মুক্তদেশ ডেস্ক: আজকাল কোনো একনায়ককে প্রকাশ্যে বলতে শোনা খুবই বিরল যে তিনি আর নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনই মনে করেন না। বিশ্বের সবচেয়ে নির্মম স্বৈরশাসকরাও সাধারণত প্রহসনের নির্বাচন বা নানা কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের শাসনের বৈধতার একটি মুখোশ ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
কিন্তু নিকারাগুয়ায় তা নয়।
২০০৭ সাল থেকে দেশটির কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা চলতি মাসে স্বীকার করেছেন, ২০২৭ সালের নভেম্বরে নির্ধারিত নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হবে না।
১৯৭৯ সালের সানদিনিস্তা বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে ৮০ বছর বয়সী সাবেক বামপন্থী গেরিলা নেতা বলেন, “আর কোনো নির্বাচন হবে না।” তাঁর দাবি, নির্বাচন হলে বিরোধীরা সরকার ও ক্ষমতা দখল করতে পারবে।
এ বক্তব্যকে কেবল প্রতীকী স্বীকারোক্তি বলে উড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। কারণ নিকারাগুয়ায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা আগেই প্রায় শূন্যে নেমে এসেছিল। তবুও ওর্তেগার এই ঘোষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এটি তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যারা এখনো মনে করেন নিকারাগুয়ায় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সরকার আর নির্বাচন আয়োজনের ভানও না করে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কঠোর ও সমন্বিত চাপই একমাত্র উপায় হতে পারে তাদের ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করার।
নির্বাচনের বৈধতার শেষ মুখোশটুকু ফেলে দিয়ে ওর্তেগা এবং তাঁর স্ত্রী ও সহ-রাষ্ট্রপতি রোজারিও মুরিয়ো বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিলেন—তাঁরা বিশ্বের সবচেয়ে দমনমূলক একনায়কতন্ত্রগুলোর একটির শাসক। লেখকের ভাষায়, এটি উত্তর কোরিয়ার মতো একটি শাসনব্যবস্থা, যা মিয়ামি থেকে মাত্র প্রায় এক হাজার মাইল দূরে পরিচালিত হচ্ছে।
দুর্বলতারও ইঙ্গিত
উসকানিমূলক বক্তব্যের বাইরে ওর্তেগার ঘোষণাকে তাঁর দুর্বলতার স্বীকারোক্তি হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
দুই মাস পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসা ওর্তেগাকে শারীরিকভাবে দুর্বল দেখাচ্ছিল। নির্বাচন বাতিলের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করতে চাইছেন, যদি তিনি অসুস্থ বা অক্ষম হয়ে পড়েন, তাহলে তাঁর উত্তরসূরিদের অনিশ্চিত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে না হয়।
একনায়কতন্ত্রগুলো প্রায়ই ভুল হিসাব করে। সম্ভবত ওর্তেগা তাঁর মিত্র নিকোলাস মাদুরোর ২০২৪ সালের ভেনেজুয়েলার নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কিংবা ১৯৯০ সালে ভায়োলেতা চামোরোর কাছে নিজের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।
২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার পর গ্রেপ্তার, পরে নির্বাসিত এবং নাগরিকত্ব হারানো বিরোধী নেতা ফেলিক্স মারাদিয়াগা বলেন,
“ওর্তেগা জানেন, তাঁর নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় এখনো বিরোধীদের জন্য কিছু ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। তাঁর একমাত্র সম্পদ হলো বিপ্লবী কমান্ডার হিসেবে অর্জিত ঐতিহাসিক বৈধতা; অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত গণতান্ত্রিক বৈধতা নয়। আর সেই বৈধতা তিনি তাঁর স্ত্রী বা ছেলে লাউরেয়ানো ওর্তেগা মুরিয়োর কাছে হস্তান্তর করতে পারেননি।”
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর সুযোগ
ওর্তেগার এই স্পষ্ট স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য দমন-পীড়নের মূল্য আরও বাড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- নিকারাগুয়ার দ্রুত বিকাশমান স্বর্ণ খাতের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা;
- মিয়ামি ও অন্যান্য আর্থিক কেন্দ্রে থাকা নিকারাগুয়ার অবৈধ সম্পদ জব্দ করা;
- লক্ষ্যভিত্তিক শুল্ক বৃদ্ধি;
- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর উচিত নিকারাগুয়ার আইনের শাসনের অনুপস্থিতি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের আরও স্পষ্টভাবে সতর্ক করা;
- আমেরিকান রাষ্ট্রগুলোর সংস্থা (ওএএস)-এর উচিত সরকারটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবৈধ ঘোষণা করা।
জাতিসংঘের নিকারাগুয়া বিষয়ক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ইয়ান-মিখায়েল সিমন আরও কয়েকটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে মধ্য আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য সুবিধা থেকে নিকারাগুকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিকারাগুয়ার সেনাবাহিনীর বিনিয়োগ বন্ধ করা উচিত।
তিনি বলেন,
“আজ ক্ষমতা মাত্র কয়েকজন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে এই সরকার সহজেই ভেঙে পড়তে পারে, আর ওর্তেগা-মুরিয়ো দম্পতি সেটি জানেন। কিউবা বা ভেনেজুয়েলার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামো তাদের পক্ষে নেই।”
যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার অন্যত্র
সমস্যা হলো, ওয়াশিংটনের মনোযোগ এখন মূলত ভেনেজুয়েলা ও কিউবা নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে গণতন্ত্রের অবক্ষয়ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার নয়।
লাতিন আমেরিকায় তৃতীয় কোনো সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য যুক্ত করা তাদের নীতিনির্ধারণে খুব বেশি গুরুত্ব পাবে না, বিশেষ করে যদি সেটিকে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখা না হয়। সম্ভবত এটিও ওর্তেগার হিসাবের অংশ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বাধীন স্টেট ডিপার্টমেন্ট কঠোর নিন্দা জানালেও আঞ্চলিক সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান খুব বেশি সাড়া নাও পেতে পারে।
কারণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাজিলের শুল্কবিরোধ, মেক্সিকোর সঙ্গে মাদক পাচার ও ইউএসএমসিএ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিরোধ চলছে। ব্রাজিল হয়তো প্রশ্ন তুলবে—যেখানে তাদের ওপর ২৫ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেখানে নিকারাগুয়ার ওপর ২০২৭ থেকে মাত্র ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে।
এখনই চাপ বাড়ানোর সময়
তবুও লেখকের মতে, ওর্তেগার ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং দেশের ভেতরে লাগাতার দমন-পীড়নের কারণে এখনই তাঁর সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর উপযুক্ত সময়।
এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নিকোলাস মাদুরো গ্রেপ্তার হওয়া এবং বলিভিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান—এই দুই ঘটনায় ওর্তেগা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দুই মিত্রকে হারিয়েছেন।
কিউবা গভীর সংকটে রয়েছে। ব্রাজিলের সঙ্গে নিকারাগুয়ার সম্পর্ক দুই বছর ধরে স্থবির। সম্প্রতি ইতালির সঙ্গে সম্পর্কও ছিন্ন করেছে মানাগুয়া, কারণ তারা ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলদো মোরো হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত সাবেক রেড ব্রিগেডস গেরিলাকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বর্তমানে ওর্তেগার পাশে রয়েছে মূলত চীন এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাশিয়া, যার দেশটিতে একটি সামরিক স্থাপনা রয়েছে।
লেখকের মতে, নিকারাগুয়ায় পরিবর্তন আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেওয়া উচিত মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও অভিবাসন সংকটের আশঙ্কায় তারা এত দিন সরকারটির প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় ছিল।
আঞ্চলিক দেশগুলো যদি নেতৃত্ব দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম গোলার্ধের অন্যান্য দেশও একটি সমন্বিত পদক্ষেপে যুক্ত হতে পারবে।
