এম . হাসান: হামাস গকাল শুক্রবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত একটি চুক্তির অংশ হিসেবে তারা নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রস্তুত। তবে এর জন্য ইসরায়েলকে গাজায় হামলা বন্ধ করতে হবে এবং সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুদ্ধের অবসানের পথে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও চুক্তি বাস্তবায়নে এখনো বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বাধা রয়ে গেছে।
হামাস আরও জানিয়েছে, তাদের ভারী অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি পরবর্তী ধাপে বিবেচিত হবে এবং সেটি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর নির্ভরশীল। তবে ইসরায়েলের বর্তমান সরকার এ ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
গত অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবেই নতুন এই সমঝোতা এসেছে। ওই চুক্তিতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা ছিল।
কিন্তু পরে অগ্রগতি থেমে যায়। ইসরায়েলের দাবি, হামাস নিরস্ত্র না হলে চুক্তি এগোবে না। অন্যদিকে হামাস অভিযোগ করে, গাজায় নিয়মিত হামলা চালিয়ে ইসরায়েলই যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয়
হামাসের নিরস্ত্রীকরণ হলে সেটি সংগঠনটির জন্য ঐতিহাসিক পরিবর্তন হবে। কারণ, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তাদের নীতিমালায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের কথা রয়েছে এবং রকেট, ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ তাদের অস্ত্রভাণ্ডার সংগঠনটির পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
অন্যদিকে আগামী অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে ইসরায়েলের বড় ধরনের সেনা প্রত্যাহার বা ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কঠিন পুনর্নির্বাচনী লড়াইয়ের মুখে রয়েছেন। বিরোধীরা অভিযোগ করছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছে।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউস-এর মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়াম বলেন, হামাস বাস্তবে নিরস্ত্র হবে কিংবা ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে—এমন প্রত্যাশা খুবই কম।
তিনি বলেন,
“নেতানিয়াহুর নীরবতাই অনেক কিছু বলে দেয়। এটি এমন একটি বিশাল সিদ্ধান্ত, যা তাকে নিতেই হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“নির্বাচন সামনে থাকায় এবং মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য ও বিরোধী নেতারা চুক্তির বিরোধিতা করায় নেতানিয়াহু বুঝতে পারছেন, এখন এটি বাস্তবায়ন করলে তাঁর পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানান, চুক্তিটি ‘সতর্কভাবে পরিকল্পিত কয়েকটি ধাপে’ বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি লেখেন,
“নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে সরে যাবে এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে মিলে গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে।”
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) যাচাই করা চুক্তির একটি অনুলিপিতে বলা হয়েছে, হামাস-নিয়ন্ত্রিত পুলিশের সব অস্ত্র গাজায় পৌঁছানোর পর যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা নামে পরিচিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে এটি কখন হবে, তা আগের কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন হওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি কমিটি গাজায় প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের পর ভারী অস্ত্র, সামরিক উৎপাদনকেন্দ্র ও সুড়ঙ্গ ধাপে ধাপে নিষ্ক্রিয় ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হবে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারও যুক্ত থাকবে।
বর্তমানে ইসরায়েল গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব এলাকার অধিকাংশই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং জনশূন্য। গাজার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দার বেশিরভাগই বাকি অংশে অবস্থান করছেন, যেখানে লাখ লাখ মানুষ অস্থায়ী তাঁবু শিবির ও ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বৃহস্পতিবার এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া এবং গাজাকে সামরিকমুক্ত না করা পর্যন্ত ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে না।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত আরেক ব্যক্তি জানান, ইসরায়েল আলোচনার প্রতিটি ধাপে যুক্ত থাকলেও তারা এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরকারী নয়। চুক্তির গ্যারান্টর হিসেবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, মিসর ও কাতার।
নিরস্ত্রীকরণে সময় লাগতে পারে কয়েক বছর
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের নির্দেশনা অনুযায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তা এবং ট্রাম্প গঠিত বোর্ড অব পিস-এর কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের চুক্তি সম্পর্কে আশাবাদী মূল্যায়ন দেন।
তাদের মতে, গাজার পুলিশ বাহিনী অস্ত্র জমা দিলেও এতে হামাসের অধিকাংশ যোদ্ধার অস্ত্র অন্তর্ভুক্ত নয় এবং ভারী অস্ত্রও এই ধাপে হস্তান্তর করা হবে না।
বোর্ড অব পিসের এক কর্মকর্তা জানান, ভারী অস্ত্র সমর্পণ, সুড়ঙ্গ ও সামরিক অবকাঠামো নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়ায় ২০০ থেকে ৩৫০ দিন সময় লাগতে পারে। তবে এ সময়সীমা এপির হাতে থাকা চুক্তির অনুলিপিতে উল্লেখ নেই।
হামাসের এক কর্মকর্তা এবং আলোচনায় যুক্ত এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী গাজার ভেতরেই ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটির তত্ত্বাবধানে অস্ত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণে সম্মত হয়েছে। এসব অস্ত্র ইসরায়েল বা কোনো অ-ফিলিস্তিনি পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে না।
তাদের ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে এবং তা ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের অগ্রগতির সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হবে।
ইসরায়েলের সংশয় অব্যাহত
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, হামাস অস্ত্র ত্যাগ করবে এবং গাজার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে—এ বিষয়ে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই সন্দিহান। তবে আলোচনার প্রতিটি ধাপেই ইসরায়েলের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে এবং তাদের অক্টোবরের চুক্তিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাইরে অতিরিক্ত কিছু করতে বলা হয়নি।
ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটির এক সদস্য শুক্রবার এপিকে বলেন, তারা গাজায় প্রবেশের জন্য প্রস্তুত থাকলেও ইসরায়েল বিভিন্ন বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন। তাঁর ধারণা, অন্তত দুই মাসের আগে তারা গাজায় প্রবেশ করতে পারবেন না।
কমিটি শুক্রবার অগ্রগতিকে স্বাগত জানালেও জানায়, গাজার সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনসেবা পুনর্গঠন এবং পুরো অঞ্চল পুনর্বাসনের কাজ হবে অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি।
যুদ্ধের পটভূমি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
এর জবাবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে গাজায় এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এই পরিসংখ্যানে যুদ্ধবিরতির পর নিহত ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত।
হামাস-নিয়ন্ত্রিত সরকারের অধীন পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিহতদের মধ্যে বেসামরিক ও যোদ্ধাদের আলাদা করে হিসাব প্রকাশ করে না। তবে তাদের দাবি, নিহতদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু।
