মুক্তদেশ ডেস্ক:
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ৪ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের পাশের বিশাল পুকুরটি একসময় ছিল এলাকার মানুষের অন্যতম প্রধান জলাধার। প্রায় সাড়ে ৯ বিঘার এই সরকারি পুকুরে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার মানুষ পানি ব্যবহার করেন। হাটবারে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ থেকে ৩০ হাজারে। কিন্তু গত তিন বছরে পুকুরটির পাড়ে মাটি ফেলে ফেলে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে গেছে জলাধারটি।
একসময় জেলার শহর, গ্রাম ও জনপদজুড়ে ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য ছোট-বড় পুকুর ও জলাধার। এখন নগরায়ন, স্থাপনা নির্মাণ, মাটি ভরাট ও দখলের চাপে সেগুলোর অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কোথাও পুকুরের আয়তন কমেছে, কোথাও জলাধারের জায়গায় উঠেছে বহুতল ভবন, মার্কেট কিংবা আবাসিক স্থাপনা।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে কক্সবাজার জেলায় পুকুর ছিল ১০ হাজার ৬৩৭টি। জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে বর্তমানে টিকে আছে ৯ হাজার ৫৬০টি। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই এক যুগের ব্যবধানে হারিয়েছে সহস্রাধিক পুকুর। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, বাস্তবে জেলার পুকুরের সংখ্যা এখন ৭ হাজারের বেশি নয়।
পুকুর কমছে, বাড়ছে চাপ:
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারে ৯ হাজার ৫৬০টি পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়ায় ৮৮৭টি, কুতুবদিয়ায় ৬৩২টি, কক্সবাজার সদরে ৮৮৪টি, রামুতে ১ হাজার ৯৮০টি, উখিয়ায় ৮৮০টি, মহেশখালীতে ১৯৯টি, পেকুয়ায় ৩ হাজার ৩১৭টি এবং টেকনাফে ৮১৬টি।
২০১১ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের সঙ্গে এসব সংখ্যার তুলনা করলে জেলাভিত্তিক হিসাবেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। তবে বিভিন্ন উৎসের পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য থাকায় পুকুরের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে হালনাগাদ ও সমন্বিত জরিপের প্রয়োজন রয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, প্রতিবছর যেভাবে পুকুর হারিয়ে যাচ্ছে, তা জেলার জন্য উদ্বেগের বিষয়। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন—দুই ধরনের পুকুরই ভরাট হওয়ায় সুপেয় পানি ও পরিবেশগত সংকট বাড়ছে।
পুকুর ভরাট বন্ধে প্রশাসনের অভিযান, জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা থাকলেও প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কোথাও অভিযান চালিয়ে ভরাট বন্ধ করার পর আবার মাটি ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
শুধু পানি নয়, পুকুর একটি প্রতিবেশব্যবস্থা
একটি পুকুরকে কেবল পানি জমিয়ে রাখার জায়গা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্বের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, পানি নিষ্কাশনের ওপর চাপ কমানো, স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জলাধারের ভূমিকা রয়েছে।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, পুকুর বা জলাশয় কমে গেলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও জনজীবনে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। পুকুরের নিজস্ব একটি প্রতিবেশব্যবস্থা রয়েছে। বর্ষায় এগুলো পানি ধারণ করে এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমায়।
জলাধার কমে গেলে শহরে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপের প্রভাবও বাড়তে পারে। কারণ জলাধারের পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশকে তুলনামূলক শীতল রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে কংক্রিট, ইট ও পিচের মতো নির্মিত পৃষ্ঠ সূর্যের তাপ শোষণ করে ধরে রাখে।
কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশ সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক অবশ্য মনে করেন, তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণ হিসেবে শুধু পুকুর কমে যাওয়াকে দায়ী করা যাবে না। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনও নগরের তাপীয় পরিবেশে প্রভাব ফেলে।
পুকুর হারানোর সঙ্গে নামছে ভূগর্ভস্থ পানিও :
জলাধার হারানোর সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি পড়ছে পানিতে। কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় অগভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর প্রায় ১০ থেকে ১১ ফুট করে নিচে নামছে। এক দশক আগে শহরের টেকপাড়ায় ১২০ থেকে ১৫০ ফুট গভীরতার মধ্যে পানি পাওয়া গেলেও এখন যেতে হচ্ছে ৩০০ ফুটের বেশি গভীরে। কলাতলী এলাকায় গত কয়েক বছরে পানির স্তর ১০ থেকে ১৫ ফুট নিচে নেমেছে। এর প্রভাব পড়েছে সাগরপাড়ের হোটেলগুলোর ওপরও; তিন শতাধিক আবাসিক হোটেলের অনেক পানির পাম্প অকেজো হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ার পেছনে শুধু পুকুর ভরাট নয়, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, অনাবৃষ্টি ও বাড়তি তাপমাত্রার মতো একাধিক কারণও রয়েছে। আগের বছরগুলোর সংবাদ প্রতিবেদনেও কক্সবাজারে একই ধরনের পানির স্তর কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। পুকুর হারিয়ে যাওয়া এখানে বৃহত্তর পানি-সংকটের একটি অংশ।
আইনে নিষেধ, তবু থামছে না ভরাট :
প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী পুকুর, জলাশয়, নদী, খালসহ প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করা বেআইনি। জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কাজে ব্যবহারও নিষিদ্ধ। আইন ভঙ্গ করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তারপরও বাস্তবে পুকুর ভরাটের প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—আইন থাকার পরও কীভাবে একের পর এক জলাধার হারিয়ে যাচ্ছে? পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জলাধার রক্ষা সম্ভব নয়; প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, সঠিকভাবে জলাধারের তালিকা সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কঠোর তদারকি।
বিকল্প পানির উৎসের খোঁজ :
কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পৃষ্ঠপানি ব্যবহার এবং নদীর পানি শোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনজুর জানান, বাঁকখালী নদীর পানি শোধনের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি শোধন করা সম্ভব হবে, যা কক্সবাজার পৌরসভার মোট পানির চাহিদার প্রায় ৫৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। বিভিন্ন এলাকায় রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্পও চলছে। উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য পৃষ্ঠপানি সংরক্ষণ এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পাশাপাশি পুরোনো পুকুরগুলো টিকিয়ে রাখাও জরুরি।
কারণ একটি পুকুর ভরাট করে সেখানে ভবন বানানো যায়, কিন্তু সেই জায়গাটি হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। হারিয়ে যায় স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়। কমে যায় ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের সুযোগ। আর শহর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে কৃত্রিম পানি সরবরাহ ও গভীর নলকূপের ওপর।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত যেমন শহরটির পরিচয়ের অংশ, তেমনি তার অদৃশ্য জলাধারগুলোও শহরের পরিবেশগত নিরাপত্তার অংশ। সৈকত রক্ষার পাশাপাশি পুকুর, খাল ও অন্যান্য জলাধার রক্ষা না করা হলে ভবিষ্যতে কক্সবাজারের সংকট শুধু জলাবদ্ধতা বা গরমে সীমাবদ্ধ থাকবে না—সুপেয় পানির প্রশ্নটিও আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।
আজ যে পুকুরটি একটু একটু করে ছোট হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটি হয়তো মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে। আর তার সঙ্গে হারাবে শহরের পানি ধরে রাখার আরেকটি প্রাকৃতিক ভরসা।
