মু্ক্তদেশ ডেস্ক: চীনের একটি উদ্ধারকারী দল প্রথমবারের মতো প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া গিরং সীমান্ত ক্রসিং কমপ্লেক্সে পৌঁছে ‘শুধু ধ্বংসস্তূপ’ দেখতে পেয়েছে। এদিকে বন্যাকবলিত হিমালয়ে নেপাল ও চীন কঠিন উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গিরং সীমান্ত ক্রসিং কমপ্লেক্সের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে বুধবার দেখা যায়, বিপুল জলরাশি ও ধ্বংসাবশেষ ভবনগুলো এবং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা মানুষকে গ্রাস করছে। শুক্রবারের আগে উদ্ধারকারীরা ওই এলাকায় পৌঁছাতে পারেননি। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ২১ সদস্যের একটি চীনা উদ্ধারকারী দল এবং একটি অনুসন্ধানী কুকুর পাহাড় ও উপত্যকা পেরিয়ে সেখানে পৌঁছায়। খাড়া হিমালয় পর্বতের ঢালে ঘেরা ওই কমপ্লেক্সে যাওয়ার সড়কগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারীরা দড়ি ব্যবহার করে বন ও খাড়া পাহাড়ি পথ অতিক্রম করেন। সূত্র : গার্ডিয়ান
হিমালয়ের একটি বিশাল হিমবাহের অংশ ভেঙে নেপালের লাংটাং ন্যাশনাল পার্কের উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার পর ব্যাপক জল, কাদা, পাথর ও বরফের স্রোত নদী ও উপত্যকা দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসে। এতে গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়। নেপালে এই দুর্যোগে অন্তত ৬২৬ জন এবং চীনের তিব্বতে সাতজন নিহত হয়েছেন। শনিবার নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে—নেপালে ২ হাজার ৪২৬ জন এবং তিব্বতে ৫৫৪ জন।
উদ্ধারকর্মী জু মিংছি বলেন, “কোনো সড়ক ছিল না… পুরো এলাকাটিই ছিল আদিম বন আর খাড়া পাহাড়।” তিনি বলেন, কমপ্লেক্সে পৌঁছে “যতদূর চোখ যায়, শুধু ধ্বংসস্তূপই দেখা গেছে।”
সংকট আরও গভীর হওয়ায় নেপাল এখন বলেছে, যেসব বিশেষায়িত ও কারিগরি ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব দক্ষতা নেই, সেসব ক্ষেত্রে বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন। তবে সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই।
শুক্রবারের শুরুতে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, আপাতত কাঠমান্ডু নিজেরাই উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে এবং বিদেশি সহায়তা প্রত্যাখ্যান করেছিল।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল শুক্রবার রাতে বলেন, সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়া এলাকাগুলোতে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা, মৃতদেহ শনাক্ত করা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য মৃতদেহ সংরক্ষণের মতো ক্ষেত্রে সহায়তা প্রয়োজন।
সরকারের আগের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে খানাল বলেন, সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে সহায়তার প্রয়োজন নেই; এসব কাজ নেপালি উদ্ধারকারীরাই করছেন। তিনি বলেন, “এ ক্ষেত্রে কাজের পুনরাবৃত্তির কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।”
নেপালের দুই প্রতিবেশী ভারত ও চীনের কাছে বেইলি ব্রিজ সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে। কারণ প্রায় দুই ডজন সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় একটি এলাকায় পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।
এদিকে নেপাল বন্যাকবলিত এলাকার উজানে থাকা দুটি জলাধার বা প্রতিবন্ধক হ্রদের ওপর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। একজন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, দুটি হ্রদের পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত বন্যার ঝুঁকি থাকবে।
স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, দ্বিতীয় হ্রদটি আরও বড় হচ্ছে এবং এর কোনো দৃশ্যমান পানি নিষ্কাশনের পথ নেই। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে পানির চাপ আরও বাড়তে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী প্রথম হ্রদটির আকার কমছে। তবে চীনের একজন সরকারি ভূ-দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, হ্রদটি অস্থিতিশীল হতে পারে। এ ছাড়া পুরো এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ১০০টিরও বেশি হিমবাহজাত হ্রদও হুমকি তৈরি করতে পারে।
বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পলিটব্যুরোর এক বৈঠকে হিমবাহজাত হ্রদ ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও জোরালোভাবে পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে বলে সিনহুয়া জানিয়েছে।
চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদধারী কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার বিকেলে গিরং এলাকার উদ্দেশে রওনা হন বলে সিনহুয়া জানিয়েছে। তাঁর এই সফর থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বেইজিং এই দুর্যোগকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে।
তবে চীনে দেশটির সবচেয়ে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর একটি থেকে তথ্যপ্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকায় তিব্বতের বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ভয়াবহ বন্যার যেসব ভিডিও বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলো চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়নি।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বন্যা নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন ও সম্প্রচার করেছে এবং নিজেদের সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। তবে এসব প্রতিবেদনে ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতার চেয়ে উদ্ধার তৎপরতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিব্বতের একটি ত্রাণকেন্দ্র থেকে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে সাংবাদিকটি তাঁর পেছনে বসে থাকা কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলেননি।
১৯৫০-এর দশকে চীনের নিয়ন্ত্রণে আসা তিব্বত দেশটির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল।
গিরং সীমান্তবন্দর চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীন দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গত এক দশকে সেখানে লজিস্টিকস এলাকা ও পার্কিং লট নির্মাণ করা হয়েছে।
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে ধারণা করেছেন, পুনর্গঠনের জন্য দেশটির ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, “এটি শুধু একটি প্রাথমিক হিসাব। ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের পরিমাণ নির্ধারণ করা হচ্ছে।”
রেড ক্রসের হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
