মুক্তদেশ ডেস্ক: আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর গোষ্ঠীটি এখন এমন একটি বিষয় চাইছে, যা একসময় প্রায় অকল্পনীয় মনে হতো। সেটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আবার আফগানিস্তানে ফিরে আসা।
আগস্ট মাসে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ওয়াশিংটনের প্রতি কাবুলে মার্কিন দূতাবাস পুনরায় চালু করা, কূটনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং আফগানিস্তানের খনি, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তাঁর যুক্তি, সামরিক হস্তক্ষেপের সময় শেষ হয়েছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে।
দুই দশকের যুদ্ধের পর ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর কাবুলে তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয়। এরপর আফগানিস্তানে মার্কিন নাগরিকদের জন্য কূটনৈতিক কার্যক্রম কাতারের দোহায় স্থানান্তর করা হয়।
তালেবানের এই আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। ভারতও কাবুলে তাদের কূটনৈতিক উপস্থিতি পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। গত বছর তালেবান চীন, ইরান ও পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এ বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নও আফগানিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সেবা এবং আফগানদের ‘মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন’—অর্থাৎ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে আলোচনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি ওয়াশিংটনেও আলোচিত হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি আইশা ওয়াহাব—যিনি কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম আফগান-আমেরিকান—ক্ষমতায় যে গোষ্ঠীই থাকুক না কেন, আফগানিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আফগানিস্তানের পরিস্থিতিকে তিনি ‘আশাহীন’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক আফগান মেয়ে ও নারীদের পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
আফগানরা আসলে কী চায়?
তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আফগানিস্তানের জনগণ নিজেরা কী চায়?
অনেকের কাছে বিতর্কটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র কাবুলে ফিরে আসবে কি না, কিংবা তালেবান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য কি না—এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, তালেবানের শাসনাধীন মানুষের জীবনে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কী পরিবর্তন আনবে? এতে কি তাদের জীবনমানের উন্নতি হবে, নাকি শুধু সেই কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে, যারা বর্তমানে দেশটি নিয়ন্ত্রণ করছে?
যেসব নারীকে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র থেকে কার্যত বের করে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের কাছে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কোনো সুযোগ না হয়ে তালেবানের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরেকটি ছাড় হিসেবেও দেখা দিতে পারে।
নিরাপত্তার কারণে নিজের প্রকৃত নাম প্রকাশ না করার শর্তে নানগারহারের আফগান নারী চিকিৎসক আরজো আসাদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে ‘খুবই নেতিবাচক ও লজ্জাজনক’।
তাঁর আশঙ্কা, এতে তালেবান এমন বার্তা পেতে পারে যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো মূল্য দিতে না হয়েই তারা নিজেদের বিধিনিষেধ বহাল রাখতে পারবে।
আসাদ বলেন, “তালেবান আফগান মেয়েদের শিক্ষার দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।”
২০২২ সালের মার্চে আফগানিস্তানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করে। ওই বছরের ২০ ডিসেম্বর উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়। একই মাসে তালেবান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থায় নারীদের কাজ করাও নিষিদ্ধ করে। সর্বশেষ, ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর নারীদের চিকিৎসা ও আধা-পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
আসাদ বলেন, “নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র যদি তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে তালেবান এসব নীতি অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত হতে পারে।”
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করার আগে তালেবানের উচিত আফগান নারীদের কথা শোনা এবং তাদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া।
তাঁর উদ্বেগ শুধু কাবুলে মার্কিন দূতাবাস পুনরায় চালু করার প্রতীকী বিষয়টিকে ঘিরে নয়; বরং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অর্থ কী হবে, তা নির্ধারণের অধিকার কার হাতে থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বছরের পর বছর ধরে যেসব নারীর সামনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের দরজা বন্ধ হয়েছে, তাঁদের কাছে কূটনীতিকদের ফিরে আসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগ্রগতির প্রতীক হতে পারে না।
কাবুলের শিক্ষক জামিলা সাদাতও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি ট্রুথডিগকে বলেন, পাঁচ বছর ধরে তিনি বেকার।
সাদাত বলেন, “তালেবান মেয়েদের স্কুল বন্ধ করেছে, আমার চাকরি কেড়ে নিয়েছে এবং আফগান মেয়েদের শিক্ষার দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।”
নারীদের ওপর এ ধরনের বিধিনিষেধ বহাল থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাকে তিনি ‘খুবই লজ্জাজনক’ বলে মনে করেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাওয়ার আগে তালেবানের উচিত আফগান জনগণের কাছ থেকে বৈধতা অর্জন করা।
আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও দেশের অভ্যন্তরে জনগণের সমর্থন—এই দুইয়ের পার্থক্যই আফগানিস্তানের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে।
তালেবান রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করলেও এর অর্থ এই নয় যে তাদের রাজনৈতিক বৈধতা বা জনগণের সমর্থন রয়েছে। ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তারা কোনো জাতীয় নির্বাচন বা নির্বাচিত আইনসভা ছাড়াই দেশ পরিচালনা করছে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদেরও সরাসরি নিয়োগ দিচ্ছে তারা।
জাতিসংঘও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থার অভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কার্যত ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের সবাই পুরুষ এবং তাঁদের অধিকাংশই তালেবানের নেতৃত্ব ও গ্রামীণ রাজনৈতিক বলয় থেকে আসা।
বিচ্ছিন্নতার অর্থনৈতিক মূল্য
তবে আফগানিস্তানে অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার বিষয়ে কর্মরত আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব আফগানিস্তানের শিক্ষক ওবাইদুল্লাহ বাহিরের মতে, কাবুলের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক না রাখলেই যে মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, তা নয়। বরং এর নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ আফগানদের ওপরও পড়তে পারে।
বাহির ট্রুথডিগকে বলেন, তালেবান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেনি। নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় দুই পক্ষের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। ২০২২ সালে আফগানিস্তানবিষয়ক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিশেষ প্রতিনিধি টমাস ওয়েস্ট দোহায় তালেবানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে সন্ত্রাসবাদ দমনসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্বার্থ নিয়ে আলোচনা হয়।
বাহিরের মতে, আফগানিস্তান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুস্পষ্ট কৌশল নেই। তবে দেশটির খনিজ সম্পদ ও অবকাঠামো খাতে মার্কিন বিনিয়োগের জন্য তালেবানের আমন্ত্রণ বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক কাঠামো যা-ই হোক না কেন, জনগণেরই তাদের দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করা উচিত।” এ ক্ষেত্রে আফগান নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনকে সমর্থন দেওয়া এবং তাদের কথা শোনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাহির বলেন, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার প্রভাব শুধু তালেবান সরকারের ওপর পড়ছে না। এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ আফগানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের পক্ষে কথা বলার সক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “আফগান নারীদের রক্ষা করার নামে তারা আফগান পরিবারগুলোকে অনাহারে রাখতে চাইছে।”
আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে খাদ্য সরবরাহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অন্যান্য কারণও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, অর্থনৈতিক সংকট, মানবিক সহায়তা হ্রাস এবং উচ্চ বেকারত্বের কারণে আফগানিস্তানের আনুমানিক ১ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে রয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়। এর আগে ২০২১ সালে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৯৫০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের নীতির সমালোচনা করে বাহির বলেন, “আফগান নারীদের রক্ষা করার নামে তারা আফগান পরিবারগুলোকে অনাহারে রাখতে চাইছে।”
তাঁর যুক্তি, আফগানিস্তানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব উপেক্ষা করা উচিত নয়। একইভাবে আফগানিস্তানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের অর্থ এই নয় যে তালেবানকে নিঃশর্ত সমর্থন দিতে হবে।
বাহিরের মতে, শীতল যুদ্ধের সময় আফগানিস্তানের ঘটনাপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং দুই দশকের সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তাঁর মতে, আফগানিস্তানে মার্কিন সহায়তা বা অর্থনৈতিক সমর্থন কোনো দয়া নয়; বরং এমন একটি দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা, যাকে যুদ্ধের পর বিদেশি সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল করে রেখে যাওয়া হয়েছে।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের সামরিক সম্পৃক্ততায় আনুমানিক ২ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ২০২১ সালের আগস্ট নাগাদ অন্তত ৫৯ লাখ আফগান দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন অথবা দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরাও দেখেছেন, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের আগের সময়ের তুলনায় যুদ্ধের পর আফগানিস্তানে দারিদ্র্য, খাদ্য অনিরাপত্তা ও শিশুদের অপুষ্টি অনেক বেড়েছে।
এ কারণেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলাকে আফগানিস্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন বাহির।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হওয়া খারাপ, কিন্তু তার বন্ধু হওয়া প্রাণঘাতী।”
তাঁর যুক্তি, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আফগানিস্তানের যেকোনো সম্পর্ক পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে, নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে নয়।
তালেবানকে সমর্থন না দিয়েও বিচ্ছিন্নতা কাটানো সম্ভব
আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশের সাবেক গভর্নর (২০১৯-২০) এবং দেশটির সাবেক প্রজাতান্ত্রিক সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (২০০৩-০৫ ও ২০২০-২১) শাহমাহমুদ মিয়াখেল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তিনি ট্রুথডিগকে বলেন, তালেবান যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তাঁর মতে, ওয়াশিংটন তালেবানকে স্বীকৃতি দিলে কাবুলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে অন্যান্য সরকারও উৎসাহিত হতে পারে।
মিয়াখেল বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে তালেবান তাদের অভ্যন্তরীণ নীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। তাদের দৃষ্টিতে নারীর অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ বিষয়। এসবের সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সমর্থনের সম্পর্ক থাকা উচিত নয় বলে মনে করে তালেবান।
তবে বর্তমান অবস্থায় তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া ক্ষতিকর হবে বলে মনে করেন মিয়াখেল। একই সঙ্গে তিনি চলমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাকেও কোনো সমাধান বলে মনে করেন না।
তিনি বলেন, “আলোচনা জরুরি। তবে আলোচনার অর্থ এই নয় যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।”
মিয়াখেলের মতে, আফগানিস্তানের প্রয়োজন একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নিতে পারবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত একটি লয়া জিরগা বা বৃহৎ জাতীয় সমাবেশ আয়োজন করা যেতে পারে। সেখানে আফগানরা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথরেখা নিয়ে আলোচনা করতে পারবে।
লয়া জিরগা আফগানিস্তানের একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থা। এতে সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিরা একত্র হয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
সর্বশেষ বহুল স্বীকৃত জাতীয় লয়া জিরগা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত কাবুলে। এটি ছিল পরামর্শমূলক শান্তি লয়া জিরগা। এতে রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় পণ্ডিত, উপজাতীয় ও সামাজিক প্রবীণ, নারী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, তরুণ নেতা, বেসরকারি খাতের সদস্য এবং প্রবাসী আফগানসহ ৩ হাজার ২০০ জনের বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। বৈঠকে তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয় এবং অধিকার সুরক্ষার আহ্বান জানানো হয়।
২০২০ সালের আগস্টেও তালেবান বন্দিদের মুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য আরেকটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিষয়টি শান্তি আলোচনায় প্রভাব ফেলেছিল।
২০২২ সালে তালেবানও একটি বড় সমাবেশ আয়োজন করে। তবে সেখানে মূলত তালেবানপন্থী ধর্মীয় নেতারা অংশ নেন এবং নারীদের বাদ দেওয়া হয়।
মিয়াখেল যে লয়া জিরগার প্রস্তাব দিয়েছেন, তা তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার আগের সময়ে অনুষ্ঠিত বৃহত্তর জাতীয় সমাবেশগুলোর আদলে হওয়ার কথা। তাঁর মতে, আফগান সমাজের সব অংশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এমন একটি প্রক্রিয়া দরকার, যার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও অধিকতর গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থার পথরেখা নির্ধারণ করা যাবে।
তবে আফগানদের মধ্যে জাতিগত, আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক বিভাজনকে তিনি তালেবানবিরোধী সুসংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বর্তমানে তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে একক কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক বা সশস্ত্র জোট নেই। ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (এনআরএফ) এবং আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্ট প্রধান সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ছোট সংগঠন রয়েছে। এনআরএফ মূলত তাজিক জনগোষ্ঠীভিত্তিক; অন্য বিরোধী গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক পটভূমি থেকে উঠে এসেছে।
একই সঙ্গে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার সুযোগও ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। তালেবান রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছে। অনেক বিরোধী নেতা দেশ ছেড়েছেন, আত্মগোপনে গেছেন অথবা নিজেদের মতপ্রকাশে সংযম দেখাতে বাধ্য হচ্ছেন।
মিয়াখেলের মতে, একটি লয়া জিরগা এমন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথে পদক্ষেপ হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সব আফগানকে প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হবে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
পরস্পরবিরোধী প্রত্যাশা
কাবুলে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়া নিয়ে আলোচনায় তিন ধরনের ভিন্ন প্রত্যাশা রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজধানীতে কর্মরত সাংবাদিক সাঈদ ওমর সাহার। তিনি ট্রুথডিগকে বলেন, প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ফিরে এলে তালেবানের নিম্নপর্যায়ের বা কট্টরপন্থী অংশ এর বিরোধিতা করতে পারে। তারা মূল তালেবান ও সরকারি কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে দেশটির ভেতরে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং জনগণের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন আফগানিস্তানে চীন ও রাশিয়ার বর্তমান স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এর ফলে দেশটি আবারও দুই বা তিনটি বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
সাহার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।”
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহারের নিজের আহ্বান হলো, আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি তালেবান, আল-কায়েদা ও দায়েশের ওপর জাতিসংঘের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রও জাতিসংঘের এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে।
সাহারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তাই এখন তালেবান কেন ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চাইছে, সে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে আফগানদের।
একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, তালেবানের অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর চাপ সৃষ্টি না করে কোনো সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়। মেয়েদের শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকে কাজে লাগানো উচিত।
তবে এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের মানবাধিকার পরিস্থিতিও বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর বিধিনিষেধ, বিক্ষোভকারীদের অধিকার লঙ্ঘন, প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার, নির্বিচারে আটক এবং ইরানে বেসামরিক মানুষ হত্যাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত অস্ত্র সরবরাহেরও সমালোচনা করেছে। তাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্র ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে।
ট্রুথডিগের সঙ্গে কথা বলা আফগানদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে দেশটিতে নানা ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।
কারও কাছে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠার পথ। অন্যদিকে, যেসব নারীকে শ্রেণিকক্ষ ও কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, তাঁদের আশঙ্কা—অধিকার ফিরে আসার আগেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।
