মুক্তদেশ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
অর্থনৈতিক সংকট, দুর্বল ব্যাংক খাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অনিয়ন্ত্রিত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শুরু হয় বিএনপি সরকারের যাত্রা।
এত সব নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি নিজে ছুটছেন ‘রকেট’ গতিতে। ছুটছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, নিজে কোদাল হাতে খাল খনন, বৃক্ষরোপণ করে দেশের মানুষকে উৎসাহ দিয়ে চলেছেন।
কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিনিয়ত মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। হাতে গোনা দু-এক দিন ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ছুটির দিনেও প্রশাসনিক কাজ অব্যাহত রেখেছেন, যা দেশের মানুষকে নতুন করে উজ্জীবিত করছে।
আবার বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফলে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ফিরছে স্থিতিশীলতা। এ ছাড়া বাংলাদেশ ভ্রমণের জন্য নিরাপদ বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। তারেক রহমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত সরকারও ভিসা ঝটিলতার নিরসনে সুখবর দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের ছয় মাসের চুলচেরা মূল্যায়ন এখনই করা কঠিন।
তবে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে। কারণ বিপুল জনপ্রিয়তায় নির্বাচিত সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার রাজনৈতিক ম্যান্ডেট। সেই ম্যান্ডেটের জায়গা থেকে সিদ্ধান্তহীনতা বা অতিরিক্ত দোলাচল দীর্ঘায়িত হলে মানুষের প্রত্যাশা একসময় হতাশায় পরিণত হতে পারে। এই সরকারকে এখন আরো সিদ্ধান্তমূলক অবস্থান নিতে হবে। জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে পেশাদারি জরুরি।
গত ছয় মাসে সরকারের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের প্রথম ছয় মাসকে কোনোভাবেই নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে জরুরি কিছু সেবা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র, প্রান্তিক, নারী ও পুরুষ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি একটি ‘গুড সাইন’। এ ছাড়া কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি, তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে নতুন কর্মসূচি, বিদেশি বিনিয়োগে উদ্যোগসহ নানা কর্মসূচি সরকারের সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাড়ে তিন মাসের মাথায় বাজেট ঘোষণা এবং সেটিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার কাছাকাছি রাখার চেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি করের চাপ না বাড়িয়ে সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য এই বাজেটকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে।
সরকারের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো কাজের সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা। প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভা থেকে প্রতিদিনের কাজে সততা ও জবাবদিহির একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং তাদের কথা শোনার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলারও চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জগুলোও সামনে আনছেন। তাঁরা বলছেন, সরকার এখনো মানুষের সব উদ্বেগে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। জ্বালানিসংকট, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ইস্যুতে অস্বস্তি রয়ে গেছে। অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক সূচক থাকলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষ করে প্রশাসনে বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেছে—এমনটা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। ফলে প্রশাসনে এক ধরনের স্থবিরতা, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা থাকলেই হবে না; এই সদিচ্ছা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে কার্যকর করার সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে।
জানতে চাইলে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার ছয় মাসে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে চেষ্টা করেছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জরুরিভাবে মানুষকে বেশ কিছু সেবা দেওয়ার দরকার ছিল। তা কিন্তু সফলভাবে করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড থেকে শুরু করে সামাজিক সুরক্ষায় কার্যকরী উদ্যোগগুলো ইতিবাচক।’
তিনি বলেন, ‘এ ছাড়া দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মাথায় বাজেট ঘোষণা করা অনেক বড় ব্যাপার।’
তিনি আরো বলেন, ‘জ্বালানিসংকট, দ্রব্যমূল্য, এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। মানুষের নিরাপত্তাসংকট এখনো আছে।’
রাজনীতির মাঠে অমীমাংসা : রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনীতির মাঠে সরকারের জন্য কিছু উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জুলাইয়ের অঙ্গীকার পূরণ নিয়ে বিরোধীদের প্রচারণায় সরকার যথাযথ রাজনৈতিক জবাব দিতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। গণভোটের রায় কিভাবে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে সংসদকে কাজে লাগিয়ে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংশোধনীগুলো বিল আকারে উত্থাপন করা গেলে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান আরো শক্তিশালী হতে পারত।
বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের একটি শরিক দলের শীর্ষ নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে সরকারের রাজনৈতিক যোগাযোগের দুর্বলতাও সামনে আসছে। সরকার কী করছে, কেন করছে এবং কোন প্রতিশ্রুতি কিভাবে বাস্তবায়ন করছে, এসব বিষয়ে জনগণের কাছে আরো পরিষ্কার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘শরিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক মাসে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ছিল। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শরিকদের বৈঠকের মধ্য দিয়ে সেই দূরত্ব কমিয়ে ঐকমত্য ধরে রাখার চেষ্টা ইতিবাচক।’
‘রেইনবো নেশন’-এর ধারণা দৃশ্যমান নেই : সরকার যে জাতীয় সরকার ও ‘রেইনবো নেশন’-এর ধারণা সামনে রেখে ক্ষমতায় এসেছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন এখনো খুব বেশি দৃশ্যমান নয়। একটি ‘রেইনবো নেশন’-এর ধারণা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, মন্ত্রিসভা, প্রশাসন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন থাকা দরকার। এই জায়গায় সরকারের আরো দৃশ্যমান উদ্যোগের কথাও বলেছেন কেউ কেউ।
প্রধানমন্ত্রীর কাজের গতির সঙ্গে কুলাচ্ছেন না মন্ত্রীরা : প্রধানমন্ত্রী যে গতিতে কাজ করতে চাইছেন, মন্ত্রিসভার সবাই একই গতিতে এগোতে পারছেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। সরকারের দ্বিতীয় পর্যায়ে এই সমন্বয়হীনতা কাটানো জরুরি বলে মনে করছেন শরিক দলের নেতারা। মন্ত্রিপরিষদের একাধিক সদস্য বিষয়টি স্বীকার করেছেন কালের কণ্ঠের কাছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তারেক রহমানের নেতৃত্ব ইতিবাচক : তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা রয়েছে। ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার বাস্তবতাও সরকার বিবেচনায় রাখছে। কারণ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আবেগ দিয়ে নয়, জাতীয় স্বার্থ ও বাস্তব কূটনৈতিক হিসাবের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে সরকারের আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল বলে কূটনীতিকরা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মো. সাহাবুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিগত ছয় মাসে বিএনপি সরকার রাজনৈতিক অস্থিরতার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সফল উদ্যোগ দেখিয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রাথমিক বাস্তবায়ন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সক্রিয় করা এবং অর্থনীতিতে আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা ইতিবাচক। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির প্রতিফলন।’
তিনি বলেন, ‘নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এখনো মানুষের প্রধান উদ্বেগ। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় গতি প্রয়োজন। ছয় মাস কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য অল্প সময় হলেও সরকার যদি স্বচ্ছ সূচক, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং দৃশ্যমান ফলের মাধ্যমে অগ্রগতি তুলে ধরে, তবে জন-আস্থা সুদৃঢ় হবে এবং সংস্কারের ভিত্তি শক্তিশালী হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাদাসিধে জীবন এবং সংসদে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কথা বলা দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করেছে।’
