মুক্তদেশ ডেস্ক: ভারতের সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিস (SFIO) শাওমির ব্যবসায়িক মডেল এবং বিদেশি বিনিয়োগ আইনের সঙ্গে এর সম্মতি নিয়ে কথিত অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের সুপারিশ করেছে। এতে চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির ওপর নজরদারি আরও বাড়তে পারে বলে একটি সরকারি নথিতে দেখা গেছে।
চীনের শাওমি (1810.HK) একসময় ভারতের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া স্মার্টফোন ব্র্যান্ড ছিল। কিন্তু অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে দেশটির বাজারে প্রতিষ্ঠানটির অংশীদারত্ব কমে গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন করের দাবি এবং রয়্যালটি পরিশোধ নিয়ে বিরোধেও জড়িয়ে আছে শাওমি। সূত্র : রয়টার্স
ভারতের সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিসের (SFIO) সুপারিশে বলা হয়েছে, তদন্তে অর্থের লেনদেন এবং শাওমি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
২০২০ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর চীনা বিনিয়োগের ওপর ভারত নজরদারি আরও কঠোর করেছিল।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সরকার এই স্মারকলিপিটি পর্যালোচনা করছে। স্মারকলিপিটি মে মাসে তৈরি করা হয়েছিল এবং রয়টার্স সেটি দেখেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সপ্তাহান্তে ভারতে একটি ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর সম্ভাব্য ভারত সফরের ঠিক আগে এই তথ্য প্রকাশ্যে এলো।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, “প্রস্তাবিত তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা পরীক্ষা করা।”
এতে আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রকৃত মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তনের তথ্য যথাযথভাবে প্রকাশ ও অনুমোদন করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তে যাচাই করা উচিত। পাশাপাশি “বিস্তারিত SFIO তদন্ত” করার সুপারিশ করা হয়েছে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে শাওমির একজন মুখপাত্র বলেন, প্রতিষ্ঠানটি SFIO-এর কাছ থেকে এখনো কোনো নোটিশ বা যোগাযোগ পায়নি। তিনি বলেন, “আমরা দেশের আইনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই এবং সবসময় তা পুরোপুরি মেনে চলি।”
SFIO-এর অভিভাবক সংস্থা ভারতের করপোরেটবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং SFIO—উভয়ের মুখপাত্রই রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেননি।
SFIO হলো ভারতে করপোরেট জালিয়াতি তদন্তের প্রধান সংস্থা। আইন লঙ্ঘনকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার ক্ষমতাও সংস্থাটির রয়েছে।
শাওমি টেকনোলজি ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড এবং এর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে SFIO-এর তদন্তের প্রস্তাবটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।
ভারতীয় আইন প্রতিষ্ঠান কনসেক্রো ল’-এর প্রতিষ্ঠাতা মেঘভ গুপ্ত বলেন, “এ ধরনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই—কয়েক মাসও লাগতে পারে। মন্ত্রণালয় হয়তো তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কারণ খুঁজে নাও পেতে পারে, অথবা SFIO-কে তদন্ত শুরুর অনুমতি দিতে পারে। তারা অন্য সরকারি দপ্তরকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলতে পারে।”
২০২০ সালে চালু হওয়া কঠোর বিদেশি বিনিয়োগ বিধির আওতায় চীনা কোনো প্রতিষ্ঠান ভারতে বিনিয়োগ করতে চাইলে আগে সরকারি অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। শাওমিসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছিল, এর ফলে বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে ভারত সরকার এসব বিধিনিষেধের কিছুটা শিথিল করেছে। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে নয়াদিল্লি ও বেইজিং যখন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, তখন এই পরিবর্তন আনা হয়। শির সম্ভাব্য ভারত সফরকেও দুই দেশের সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতে শাওমির নানা চ্যালেঞ্জ
শাওমির জন্য SFIO-এর তদন্ত আরেকটি বড় ধাক্কা হতে পারে।
অবৈধভাবে অর্থ পাঠানোর অভিযোগে ২০২২ সাল থেকে ভারতের আর্থিক অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা শাওমির ৫৫.৫১ বিলিয়ন রুপি (৫৮৪ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের ভারতীয় ব্যাংক হিসাবের সম্পদ জব্দ করে রেখেছে। শাওমি ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং সম্পদ জব্দের সিদ্ধান্ত বাতিল করাতে এখনো সফল হয়নি।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের স্মার্টফোন বাজারে শাওমি এখন ১৩ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। আগে প্রতিষ্ঠানটির বাজার অংশীদারত্ব ছিল ১৯ শতাংশ।
২০২৫ সালে ভারতে শাওমির আয় ছিল ২.৫২ বিলিয়ন ডলার, যা তিন বছর আগের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম।
SFIO-এর প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাওয়া অভিযোগ ও তথ্যের ভিত্তিতে শাওমির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও।
SFIO অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে “সমন্বয়” করারও আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, একই সঙ্গে ঘটে থাকতে পারে এমন বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
স্মারকলিপিতে SFIO কোন তথ্য পর্যালোচনা করেছে তার বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে এতে তদন্তের জন্য ২১ দফার একটি কাঠামো দেওয়া হয়েছে। এতে তদন্তের পরিধি, পদ্ধতি এবং করণীয় পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজন হলে কোম্পানির নির্বাহীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
ভারত সরকারের কাছে জমা দেওয়া শাওমির আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনগুলোতে “গুরুত্বপূর্ণ ভুল তথ্য” রয়েছে কি না, তা যাচাই করার কথা বলেছে SFIO।
বর্তমান ও সাবেক পরিচালক, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (CFO) এবং কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তাদের বক্তব্যও রেকর্ড করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ই-কমার্স নিয়েও তদন্তের নজর
অ্যামাজন ও ওয়ালমার্টের ফ্লিপকার্টের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে শাওমির মতো ব্র্যান্ড ভারতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
তবে ছোট ও মাঝারি আকারের অফলাইন বা দোকানভিত্তিক খুচরা বিক্রেতারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্ট কিছু বিক্রেতার সঙ্গে একচেটিয়া চুক্তি করেছে। ভারতের বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) আইনে এ ধরনের ব্যবস্থা নিষিদ্ধ। ছোট দোকানগুলোর ব্যবসা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্ট অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
২০২৪ সালে ভারতের প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা অভিযোগ করেছিল, শাওমিসহ কয়েকটি স্মার্টফোন কোম্পানি অনলাইনে নির্দিষ্টভাবে পণ্য উন্মোচনের জন্য ওই দুই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করেছিল, যা প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘন করেছে। রয়টার্স তখন এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। শাওমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
SFIO-এর তদন্ত প্রস্তাবে এই বিষয়টিও আরও খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।
তদন্তে দেখা হবে, ভারতীয় বিক্রেতা বা পণ্য উন্মোচনের অংশীদারদের ওপর শাওমির “কার্যত নিয়ন্ত্রণ” ছিল কি না। একই সঙ্গে সেই ব্যবস্থাগুলোকে স্বাধীন ও স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক হিসেবে দেখানো হয়েছিল কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।
