মুক্তদেশ ডেস্ক: বিশ্বকাপ শুরুর আগের দিন উপস্থিত সাংবাদিকদের নিউজার্সির স্টেডিয়াম ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন ফিফার কর্মকর্তারা। সেদিন ড্রেসিংরুম, ডাগআউট থেকে শুরু করে সবুজ গালিচার মতো মাঠ দেখে কল্পনাও করা কঠিন ছিল—এই মাঠেই ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ও লামিন ইয়ামালের স্পেন।
তান্ত্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী কিংবা সুপার কম্পিউটারের হিসাব মিলুক বা না মিলুক, একটি বিষয় নিশ্চিত—বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত লড়াইয়ে আজ নিউজার্সির আকাশ আলোকিত হবে দুই পরাশক্তির দ্বৈরথে। প্রশ্ন একটাই—মেসিদের হাত ধরে আবারও কি লাতিন আমেরিকার জয়গান শোনা যাবে, নাকি ইউরোপীয় ফুটবলের আধুনিকতম দর্শনের প্রতীক স্পেনই ঘরে তুলবে শিরোপা?
স্মৃতির মাঠে মেসির প্রত্যাবর্তন
এই স্টেডিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোর একটি। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামের নামের আগে পৃষ্ঠপোষকের নাম ব্যবহার করা না হলেও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি পরিচিত মেটলাইফ স্টেডিয়াম হিসেবেই।
২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনালে এই মাঠেই চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি নিজেও। ম্যাচ শেষে বেঞ্চে বসে তাঁর অঝোর কান্নার দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে আছে। সেই ম্যাচের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।
দশ বছর পর মেসি ফিরছেন একই মাঠে। তবে এবার বিদায়ের জন্য নয়; অপূর্ণ একটি স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। স্কালোনির দল পুরো টুর্নামেন্টে কঠিন সব বাধা অতিক্রম করে আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় রয়েছে। কিন্তু যে মাঠ একদিন তাঁর চোখের জল দেখেছিল, সেই মাঠেই মানসিক দৃঢ়তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হবে আর্জেন্টিনা অধিনায়ককে।
লড়াই করে ফাইনালে আর্জেন্টিনা
গ্রুপপর্ব সহজেই পার করলেও নকআউটে প্রতিটি ম্যাচেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আর্জেন্টিনা।
শেষ ৩২-এ কেপ ভার্দে, শেষ ষোলোয় মিসর, কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ড এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড—প্রতিটি ম্যাচেই পিছিয়ে পড়া বা চাপে পড়ার পর অসাধারণ প্রত্যাবর্তন করেছে স্কালোনির দল।
এই যাত্রাপথে মেসি ছিলেন স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রবিন্দু। তবে দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা। টুর্নামেন্টে তাদের ১৯ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে ৭৫ মিনিটের পর।
ছন্দে ফিরেই ভয়ংকর স্পেন
স্পেনের শুরুটা হয়েছিল কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে। তবে এরপর ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দে ফিরে আসে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
শেষ ৩২-এ অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেয় স্পেন। শেষ ষোলোয় পর্তুগালের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে ৯১তম মিনিটে জয়সূচক গোল করেন মিকেল মেরিনো। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও জয়ের নায়ক ছিলেন তিনি। সেমিফাইনালে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে স্পেন।
কৌশলের লড়াই
স্পেনের মূল শক্তি বল দখলে আধিপত্য, দ্রুত পাসের সমন্বয় এবং বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণাত্মক প্রেসিং। পাউ কুবারসি, এমেরিক লাপোর্তে ও রদ্রির নেতৃত্বে প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখার কৌশলই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সামনে লামিন ইয়ামালের সৃজনশীলতা আক্রমণে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার শক্তি মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে তোলা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা। আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু মেসি হলেও হুলিয়ান আলভারেজের নিরলস পরিশ্রম, এনসো ফার্নান্দেজের কার্যকর উপস্থিতি এবং গোলবারের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের আত্মবিশ্বাস দলটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
ইতিহাস কী বলছে?
ফুটবলে এখন পর্যন্ত ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। জয় সমান ৬টি করে, ড্র হয়েছে দুটি ম্যাচ। বিশ্বকাপে একমাত্র দেখায় ১৯৬৬ সালে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
এবারের ফাইনালের দুই দলের ৫২ সদস্যের স্কোয়াডের মধ্যে ২৪ জনই খেলেন স্প্যানিশ ক্লাব ফুটবলে। ফলে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে দুই দলেরই ধারণা স্পষ্ট। দুই প্রধান কোচের ব্যক্তিগত সম্পর্কও বেশ ভালো। কিন্তু আজ বন্ধুত্বের জায়গা নেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
একদিকে আর্জেন্টিনার লক্ষ্য জার্সিতে চতুর্থ তারকা যোগ করা, অন্যদিকে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপ জিতে দ্বিতীয় তারকা বসানোর স্বপ্ন স্পেনের। দুই পরাশক্তির এই মহারণে শেষ হাসি কার—তার উত্তর মিলবে নিউজার্সির রাতেই।
