মুক্তদেশ ডেস্ক: প্রাচীন বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্রের আধার কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণি। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এ পাহাড়শ্রেণি একদিকে যেমন ইতিহাসের সাক্ষী, অন্যদিকে তেমনি নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের মাটি কাটা, গাছপালা উজাড়, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও দখলের কারণে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এর প্রাকৃতিক পরিসর। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদও। এ অবস্থায় লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের ঐতিহ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসনের আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা।
প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণ, সড়ক সম্প্রসারণ, ইটভাটার মাটি সংগ্রহ এবং নিচু জমি ভরাটসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের মাটি কাটা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা, পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার পরও বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। এতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ধ্বংসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ২০১৫ সালে প্রকাশিত ময়নামতি-লালমাইবিষয়ক বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণির আয়তন প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার। পাহাড়টির সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ৫৫ মিটার এবং গড় উচ্চতা ২১ মিটার। এর উত্তর প্রান্তে রয়েছে রানী ময়নামতির প্রাসাদ এবং দক্ষিণ প্রান্তে প্রাচীন চণ্ডীমুড়া মন্দির।
সদর দক্ষিণ উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার লালমাই পাহাড় ও টিলা শ্রেণির ২ হাজার ১২১ একর ৫০ শতাংশ জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন। সরকারি এক নম্বর খাস খতিয়ানে রয়েছে ১০৩ একর ২৫ শতাংশ এবং বন বিভাগের পাঁচ নম্বর খতিয়ানে রয়েছে ১৮৩ একর ১২ শতাংশ জমি।
জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে ১ হাজার ৮৫৪ একর ৯৩ শতাংশ জমি হুকুমদখল করে কুমিল্লা সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৫৯ সালে ১৫৬ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)। কোটবাড়ীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সেক্টর সদর দপ্তর ও সংরক্ষিত এলাকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ১০০ একর পাহাড়ি জমি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে ভবন নির্মাণের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক সালমান চৌধুরী শাওন জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বড় ভবনের নির্মাণকাজ তিনি সরেজমিনে দেখেছেন। সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে তাঁর মনে হয়েছে, পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা (ইআইএ) প্রতিবেদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো আবেদন এখনো অনুমোদন পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শহিদুল হাসান বলেন, পাহাড়ে ভবন নির্মাণের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেছে। অনুমোদনের বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম গণমাধ্যমকে জানান, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারির পর চলতি বছরের মে মাসে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ ভবনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় নির্মাণকাজের শুরুতে পাহাড় কাটা হয়েছিল কি না, তা তাঁর জানা নেই।
অন্যদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি পাহাড়ি জমিতে ২০১৪ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি সিসিএন বিশ্ববিদ্যালয়, সিসিএন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও সিসিএন মডেল কলেজ। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম চৌধুরী দাবি করেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা হয়েছে এবং ভবন নির্মাণে পাহাড়ের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।
সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর, সালমানপুর ও জামমুড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের চিত্র দেখা গেছে। এসব স্থাপনা নির্মাণে পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বড় ধর্মপুর এলাকায় ২০২১ সালে প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের সময় পাহাড়ের এক লাখ ১৪ হাজার ঘনফুটের বেশি মাটি কাটার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর এনফোর্সমেন্ট মামলা করে।
একই এলাকায় ‘প্রবাসী পর্যটন ও বোটানিক্যাল গার্ডেন’ নির্মাণের জন্য একটি পাহাড় স্টিলের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এলাকাটির কাছেই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছপালা কেটে চক্ষু হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ দেখা গেছে।
অন্যদিকে ময়নামতি জাদুঘরের পশ্চিমের সড়কের দুই পাশে রয়েছে ‘নীলকুঞ্জ’ ও ‘কাশবন’ নামে দুটি রিসোর্ট। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড় কেটে নির্মিত এ রিসোর্ট দুটি প্রায় এক যুগ ধরে পরিচালিত হচ্ছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে সালমানপুর এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস’ নামে একটি বিনোদন পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ৫০ একর পাহাড়ি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ক্ষতিসাধন করে সেখানে রিসোর্ট, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জামমুড়া এলাকায় টিলা কেটে নির্মাণ করা হয়েছে ‘ডাইনোসর পার্ক’। একই এলাকায় পাহাড় সমতল করার চিত্রও দেখা গেছে। বড় ধর্মপুর চৌধুরী চা প্রকল্পের পাশেও রয়েছে পাহাড় কাটার চিহ্ন।
লালমাই-ময়নামতি পাহাড় শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে অন্তত ছয়টি রাজবংশের ৩৪ জন রাজার শাসনামলের বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৫ সাল থেকে এখানে নিয়মিত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। এ পর্যন্ত ৫০টির বেশি প্রত্নস্থল শনাক্ত করা হয়েছে।
এসব প্রত্নস্থলের মধ্যে শালবন বিহার, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, আনন্দ বিহার, কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া এবং রানী ময়নামতির প্রাসাদ ও মন্দির উল্লেখযোগ্য।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, পাহাড়জুড়ে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিবছর খননের মাধ্যমে নতুন নতুন নিদর্শন উন্মোচিত হচ্ছে। অবাধে পাহাড় কাটা ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনাবিষ্কৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাহাড় কাটার প্রভাব পড়েছে লালমাইয়ের জীববৈচিত্র্যেও। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দশকে এ পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় পাহাড়ি এলাকায় ছিল ঘন গাছপালা, বাঁশঝাড় ও বুনো লতায় ভরা প্রাকৃতিক বনভূমি। সেখানে বিচরণ করত বন্য শূকর, মেছোবাঘ, বুনো বিড়াল, শিয়াল, হনুমান, সজারু, খরগোশ ও বাদুড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী। ছিল নানা প্রজাতির পাখিরও অবাধ বিচরণ।
কিন্তু নির্বিচারে পাহাড় কাটা, গাছপালা উজাড় ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে এসব প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে আসছে। কমে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ ও বন্য প্রাণীর বিচরণক্ষেত্র। এতে পাহাড়ের পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
লালমাই পাহাড়ে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম বন্ধে ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) করা রিটের শুনানি শেষে আদালত লালমাই পাহাড়সহ অন্যান্য পাহাড়ে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কসহ কয়েকটি পক্ষের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সামাজিক বন বিভাগ কুমিল্লার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নূরুন্নাহার বলেন, লালমাই পাহাড়ে বন বিভাগের বেদখলে থাকা জমি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে থাকা তিন একর জমি নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এ বি এম মশিউজ্জামান বলেন, অধিকাংশ পাহাড় ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ। কোথাও পাহাড় কাটার খবর পেলেই প্রশাসন অভিযান চালায়। তাঁর দাবি, প্রশাসনের অভিযানের কারণে পাহাড় কাটা অনেকটা কমে এসেছে।
লালমাই-ময়নামতি পাহাড় কেবল একটি ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চল নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পাহাড় কাটা, বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে এ সম্পদ ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের পাশাপাশি পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাহাড়ের মাটি কেটে কিংবা গাছপালা ধ্বংস করে সাময়িক উন্নয়ন সম্ভব হলেও এর ফলে হারিয়ে যেতে পারে হাজার বছরের ইতিহাস ও প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ। তাই লালমাই-ময়নামতি পাহাড় রক্ষায় শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, দখলমুক্তকরণ এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ।
