খেলা ডেস্ক: শৈশবের ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ বা ‘বাজনা থামলে বসব কোথায়’ খেলার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেটে। ইংল্যান্ডের মাটিতে চলমান তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ইতিমধ্যে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে পাকিস্তান। এজবাস্টনে শেষ টেস্টের ঠিক আগে হুট করেই দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে সাতজন খেলোয়াড়কে। সেই সঙ্গে বরখাস্ত করা হয়েছে প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ ও বোলিং কোচ উমর গুলকেও। সিরিজ চলাকালেই নিয়মরক্ষার একটি ম্যাচের আগে এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত পাকিস্তান ক্রিকেটের চিরাচরিত অস্থিরতাকেই আবার সামনে এনেছে।
পাকিস্তান ক্রিকেটের ইতিহাস যারা জানেন, তাদের কাছে এই ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। অনিশ্চয়তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে হুটহাট কোচ বা খেলোয়াড়দের ‘চেয়ার’ কেড়ে নেওয়া পিসিবির বহু বছরের পুরোনো অভ্যাস। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই অল্প সময়ের ব্যবধানে পাকিস্তান ক্রিকেট দলে পরিবর্তন করা হয়েছে ১১ জন কোচকে। যেখানে চুক্তির মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন খুব কমসংখ্যক কোচই।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পাকিস্তান ক্রিকেটে কোচের এই পালাবদল আরও তীব্র হয়। তৎকালীন প্রধান কোচ মিসবাহ-উল-হক এবং বোলিং কোচ ওয়াকার ইউনুস তাদের চুক্তির মেয়াদ এক বছর বাকি থাকতেই পদত্যাগ করেন। গুঞ্জন ছিল, বোর্ডের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই তারা সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এরপর সাকলায়েন মুশতাক ও আবদুল রাজ্জাককে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সাকলায়েন স্থায়ী প্রধান কোচ হয়ে ২০২২-২৩ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত সব সংস্করণে দায়িত্ব পালন করেন।
সাকলায়েনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালের মার্চে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি সিরিজের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব পান আবদুল রেহমান। একই সময়ে নতুন স্থায়ী কোচ খোঁজার জন্য মিকি আর্থারকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয় পিসিবি। আর্থারের সুপারিশে নিউজিল্যান্ডের গ্র্যান্ট ব্র্যাডবার্নকে তিন বছরের জন্য প্রধান কোচ করা হয়। তবে ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান সেমিফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলে ব্র্যাডবার্নের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় বোর্ড। মানসম্মান বাঁচাতে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে ইংলিশ কাউন্টি দল গ্ল্যামারগনে যোগ দেন।
এরপর ২০২৩ সালের নভেম্বরে মোহাম্মদ হাফিজকে চার বছরের জন্য টিম ডিরেক্টর করা হলেও মাত্র দুই মাসের মাথায় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে বিদায় নিতে হয়। হাফিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানান, বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি আসার কারণেই তার মেয়াদের অকাল সমাপ্তি ঘটেছে। এরপর ২০২৪ সালের এপ্রিলে আজহার মাহমুদকে নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য স্বল্পমেয়াদি দায়িত্ব দিয়ে স্থায়ী কোচের সন্ধান শুরু করে পিসিবি।
সেই ধারাবাহিকতায় লাল বলের জন্য জেসন গিলেস্পি এবং সাদা বলের জন্য গ্যারি কারস্টেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর অক্টোবরে পদত্যাগ করেন কারস্টেন। পিসিবির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে তিনি চলে গেলে গিলেস্পিকে ছয় মাসের জন্য সাদা বলের দায়িত্বও দেওয়া হয়। তবে বোর্ডের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত গিলেস্পিও বিদায় নেন। এরপর নির্বাচক কমিটির সদস্য আকিব জাভেদ প্রথমে সাদা বলের এবং পরে লাল বলের কোচের দায়িত্ব পান।
গত বছর মে মাসে আকিবের কাছ থেকে সাদা বলের দায়িত্ব বুঝে নেন মাইক হেসন এবং পরের মাসে লাল বলের অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্বে ফেরেন আজহার মাহমুদ। কিন্তু এই সিদ্ধান্তেও স্থির থাকতে পারেনি পিসিবি। চলতি বছর এপ্রিলে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের আগে কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয় সরফরাজকে। তবে মাত্র পাঁচ মাস পরেই তাকে বরখাস্ত করা হয় এবং তার জায়গায় হেসনকে টেস্ট দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
একের পর এক কোচ পরিবর্তনের এই তামাশা পাকিস্তান ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে হাসির পাত্রে পরিণত করেছে। সরফরাজ ও গুলকে সরিয়ে দেওয়ার ঠিক পরদিনই পেশাদার যোগাযোগ মাধ্যম লিংকডইনে ফিল্ডিং কোচের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় পিসিবি। যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রল হচ্ছে। এক নেটিজেন মন্তব্য করেছেন, মনে হচ্ছে পিসিবির কাছে জমা পড়া জীবনবৃত্তান্তের তালিকা শেষ হয়ে গেছে, তাই নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ দেখানোর জন্য এই নাটক করা হচ্ছে। অন্য একজন লিখেছেন, পাকিস্তান ক্রিকেট আসলেই নিত্যনতুন নাটকের এক অফুরন্ত উৎস। সমালোচকদের এমন তির্যক মন্তব্যের বিপরীতে পিসিবির আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই যেন অবশিষ্ট নেই।
