৌঁছায় মা-মেয়ের মরদেহ। এ সময় লাশ দেখতে আত্মীয়স্বজন ও এলাকার লোকজন ভিড় জমান। এ ঘটনায় পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে।
