এম. হাসান
শীতকাল অনেকের কাছেই আনন্দের, আবার অনেকের কাছেই কষ্টের। ঠান্ডা বাতাস, কুয়াশা, ছোট দিন আর দীর্ঘ রাতÑসব মিলিয়ে শরীর ও মনে আলাদা একটা প্রভাব পড়ে। এই সময়ে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, সর্দি-কাশির প্রকোপ বাড়ে, আর মনেও এক ধরনের ক্লান্তি বা বিষণ্নতা ভর করতে পারে। তবে একটু সচেতন হলে এবং কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুললে শীতকালকে আরামদায়ক ও সুন্দর করে কাটানো সম্ভব। শরীরের যত্ন নেওয়া, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, উষ্ণ থাকা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার মাধ্যমেই আমরা শীতের দিনগুলোকে সুস্থ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে পারি। হিম শীতল তাপমাত্রা ত্বকের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, জয়েন্টে ব্যথা সৃষ্টি করে, আর এর সঙ্গে কম সূর্যের আলোÑসব মিলিয়ে মনকেও বেশ নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। না, আমরা অনেকে এখনো পুরোপুরি শীতকে ভালোবাসতে শিখিনি। কিন্তু কীভাবে টিকে থাকতে হয়, তা আমাদের শিখেতে হবে। আপনিও পারবেন। চলুন জেনে নিই কীভাবে:
১. তেল ব্যবহার করুন:
ঠান্ডা, হিমাঙ্কের মতো বাতাসের ঝাপটা মুখে লাগলে শরীরের সব আর্দ্রতা যেন নিমেষেই শুকিয়ে যায়। আমার মুখে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েÑএকই সঙ্গে আমার জয়েন্টেও। তাই ত্বক ও শরীরের যত্ন নেওয়ার রুটিনটা আলাদা একটা অভ্যাসের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
দুটি তেল আছে, যেগুলো খুবই দরকার মুখের জন্য এবং অন্যটি শরীরের জন্য। একটি হলো মুখের জন্য ফেসিয়াল অয়েল, আর অন্যটি পেশি ও জয়েন্টের জন্য ব্যবহার করুন। ময়েশ্চারাইজারের ওপর ফেস অয়েল লাগাবেন , যাতে এটি ত্বককে শুধু প্রাণবন্তই করে না, বরং বাইরের পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুখকে সুরক্ষা দেয়। অন্য তেলটি একটু গরম করে সন্ধ্যায় ব্যবহার করুন। তারপর কম্বলের নিচে আরাম করে শুয়ে পড়ুন এবং সারা রাত সেটিকে ত্বকে শুষে নিতে দিন।
২. একটু আগেই ঘুমাতে যান:
শীতকালে অনেক প্রাণী হাইবারনেশনে (নিদ্রায়) চলে যায়Ñআর যদিও আপনাকে তাদের মতো গুটিয়ে বসে থাকতে হবে না, তবু এই সময়টায় অন্য মাসগুলোর তুলনায় একটু আগেভাগে ঘুমানোর রুটিন শুরু করলে ভালো লাগবে এবং এটি স্বাভাবিকও মনে হবে। দেখুন, সূর্য অস্ত যাওয়ার পর নিজের শক্তি ধরে রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে যায়। এর পেছনে আরও কিছু জৈবিক কারণ রয়েছে।
৩. সূর্য ডুবে গেলে নিজেকে খুব বেশি চাপ দেবেন না। :
সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সত্যিই মনোবল জোগানো কঠিন হয়ে যায়। তাই তেমনটা করার দরকার নেই। বরং এই সময়টাকে কাজে লাগানÑকিছুক্ষণ বই পড়ার সময় নির্ধারণ করুন, আগুনের পাশে (বা উষ্ণ জায়গায়) গা-ঢাকা দিয়ে বসুন, ডায়েরি লিখুন, গোসল করুন এবং শরীরে তেল ব্যবহার করুন। এটা সত্যিই ঘুমের জন্য আদর্শ আবহাওয়া, তাই উপভোগ করুন। তবে একই সঙ্গে চেষ্টা করুন আপনার সকালে ওঠার সময়টা যেন বদলে না যায়। এই সময়টা নিয়মিত রাখুন। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত ঘুম আপনাকে আরও বেশি ক্লান্ত অনুভব করাতে পারে।
৪. লাইট বক্স ব্যবহার করুন:
মেলাটোনিন হলো একটি হরমোন, যা মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। এটি মূলত আমাদের ঘুম-জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। আলো মেলাটোনিনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়Ñএ কারণেই গ্রীষ্মকালে অনেক সময় ঘুমানো কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু দিন ছোট হতে থাকলে আমরা বেশি মেলাটোনিন তৈরি করিÑকখনো কখনো অত্যধিক পরিমাণে। আর এজন্যই আপনি বেশি ঘুমঘুম অনুভব করেন। কারও কারও ক্ষেত্রে মন খারাপ বা হালকা বিষণ্নতাও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আপনি যদি পৃথিবীর এমন জায়গায় থাকেন, যেখানে ঋতু পরিবর্তনের কারণে দিনের আলোর সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়Ñ যেমন আলাস্কা বা মন্টানা। ডাক্তাররা আমাদের একটি লাইট বক্স ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রথমে সন্দেহ হতে পরে। এগুলো কি সত্যিই কাজ করে?Ñযা আসলে একটু বোকা প্রশ্ন, কারণএগুলো সত্যিকার অর্থেই ভালো। সকালে ৩০ মিনিট এবং বিকেলে ৩০ মিনিট করে এই লাইট ব্যবহার করতে পারেন। আপনি চাইলে ঘরের সাধারণ বাল্বের বদলে এমন আলোর বাল্ব ব্যবহার করতে পারেন এবং দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন।
৫. যথেষ্ট ভিটামিন-ডি গ্রহণ করুন:
সূর্যালোকের ওপর নির্ভর করেÑবা সূর্যালোকের অভাবেÑআমাদের দেহে ভিটামিন-ডি-এর মাত্রা প্রভাবিত হয়। বিশ্বাসযোগ্য ভালো কোম্পানির দৈনিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন। তবে শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ থকবেন নাÑ নিয়মিত ডাক্তার দিয়ে আপনার ভিটামিন ডি-এর মাত্রা পরীক্ষা করান। সব ডাক্তার এই পরীক্ষা করেন না, তবে আপনি চাইলে আপনার বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় রক্ত পরীক্ষা করতে বলতে পারেন। এটি একটি রুটিন পরীক্ষা এবং সাধারণত বীমার আওতায় পড়ে। শুধু সূর্যালোক ও সাপ্লিমেন্টই একমাত্র উপায় নয়। কিছু খাবারও রয়েছে, যেগুলো ভিটামিন–ডি ধরে রাখতে সাহায্য করে। যেমনÑডিম, স্যামন মাছ ও সার্ডিন মাছ। এগুলোতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমাদের এটা বুঝতে হবেÑআমাদের শরীর যেমন বদলায়, ঋতুও যেমন বদলায়, তেমনি আমাদের নিজেদের যত্ন নেওয়ার পদ্ধতিও ভিতরে ও বাইরে থেকে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে বদলানো উচিত।
৬. আরামদায়ক খাবার প্রস্তুত করুন:
খাবারের কথাই যখন উঠল, তখন এমন খাবার খান যেগুলো শরীরকে বেশি পুষ্টি ও আরাম দেয়। গরম ও নরম খাবার বেছে নিন। যেমনÑওটমিল, ঘন স্যুপ, বিভিন্ন কারি এবং পাস্তা। পাশাপাশি শক্তিকর পুষ্টিসমৃদ্ধ রেসিপিগুলোও তৈরি করুন।
৭. শরীরে পর্যাপ্ত পানি রাখুন (হাইড্রেটেড থাকুন):
ঠান্ডা আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত পানি পান করা অনেক সময় ভুলে যাই। আমার জন্য সারা দিন উষ্ণ পানি চুমুক চুমুক করে পান করা সহজ, আর সম্ভব হলে কাচে পানির বোতল ব্যবহার করে। যেভাবেই হোক, নিয়মিত পানি পান করতে থাকুন। তবে শত ভাগ চেষ্টা করবেন প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহার না করতে। এটার পাশাপাশি একটি হিউমিডিফায়ার চালু রাখুন। শীতে একটু বেশি সময় ধরে এবং শক্তভাবে শরীরচর্চা বা অনুশীলন করার চেষ্টা করুন।
৮. দীর্ঘ অনুশীলনের সময় উপভোগ করুন:
কারণ সকালে এখনও অন্ধকার থাকে, গভীর, দীর্ঘ শ্বাস নেওয়া এবং আসনগুলোতে বেশি সময় কাটানো আপনার ভালো লাগবে। সত্যি বলতে, ব্যক্তিগতভাবে এই সময়েই সবচেয়ে শক্তিশালী অনুশীলনগুলো সবচেয়ে স্থিতিশীলভাবে হয়। এটা শরীরের প্রকৃত চাহিদা ও প্রয়োজন। শীতে আপনার যোগ অনুশীলনকে গভীর করার চেয়ে ভালো সময় আর নেই।
৯. নিজেকে সময় দিন চিন্তাভাবনার জন্য:
বছরের এই সময়টা সবচেয়ে বেশি পড়াশোনা এবং লেখালেখি করুন। বসন্ত এবং গ্রীষ্মের মতো যখন আপানি সবচেয়ে ব্যস্ত থাকবেন, শীতের সময়টা আপনাকে তুলনা মূলক অনেক আরাম করে বসে থাকতে ভালো লাগবে। বছর শুরুতে নিজের জন্য আপনি নিজেকে সবচেয়ে বড় উপহার দেবেন তা হলো ভালো মানে একটি একটি বার্ষিক ডায়েরি ও কলম। সাধারণ পরিকল্পনাপত্রের মতো নয়, এতে প্রচুর খালি জায়গা আছে যেখানে আপনি আপনার আইডিয়াগুলো লিখতে পারবেন, সঙ্গে তারিখ ও অ্যাপয়েন্টমেন্টও থাকতে পারে। আপনি “মানিফেস্টেশন” বা ইচ্ছার প্রকাশের প্র্যাকটিস শুরু করুনÑএতে আপনার উদ্দেশ্যগুলো লিখে রাখুন। পাঠ করা আরেকটি অভ্যাস, যা আপনি অন্য ঋতুতে যথেষ্ট করতে পারবেন। কিন্তু শীতের সময় আগুনের পাশে বসে, প্রিয় দোলনা চেয়ার-এ মুড়িয়ে থাকা এবং একটি ভালো বই পড়া নিখুঁত মনে হয়।
১০. স্তরবিন্যাসে পোশাক পরুন:
ঠান্ডা থাকার পর নিজেকে গরম করার চেয়ে খারাপ আর কিছু নেই। তাই, এমনকি ঘরের ভেতরেও আমি স্তরবিন্যাসে পোশাক পরুন।
যদি তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে, অপানি হালকা সুতি পোশাক পরুন; কিন্তু তাপমাত্রা দশকের দিকে নেমে গেলে, আপনি লং আন্ডারওয়্যার বের করুনÑউপরের ও নিচের অংশ দুটোই। টুপি পড়াও লাগে। আর এটা তো ঘরের ভেতরেই! বাইরে বেরোবার সময় কখনো ধরে নেবেন না যে আপনি যা পরেছেন তা যথেষ্ট। মনে রাখবেন, স্তর খুলে নেওয়া সবসময় সহজÑতুলনামূলকভাবে বরফের মতো ঠান্ডায় বসে থাকা বা আরও বেশি পরার ইচ্ছা করে কষ্ট ভোগ করার চেয়ে। কারণ পরের টিপসটা সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ… স্তরবিন্যাসে পোশাক পরুনÑএবং বাইরে বের হোন!
১১. বাইরে বেরোন! অবশ্যই, সক্রিয় থাকা এবং বাইরে বের হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ! এটাই পোষা প্রাণি পালন ও বাগান করা আনন্দের একটি অংশ। যদি তারা বাইরে যেতে না পারে এবং ব্যায়াম করতে না পারে, তারা আপনাকে পাগল করে দেবে। এমন কিছু নেই – একেবারেই কিছু নেই – যা তোমার মেজাজ বা রক্ত সঞ্চালনকে এমনভাবে উন্নত করবে যেমনটা প্রতিদিন বাইরে বের হয়ে কিছু সক্রিয় কার্যকলাপ করার মাধ্যমে হয়। শুধু দুপুরের একটি ছোট হাঁটাও যথেষ্ট হতে পারে আপনার মন ভালো করতে। আর যখন আপনার বেশি সময় থাকবে, একটি যান বাহন ভাড়া করো কোথাও ঘুরতে যান। হতে পারে সেটা খুব বেশি দূরে নয় এমন পরিচিত কিংবা অপরিচিত জায়গা , সুন্দর পিঠাঘর বা কফি শপ। যত ঠান্ডা থাকবে, বাইরে যেতে আপনার ইচ্ছা কম থাকবে। কিন্তু একবার বের হলে আপনি নিজেকে অনেক ভালো মনে করবেন। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো সম্ভবত নিজের জন্য সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর এবং মনোরম কাজগুলোর মধ্যে একটি।
