মুক্তদেশ ডেস্ক:
১৪ জুলাই পাঞ্জাবের লুধিয়ানা শহর থেকে নয়াদিল্লিতে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে যোগ দিতে রওনা হওয়ার সময় কুনাল চৌধুরী জানতেন, এটি কার্যত একমুখী যাত্রা। অদূর ভবিষ্যতে বাড়ি ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম।
১৯ বছর বয়সী চৌধুরী পাঞ্জাবেরই আরেক শহর জলন্ধরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। মেডিকেল ভর্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ছুটে আসা হাজার হাজার মানুষের মধ্যে তিনিও ছিলেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ২০ জনের বেশি পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করায় সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। সূত্র : আল জাজিরা
এই নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনকে নাড়িয়ে দেয়। এর ফলে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয় এবং সরকার ভর্তি পরীক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এতে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তিতে ফাটল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এদিকে দেশের অন্যান্য অংশেও একই ধরনের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
তবে নয়াদিল্লির বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার জন্য চৌধুরীর যাত্রা ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা।
বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল খালি করে দেওয়া এবং ৩৬ দিন ধরে চলা বিক্ষোভের আয়োজক ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরও চৌধুরী সেই জায়গা ছাড়েননি, যেখানে তার ভাষায় তার জীবন আমূল বদলে গেছে। এমনকি বিক্ষোভ শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে সহবিক্ষোভকারী ও সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে তিনি তার ১৯তম জন্মদিনও উদযাপন করেন।
চৌধুরী আল জাজিরাকে বলেন, “আমার বাবা বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্য। দিল্লিতে আসার জন্য বাড়ি ছাড়ার আগ পর্যন্ত আমিও আরএসএসের সদস্য ছিলাম। বিক্ষোভের সঙ্গে আমার চূড়ান্ত সেমিস্টারের পরীক্ষা মিলে যাওয়ায় আমি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারিনি। কিন্তু যা হওয়ার হয়েছে। চারপাশের পৃথিবী ভেঙে পড়ছে আর আমি বসে বসে তা দেখব—এটা মেনে নিতে পারিনি।”
‘তারা শুধু শেখায় কীভাবে মুসলমানদের ঘৃণা করতে হয়’
আরএসএস হলো বিজেপির উগ্র ডানপন্থী আদর্শিক অভিভাবক। ১৯২৫ সালে ইউরোপের ফ্যাসিবাদী দলগুলোর আদলে প্রতিষ্ঠিত এই গোপনীয় আধাসামরিক সংগঠনটি বহু হিন্দু সংগঠনের নেতৃত্ব দেয়। এসব সংগঠনের অভিন্ন লক্ষ্য হলো সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।
আরএসএসের সবচেয়ে প্রচলিত কর্মকাণ্ড হলো সাপ্তাহিক স্থানীয় সভা, যাকে ‘শাখা’ বলা হয়। সেখানে সাধারণত সাদা শার্ট ও খাকি হাফপ্যান্ট পরা পুরুষেরা সামরিক কসরতে অংশ নেন এবং মতাদর্শগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
মহারাষ্ট্রের নাগপুরে সদর দপ্তর থাকা আরএসএসকে ১৯৪৮ সালে সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। সংগঠনটির এক কথিত সদস্য স্বাধীনতা আন্দোলনের কিংবদন্তি মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করার পর এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরের বছর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ১৯৫১ সালে সংগঠনটি তার রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করে, যা ১৯৮০ সালে বিজেপিতে রূপ নেয়।
বর্তমানে ভারতে ও বিদেশে আরএসএসের আজীবন সদস্য হিসেবে মোদি এবং বিজেপির আরও অনেক শীর্ষ নেতা রয়েছেন।
চৌধুরীর বাবা জীবন চৌধুরী একজন ব্যবসায়ী। তিনি এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না—এমন সময় তিনি দেখেননি। তবে তরুণ চৌধুরী অনেকটা অনিচ্ছায় সেই উত্তরাধিকার গ্রহণ করেছিলেন। তার ভাষায়, “মন থেকে কখনোই এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না।”
চৌধুরী বলেন, “তারা আপনাকে কোনো কাজে লাগে এমন কিছু শেখায় না। তারা শুধু শেখায় কীভাবে মুসলমান ও দলিতদের ঘৃণা করতে হয়।”
দলিতরা ভারতের সবচেয়ে প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠী। ভারতীয় সংবিধান আইনগতভাবে অস্পৃশ্যতার প্রথা বিলোপ করার আগে তাদের ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে বহু শতাব্দী ধরে উচ্চবর্ণের মানুষের নিপীড়নের শিকার এই জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য ও সহিংসতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
চৌধুরী বলেন, ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন নিয়ে তার পরিবারের সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল—সেখানে মানুষ “জাত, ধর্ম বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে মাথা ঘামাত না; সবাই একসঙ্গে বসত, পাশাপাশি বসে খাবার খেত।”
তিনি বলেন, “ওদের মস্তিষ্ক এ ধরনের কিছু কল্পনাই করতে পারে না।”
এর উদাহরণ হিসেবে তিনি মোহাম্মদ জুনায়েদের কথা বলেন। মুসলিম এই ব্যক্তি আন্দোলনের সময় জন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের বিনা মূল্যে খাবার ও পানি পরিবেশন করতেন। জন্তর মন্তর হলো ১৮ শতকে নির্মিত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ও জনসমাবেশের স্থান, যেখানে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়েছিলেন।
বিক্ষোভ চলাকালে চৌধুরীর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি সরকারি দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন এবং জানান, তিনি একজন বিজেপি কর্মীর ছেলে এবং নিজেও একসময় আরএসএসের সদস্য ছিলেন।
চৌধুরী বলেন, “আমার বাবা-মা ভিডিওটি দেখার পর বাবা আমাকে বিজেপি ও আরএসএস সম্পর্কে কোনো ভুল কথা না বলতে বলেন। কিন্তু আমি তাদের সম্পর্কে ভুল কিছু বলিনি। আমি সারা জীবন এটাই দেখে এসেছি।”
চৌধুরী নিয়মিত বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তবে বাড়ি ফিরতে চান না।
তার ভাষায়, “আমি যেভাবে পৃথিবীকে দেখি আর যাদের মধ্যে বড় হয়েছি, তারা যেভাবে পৃথিবীকে দেখে—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য এতটাই বেড়ে গেছে যে এখন আর বাড়ি ফিরে যাওয়া সম্ভব মনে হয় না।”
তিনি টেলিমার্কেটার হিসেবে চাকরি খুঁজে নিজের খরচ চালানোর পরিকল্পনা করছেন। এরপর দূরশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হয়ে আইন বিষয়ে ডিগ্রি শেষ করতে চান।
তিনি জানান, তার মা নীরবে তার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছেন। তবে আপাতত বাড়ি ফিরে যাওয়া তার জন্য কোনো বিকল্প নয়।
বর্তমানে তিনি জন্তর মন্তরের কাছাকাছি একটি শিখ গুরুদ্বারে থাকছেন। বিক্ষোভ চলাকালে এই শিখ উপাসনালয়টি সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য তার দরজা খুলে দিয়েছিল।
চৌধুরী বলেন, “একদিনের জন্যও আমাকে না খেয়ে থাকতে হয়নি। কিন্তু এখন বিক্ষোভ শেষ হয়ে যাওয়ায় আশ্রয় ও খাবার খুঁজে পাওয়া কিছুটা কঠিন হয়ে গেছে। আমার মানিব্যাগটি চুরি হয়ে গেছে। সেখানে কিছু টাকা ও আমার পরিচয়পত্র ছিল। তাই এখন আর আমার কাছে তেমন টাকা নেই।”
‘বাড়িতে থাকলে বন্ধুদের ফোন ধরবেন না’
প্রিয়া সিংয়ের বাবা কট্টর বিজেপি সমর্থক। জন্তর মন্তরের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি মেয়েকে শারীরিকভাবে মারধরের হুমকিও দিয়েছিলেন।
২৪ বছর বয়সী সিং আল জাজিরাকে বলেন, “আমি যখন সেখানে যাই, মুখ ঢেকে রাখতাম। যাতে ছবি বা ভিডিও দেখে বাবা জানতে না পারেন যে আমি সেখানে ছিলাম। কারণ আমি তাকে আগেই বলেছিলাম, আমি মোদির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে যাচ্ছি।”
সিংয়ের ৫৫ বছর বয়সী বাবা একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। সিংয়ের ভাষায়, বিজেপির প্রতি তার বাবার রয়েছে “অন্ধ বিশ্বাস”।
একটি ভিডিওতে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে নারী বিক্ষোভকারীর ওপর যৌন নিপীড়ন করতে দেখা যাওয়ার পর সিং সেটি বাবাকে দেখান। কিন্তু তার বাবা পুলিশকে সমর্থন করেন।
সিং বলেন, “বাবা বলেছিলেন, তাদের সেখানে যাওয়াই উচিত হয়নি, কারণ সরকার তাদের বিক্ষোভ না করতে বলেছিল।”
তিনি আরও বলেন, “আমি যখন বললাম শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার, বাবা বললেন, তাতে কিছু যায় আসে না। এমনকি তিনি বলেছিলেন, বিক্ষোভে গুরুতর আহত নারীরা নিজেরাই এর জন্য দায়ী, কারণ তারা বাবা-মায়ের কথা শোনেনি এবং তাদের না জানিয়ে বিক্ষোভে গিয়েছিল।”
সিং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার দ্বিতীয় বর্ষের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। প্রায় এক শতাব্দী আগে মূলত মুসলিমদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
সিং বলেন, “আমি বাড়ির কাউকে না জানিয়ে জামিয়া মিলিয়ার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিই। এরপর কাউকে না জানিয়েই সেখানে ভর্তি হয়ে যাই।”
তিনি জানান, উর্দু ও আরবি নামের এই প্রতিষ্ঠানটির নামের অর্থ ‘ইসলামিক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ হওয়ায় তার বাবা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
“তিনি বলেছিলেন, সেখানকার মানুষ আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে এবং আমাকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তখন তার আর কিছু করার ছিল না, কারণ আমি এরই মধ্যে ভর্তি হয়ে গিয়েছিলাম। এখন বাড়িতে গেলে আমি আমার বন্ধু বা ক্লাসের বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে কোনো কথা বলি না। এমনকি বাড়িতে থাকলে বন্ধুদের ফোনও ধরি না,” বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে টেলিফোনে বলেন সিং।
‘মার খেতে তার এত ভালো লাগে কেন?’
সিংয়ের বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে থাকেন ২৫ বছর বয়সী অঞ্জলি। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। প্রতিবেদনে তার শুধু এক নামই ব্যবহার করা হয়েছে।
ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য বিহারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অঞ্জলি শৈশবের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন “খিটখিটে মেজাজের বাবার বাজপাখির মতো নজরদারির” মধ্যে।
তার ভাষায়, বাবা-মা তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তার বৈষম্য করতেন। তাকে ভালোভাবে পড়াশোনা ও সামাজিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ না দিলেও ছেলেকে ঠিক তার বিপরীত সুবিধা দেওয়া হতো।
অঞ্জলির বাবা-মা শুধু কট্টর বিজেপি সমর্থকই নন, তারা আরএসএসের সদস্যও।
অন্যদিকে অঞ্জলি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ)-এর ছাত্রনেতা। এটি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী), বা সিপিআই (এমএল)-এর ক্যাম্পাস শাখা।
অঞ্জলি বলেন, বামপন্থী রাজনীতিতে তার যুক্ত হওয়া ধীরে ধীরে হয়েছে।
তিনি শুরুতে নরেন্দ্র মোদির ভক্ত ছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালে, যে বছর তিনি পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া বন্ধ করেন, তার মধ্যে পরিবর্তন আসে। তিনি রাজনৈতিক বর্ণালির অন্য প্রান্তে চলে যান এবং এআইএসএতে যোগ দেন।
গত বছর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তিনি একটি বামপন্থী জোটের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীও ছিলেন।
অঞ্জলি বলেন, তার মা মাঝে মাঝে গোপনে টেলিভিশন সংবাদে তাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেখেন।
“তিনি ফোন করে বলেন, আমার বক্তব্য তার ভালো লেগেছে। তাকে কখনো নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি খুব বেশি শিক্ষিতও নন। কিন্তু আমার বাবা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছেন এবং শিক্ষিত মানুষ। তাই আমি যতটা সম্ভব তার সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা এড়িয়ে চলি,” আল জাজিরাকে বলেন অঞ্জলি।
তবে তার বাবা-মা তার রাজনীতিকে এখনো গুরুত্ব দেন না। বরং তাকে লজ্জা দেওয়া, অপরাধবোধে ভোগানো, অপমান করা এবং জীবন নষ্ট না করে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বোঝানোর “সব ধরনের কৌশল” তারা ব্যবহার করেন বলে অঞ্জলি জানান।
জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর তার মা নিয়মিত ফোন করে জানতে চাইতেন তিনি কোথায় আছেন।
অঞ্জলি বলেন, “আমি মিথ্যা বলে বলতাম, পড়াশোনা বা কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। তখন মা বলতেন, তিনি আমাকে টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলেই দেখে ফেলেছেন।”
২০ জুলাই বিক্ষোভকারীরা যখন পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করেন, সেদিন তার মা কাঁদতে কাঁদতে ফোন করেন। পুলিশ লাঠিচার্জের সময় অঞ্জলি আহত হয়েছেন কি না, তা জানতে চান তিনি।
অঞ্জলি বলেন, “তিনি বললেন, পুলিশ কী করছিল তা তিনি দেখেছেন এবং আমি ঠিক আছি কি না জানতে চাইলেন। আমি ঠিক ছিলাম না। পুলিশের হামলার পর থেকে আমার লিগামেন্টে চোট রয়েছে।”
মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তিনি বাবার একটি মন্তব্যও শুনতে পান।
অঞ্জলির ভাষায়, “বাবা বলেছিলেন, ‘আমি তো তাকে বলেছিলাম এই শাসনব্যবস্থা তাকে পিষে ফেলবে। তারা কাউকে ছাড়বে না। মার খেতে তার এত ভালো লাগে কেন? আমরা কি তাকে শুধু মার খাওয়ার জন্য বড় করেছি?’”
তিনি আরও বলেন, তার বাবা স্বীকার করেছিলেন যে তিনি এই শাসনব্যবস্থারই অংশ এবং এর সঙ্গে ক্ষমতাবান ও বিপুল অর্থসম্পদের অধিকারী মানুষ জড়িত। কেউ তাদের পরিবর্তনের চেষ্টা করলে তাকে পিষে ফেলা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
অঞ্জলি বলেন, মাঝে মাঝে তার বাবা বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি মেয়েকে তার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিতে বলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিবারই বলেছেন, অঞ্জলি “লোক দেখানো বিক্ষোভ” করে জীবন নষ্ট করছেন, যার কোনো ফল হবে না।
তাই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর অঞ্জলি বাবা-মায়ের কাছ থেকে আগের মতো তাচ্ছিল্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়াই আশা করেছিলেন।
কিন্তু মায়ের আচরণ তাকে অবাক করে দেয়। তার মা বরং খুশি হন, এমনকি মেয়ের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রায় গর্বিতও হন।
অঞ্জলি মনে করে বলেন, তার মা বলেছিলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।”
তার মা আরও বলেছিলেন, “এখানে পৌঁছাতে আমাদের হয়তো সময় লেগেছে, কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি যে আমরা এটা করতে পারি।”
তবে বাবার কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অঞ্জলিও বাবার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে চলছেন।
‘তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি দেশপ্রেমিক হয়ে গেছ’
ভারতের সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো কীভাবে পরিবারের ভেতরের সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নেহা বোরা।
২৯ বছর বয়সী বোরা এআইএসএর জাতীয় সভাপতি—যে সংগঠনের সদস্য অঞ্জলিও। নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পিএইচডি শিক্ষার্থী বিক্ষোভের সময় ২৩ দিন অনশন করা আন্দোলনকারীদের একজন ছিলেন।
বিক্ষোভের পর তিনি মোদি সরকারের অন্যতম সরব জেন-জি সমালোচক হিসেবে সামনে এসেছেন।
সাংবাদিক বরখা দত্তকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বোরা জানান, তার বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা এবং মা গৃহিণী। তারা বিজেপির সমর্থক এবং মেয়ের বামপন্থী রাজনীতিকে “ভালোভাবে নেননি”।
তবে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বোরার অনশনের খবর পেয়ে তার মা উত্তর প্রদেশের বেরেলি শহর থেকে জন্তর মন্তরে ছুটে আসেন। দিল্লি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত বেরেলি তাদের বাড়ি।
ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর তিনি মেয়েকে অভিনন্দনও জানান।
আরএসএসের সাপ্তাহিক ইংরেজি মুখপত্র ‘অর্গানাইজার’-এর সম্পাদক প্রফুল্ল কেতকার মনে করেন, বিভিন্ন কারণে পরিবারগুলোতে “প্রজন্মগুলোর মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম ভেঙে পড়ছে”।
তার মতে, এর একটি কারণ হলো যৌথ পরিবারের পরিবর্তে নিউক্লিয়ার পরিবার বেড়ে যাওয়া। আগে দাদা-দাদি বা নানা-নানিরা সন্তান ও বাবা-মায়ের মধ্যে “স্বাভাবিক সেতু” হিসেবে কাজ করতেন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন। এখন তারা অনেক পরিবারে নেই।
দ্বিতীয় কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার।
কেতকার আল জাজিরাকে বলেন, “এক ছাদের নিচে থাকা চারজন মানুষ মূলত মোবাইলের মাধ্যমে চার ধরনের মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। প্রত্যেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন আলোচনায় আটকে আছেন, যা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকেই সমর্থন করে। ফলে তারা নিজ নিজ ‘ইকো চেম্বারে’ আটকে যাচ্ছেন এবং প্রজন্মগুলোর মধ্যে সংলাপ ভেঙে পড়ছে।”
তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে তিনি ব্যতিক্রমী মনে করেননি।
তিনি বলেন, সরকারের সমালোচনা করলেই সরকারকে সবসময় সরকার এবং পুলিশকে সবসময় পুলিশ হিসেবে দেখা হবে—এটি তিনি মেনে নেন। কিন্তু “এটি ঘটছে কারণ একটি নির্দিষ্ট সরকার ক্ষমতায় আছে”— এমন যুক্তি সমস্যাজনক।
দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মণিপাল সেন্টার ফর হিউম্যানিটিজের সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক অনুভব সেনগুপ্ত বলেন, বয়স্ক প্রজন্ম সাধারণত সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে “আরও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি” গ্রহণ করে। অন্যদিকে ছাত্র আন্দোলনগুলো প্রায়ই মূল্যবোধভিত্তিক হয়।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, নতুন এই আদর্শিক বক্তব্যগুলো শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনায় রূপ নেবে কি না এবং বয়স্ক প্রজন্ম কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া জানাবে—তা এখনো দেখার বিষয়।
সেনগুপ্ত বলেন, বিক্ষোভগুলো “ভেতর থেকেই একটি আদর্শিক সংলাপের সম্ভাবনা” তৈরি করেছে।
তার ভাষায়, অতীতে বাম বা উদারপন্থী রাজনীতিকে ডানপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে সংঘাতে দেখা গেছে। কিন্তু সেই সংঘাত সাধারণত “আমরা বনাম তারা” ধরনের ছিল।
তিনি বলেন, “কিন্তু বর্তমান বিক্ষোভে আমরা দেখছি, একই আন্দোলনের পরিসরের ভেতরেই ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানের মুখোমুখি হচ্ছে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’—অর্থাৎ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’।”
‘এই চক্র কখনো শেষ হয় না’
জন্তর মন্তরের কাছে সেই শিখ গুরুদ্বারে ফিরে এসে চৌধুরীও একই ধরনের উদ্বেগের সঙ্গে লড়ছেন।
তিনি ভাবেন, তার বাবা-মা কেন এমন একটি দলকে সমর্থন করে চলেছেন, যে দল তার মতে “মুসলমানদের সরিয়ে দেওয়ার পর বিভাজন ও শাসনের জন্য পরবর্তী কারণ খুঁজে নেবে।”
চৌধুরী বলেন, “তারপর তারা ব্রাহ্মণদের বলবে নিম্নবর্ণের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা না করতে। এরপর অন্য কিছু নিয়ে আসবে। এই চক্র কখনো শেষ হয় না।”
তিনি বলেন, এসব বিষয়ে বাবা-মাকে প্রশ্ন করলে তারা বলেন, তাদের শুধু বিজেপিকে সমর্থন করতে হবে এবং এ বিষয়ে তাদের কিছুই করার নেই।
চৌধুরীর প্রশ্ন, “এর জবাবে আপনি কী বলবেন?”
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে এক আরএসএস সদস্যের সঙ্গে তার দেখা হয়। ওই ব্যক্তি চৌধুরীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার ভিডিওতে দেখেছিলেন।
চৌধুরী বলেন, “আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আরএসএস নেতারা কেন নয়াদিল্লিতে এসে সরকারকে নিজেদের আচরণ সংশোধন করতে বলেন না? কারণ তারাই তো বিজেপি চালায়।”
জবাবে ওই ব্যক্তি তাকে বলেন, “তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি দেশপ্রেমিক হয়ে গেছ। আমরা দেশপ্রেমিক নই। আমাদের যে কাজ দেওয়া হয়েছে, আমরা সেটাই করব এবং করে যাব।”
চৌধুরী বলেন, ওই কথাই তাকে নিশ্চিত করেছে যে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
“আমি তাদের মতো করে ভাবতে পারি না। তারা গুন্ডা, আর তাদের আশপাশে থেকে আমি শান্তিতে বাঁচতে পারব না। আমার জন্য এটাই শেষ কথা।”
