মুক্তদেশ ডেস্ক: জনগণের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সহযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দেশবাসী ও প্রবাসীদের অধিকারের জন্য যেভাবে লড়াই করে কারাবরণ করেছিলেন, আমরা কথা দিচ্ছি—জনগণের প্রতিটি অধিকার আদায়ের জন্য সমান লড়াই আমরা চালিয়ে যাচ্ছি এবং চালিয়ে যাব। যতদিন পর্যন্ত জনগণের অধিকার জনগণের হাতে ফিরে না যাবে, আমাদের লড়াই ততদিন চলবে, ইনশাআল্লাহ।’
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সদ্য কারামুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপির সাবেক এই এমপি জামায়াতে যোগ দেন।
জামায়াত আমির সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘আমাদের প্রিয় সহকর্মী প্রমাণ করেছেন যে, আমরা কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না; এটাই হবে আমাদের সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভয় পাই শুধু আল্লাহ তায়ালাকে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের পাহাড়সম ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও অদক্ষতা চাপা দেওয়ার জন্য এখন বিরোধীদলকে অপপ্রচারের লক্ষ্যস্থলে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু মনে রাখবেন, যে সাপ আপনারা নাচাচ্ছেন, ওই সাপই একদিন ছোবল দেবে। সাপ কিন্তু পালিয়ে যাবে, আপনাদের মরা লাশ পড়ে থাকবে।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা সংসদের ভেতরেও বলেছি—এই বসন্তের কোকিল যারা এসেছে ‘কুহু কুহু’ করতে, বসন্তকালের পর ওদের আর দেখা পাবেন না। আপনাদের যখন গ্রীষ্মকাল কিংবা বর্ষাকাল আসবে, তখন এদের আর খুঁজে পাবেন না। আপনাদের ফেলে রেখে ওরা পালিয়ে যাবে। আমরা সাবধান করে দিচ্ছি—বিরোধীদলের চরিত্রহনন বাদ দিয়ে আপনাদের ব্যর্থতার সমাধানের চেষ্টা করুন। যদি তা করেন, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর হয়, মানুষ আপনাদের সমর্থন করবে। আর যদি মনে করেন যে, অতীতের মতো স্বৈরাচারী কায়দায় প্রতিবাদী কণ্ঠকে দমিয়ে দেবেন, স্তব্ধ করে দেবেন, তাহলে আপনাদের দুঃসংবাদ দিচ্ছি—এটি বাংলাদেশে আর হবে না, ইনশাআল্লাহ। এই জনগণ আর ফ্যাসিবাদকে কখনো কবুল করে নেবে না, ফ্যাসিবাদের কাছে আর মাথা নত করবে না। সংবদ্ধ জনবল রুখে দাঁড়িয়েছে, রুখে দাঁড়াবে এবং দিন দিন এর গতি বৃদ্ধি পাবে, একটা জায়গায় গিয়ে তার পূর্ণ সমাধান হবে, ইনশাআল্লাহ।’
এক মাস তিন দিনের মাথায় মেজর আখতারুজ্জামানের মুক্তিতে শুকরিয়া আদায় করে জামায়াত আমির বলেন, তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অনিয়ম-দুর্নীতি ও ভোগান্তির কথা বলার কারণে জেলে গিয়েছিলেন। তিনি কারো গায়ে হাত দেননি, কিন্তু তাঁর ওপর মিথ্যা মামলা চাপানো হলো যে, তিনি সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন এবং সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত দিয়েছেন—যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা।
‘আমরা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কথা শুনে তখনই প্রতিবাদ করেছি। আমি তাঁকে আগাম জামিনের কথা বললে তিনি বলেছিলেন—‘আমি কোনো অন্যায় করিনি যে আত্মসমর্পণ করব। যদি কোনো মামলা দেয় আমাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে, কিন্তু আমি আত্মসমর্পণ করব না।’ আমি তাঁর মনোবল দেখে সত্যিই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললাম যে, আপনি শক্ত আছেন, শক্ত থাকেন; আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন, ইনশাআল্লাহ, ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘সেদিনের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে দুজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। যদি তাঁদের কোনো অপরাধই না থাকত, তাহলে দুজনকে বরখাস্ত করল কেন? ঠিক তিনি ট্রলি নিয়ে কথা বলেছিলেন যে, এখানে এসে ট্রলিকে লটারির মতো টানতে হয়। কেউ পায়, কেউ পায় না; টানাটানি করে এক ট্রলি তিন প্যাসেঞ্জার—এটা হবে কেন? ইতিমধ্যে দেখেছেন দুই দফায় তিন শত ট্রলি নতুন করে সংযুক্ত হয়েছে। তাহলে এটাও মেনে নিয়েছে যে দুর্বলতা ছিল।’
‘এরপরে ব্যাগ কাটা ও লাগেজ চুরি করা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। এখন দেখা গেল যে বডি ক্যামেরা ফিট করা হয়েছে; যারা যারা গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করবেন, তাঁদের সবার শরীরে এখন বডি ক্যামেরা আছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এখন ১৫-২০ মিনিটে লাগেজ পাওয়া যায়।’
তিনি মেজর আখতারুজ্জামানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আপনার প্রতিবাদ শতভাগ কাজে লেগেছে। এর ফল এখন যুগ যুগ ধরে শাহজালাল বিমানবন্দরে যারা ভোগান্তির শিকার ছিলেন, সেই সমস্ত যাত্রী ভোগ করছেন। এখন যেটুকু স্বস্তি ফিরে এসেছে, তা আল্লাহর মেহেরবানী এবং তাঁর প্রতিবাদের ফসল।’
তিনি বলেন, ‘একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে নেওয়া হয়েছে—এটা লজ্জার; রিমান্ডে নেওয়া আরেকটা লজ্জা। তারপরে ভিত্তিহীন এই মামলায় নিম্ন আদালতে তাঁর চোখ বেঁধে উঠানো হলো, মাথায় হেলমেট পরানো হলো, বুকে সেফটি জ্যাকেট পরানো হলো—সবগুলোই লজ্জা। এরপরে সেখানে জামিন দেওয়ার সাহস পায়নি, হাইকোর্ট পর্যন্ত যেতে হলো। আবার কাপুরুষের মতো চেম্বার জজে টেনে নেওয়া হলো—এ সবগুলোই লজ্জা। ঘাটে ঘাটে লজ্জা, মহালজ্জা! কিন্তু যাদের লজ্জা থাকার কথা, তাদের তো লজ্জা লাগে না। যার গায়ে কাপড় নেই, তাকে দেখে সম্ভ্রমশীল মানুষ লজ্জা পায়; কিন্তু যার গায়ে কাপড় নেই, তার কোনো লজ্জা নেই। সেই লজ্জা কবে আসবে? লজ্জা কি নির্বাসনে থাকবে? লজ্জা আসা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘মেজর আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার হওয়ার পর সারা দেশবাসী যেভাবে সহানুভূতি, সমর্থন ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, আমি তাঁর এবং আমাদের দলের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও মোবারকবাদ জানাচ্ছি। বিশেষ করে প্রবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমরা এবং দেশবাসী প্রবাসীদের সঙ্গে আছি। আমরা লড়ে যাব, সত্যের জয় হবে, ইনশাআল্লাহ।’
এ সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমি কেন জেলে গিয়েছি সেটি বড় কথা নয়। যদি আমরা অন্যায় প্রতিহত করি, জেলে আমরা যাব—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার এই জেলের মাধ্যমে এই বর্তমান সরকারের ভেতরের ছবি বেরিয়ে এসেছে, তাদের নগ্ন আক্রোশ ও প্রতিশোধের কথা বেরিয়ে এসেছে। এই সরকার বলেছিল আক্রোশের রাজনীতি করবে না; কিন্তু আমি বিমানবন্দরে প্রতিবাদ করেছি প্রবাসী ভাইদের জন্য। তাঁদের প্রতি যে দুর্ব্যবহার করা হয়, যে অব্যবস্থা করা হয়, তাঁরা যে ভোগান্তি-যন্ত্রণা ভোগ করেন—তার বিরুদ্ধে আমি প্রতিবাদ করেছি। সরকার সেজন্য আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এতে আপত্তি করার কিছু নেই। আমি জনগণের কথা বলেছি, প্রতিবাদ করেছি; তার জন্য আমার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। আমার প্রশ্ন হলো—ঘটনা ঘটল আগের দিন সকালে, আমার মালপত্র বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসল, তারপরে একটি মিথ্যা মামলা করা হলো ১ তারিখ দিবাগত রাতে। সেই মামলার নথি ২ তারিখে আদালতে পেশ করা হয়েছে, সেখান থেকে আদালত তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। আমার প্রশ্ন—কী কারণে ২ তারিখে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার সময় ডিবি আমার বাড়িতে গেল? ডিবির এখানে কী এখতিয়ার?’
তিনি বলেন, ‘আমি ভাগ্যবান, ডিবি যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে জামায়াত আমির আমাকে ফোন করে খবর নিয়েছিলেন। তিনি মামলার ব্যাপারে খবর নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন হাজির হয়ে যেতে। আমি বললাম—রোববার দেখা যাবে, হাজির হওয়ার কিছু নেই; ধরে নিয়ে গেলে নিয়ে যাবে। তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিলেন ও সাধুবাদ জানালেন। এক ঘণ্টার মধ্যে ডিবি আমার বাড়িতে উপস্থিত হলে আমি ডিবিকে চ্যালেঞ্জ করলাম—‘আমরা তো ভাই পানিতে ভেসে আসিনি, ডিবি-পুলিশ-মিলিটারি আমাদের ঠেকানোর বয়স চলে গেছে। একাত্তরে পাকিস্তানের মিলিটারি আমাদের ঠেকাতে পারেনি, আর তোমরা কী ঠেকাবে? এই বয়সে মৃত্যু ছাড়া আর তো কিছু কাম্য নয়’।’
মেজর আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমি যখন ডিবিকে চ্যালেঞ্জ করলাম, তারা যদি বৈধভাবে আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারত, তবে দুই ঘণ্টা সময় নিত না। তারা আমার বাসায় বসে থাকল এবং আমার ঘরে ঢুকে দেখে অফিসে খালেদা জিয়ার ছবি টাঙানো আছে। সেটি দেখে তারা থতমতো খেয়ে প্রশ্ন করল—‘আপনি দল ছাড়লেন কেন?’ আমি বললাম—‘এটা কি গ্রেপ্তারের কোনো কারণ?’ এরপর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি এসে বলল—‘ডিবি অফিসে যেতে হবে।’ আমি বললাম—‘গ্রেপ্তার করতে হলে ওয়ারেন্ট দেখান।’ তারা বেশ গরম দেখানোর চেষ্টা করলে আমি তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দিলাম—আমার সামনে গরম দেখানোর মতো বাংলাদেশে এখনো কেউ জন্মগ্রহণ করেনি।
আমি অনেক বড় বড় প্রধানমন্ত্রীর সামনে গরম দেখিয়েছি, রাষ্ট্রপ্রধানদের সামনে গরম দেখিয়েছি। আল্লাহর রহমতে আমার সামনে বড় গলায় কথা বলার ক্ষমতা একমাত্র আমার জামায়াত আমির ছাড়া আর কারও নেই। এরপর তারা মাগরিবের আজানের পর আমাকে গাড়িতে তুলে ডিবি অফিসে এবং সেখান থেকে বিমানবন্দর থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু আমার প্রশ্ন—আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হলো কেন? রিমান্ডে নিয়ে চোখ বেঁধে জামায়াত সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন করার ন্যাক্কারজনক সাহস ডিবির হলো কীভাবে? একটি রাজনৈতিক দলের ভেতরের খবর জানার অধিকার পুলিশকে কে দিয়েছে? আমি বিনীতভাবে আমার আমিরের কাছে এই প্রশ্ন রাখলাম। আমরা প্রবাসীদের অধিকার আদায়ের যাত্রা শুরু করেছি। জামায়াত আমির আমাকে এ ব্যাপারে কথা বলার অনুমতি দিয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তরে আমরা প্রবাসী ভাইদের জন্য রিসেপশন সেন্টার করার চিন্তা করছি। আমি জামায়াতে ইসলামীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। দেশবাসী যারা আমার পাশে ছিলেন, উৎসাহিত করেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ। জয় হবে, আল্লাহর শাসন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবেই, ইনশাআল্লাহ।’
এ সময় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।
এ সময় তাকে অভ্যর্থনা জানান জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদআজসেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ঢাকা জেলা আমির দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, জয়নাল আবেদীন এমপি, উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার, আইনজীবী রুকন রেজা প্রমুখ।
নেতারা এ সময় তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানে সমবেত জনতার উদ্দেশে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, মোবারক হোসেন ও ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বক্তব্য রাখেন।
