এম. হাসান : প্রতিটি ফুটবল ম্যাচ শুরু হয় কিক-অফের অনেক আগেই। খেলা শুরুর আগে পাব, রাস্তা ও স্টেডিয়াম ভরে ওঠে সমর্থকদের গান ও স্লোগানে, যা পুরো পরিবেশকে উৎসবে পরিণত করে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি পরিচয়, আবেগ এবং সম্প্রদায়বোধের অংশ।
প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মানুষ ফুটবল দেখে। তারা স্টেডিয়াম ভরিয়ে তোলে, ক্লাবের পণ্য কেনে এবং সম্প্রচার দেখে বিশাল অর্থনৈতিক বাজার তৈরি করে। তবে ফুটবল ভক্তির প্রকৃত মূল্য অর্থনৈতিক নয়; বরং এর সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং সমষ্টিগত আবেগে। জয় কিংবা পরাজয়—দর্শকদের গর্জন ছাড়া ফুটবল কল্পনা করা যায় না।
সামাজিক পরিসর হিসেবে স্টেডিয়াম
আধুনিক ফুটবলের জন্ম ১৯শ শতকের ইংল্যান্ডে, শিল্পবিপ্লবের সময়। প্রথমে এটি ইটন কলেজের মতো অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলা হতো, পরে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
অনেক ক্লাবের উৎপত্তি শ্রমিক সংগঠন থেকে। উদাহরণ হিসেবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (তৎকালীন নিউটন হিথ এলওয়াইআর) ১৮৭৮ সালে ল্যাঙ্কাশায়ার ও ইয়র্কশায়ার রেলওয়ের শ্রমিকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময়ের দর্শকরা ছিলেন খনি শ্রমিক, বন্দরকর্মী এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ।
ম্যাচ দেখা ধীরে ধীরে সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়। ফুটবল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও গড়ে ওঠে। ক্লাব বা দেশের রং, জার্সি, ব্যাজ, পতাকা ও ব্যানার ব্যবহার করে সমর্থকেরা তাদের আনুগত্য প্রকাশ করে।
ফুটবলের গান ও স্লোগানের শক্তি
বিশ্বজুড়ে শোনা এক রক গান
দ্য হোয়াইট স্ট্রাইপসের ২০০৩ সালের গান “Seven Nation Army”-এর বিখ্যাত বাদ্যযন্ত্র অংশটি প্রথম ফুটবল সমর্থকেরা গেয়েছিল বলে ধারণা করা হয় ২০০৩ সালের একটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচে। পরে এটি ইতালির বিভিন্ন ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয় এবং ২০০৬ বিশ্বকাপে ইতালির অনানুষ্ঠানিক সংগীতে পরিণত হয়।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলোয়াড়েরা এই সুরের সঙ্গে মাঠে প্রবেশ করায় এটি সর্বজনীন ফুটবল সংগীতের মর্যাদা পায়।
ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে ছন্দ, সমন্বয় ও আবেগ সংগীতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সমর্থকেরা গান ও স্লোগানের মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশ করে।
- লিভারপুল এফসি-র সংগীত: You’ll Never Walk Alone
- ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-এর জনপ্রিয় গান: Take Me Home, United Road
- লিওনেল মেসি-র জন্য বিখ্যাত স্লোগান: “Messi! Messi! Messi!”
- আর্জেন্টিনা সমর্থকদের স্লোগান: “Vamos, vamos, Argentina”
এছাড়া Yellow Submarine, Go West এবং Guantanamera-এর মতো জনপ্রিয় গানও ফুটবল সংগীতে নতুন পরিচয় পেয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল স্লোগানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- “Olé, Olé, Olé”
- “Seven Nation Army”
এসব স্লোগান ফুটবলের বাইরেও বাস্কেটবল ও বেসবলের মতো খেলায় ব্যবহৃত হয়।
মেক্সিকান ওয়েভ
ফুটবল ভক্তদের অন্যতম জনপ্রিয় শারীরিক অভিব্যক্তি হলো মেক্সিকান ওয়েভ। এতে দর্শকেরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করেন, ফলে পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে ঢেউয়ের মতো দৃশ্য তৈরি হয়।
ধারণা করা হয়, এর উৎপত্তি উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন ক্রীড়া আসরে হলেও ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে এটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়।
ক্যাজুয়ালস ও আল্ট্রাস
ফুটবল ভক্তদের আবেগ ও বন্ধুত্ব থেকে নানা উপসংস্কৃতির জন্ম হয়েছে।
ক্যাজুয়ালস
ইংল্যান্ডে ফুটবলপ্রেমীদের ঘিরে গড়ে ওঠা “টেরেস কালচার” থেকে পরে তরুণ সমর্থকদের একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়, যারা দামী ডিজাইনার পোশাক পরত। তারা পরিচিত ছিল ক্যাজুয়ালস নামে।
আল্ট্রাস
১৯৬০-এর দশকে ইতালিতে জন্ম নেওয়া আল্ট্রাস সংস্কৃতি অত্যন্ত সংগঠিত, আবেগপ্রবণ এবং অনেক সময় আক্রমণাত্মক। নাম থেকেই তাদের তীব্র সমর্থনের ধারণা পাওয়া যায়।
ভক্তির অন্ধকার দিক
ফুটবলে সমর্থকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনও কখনও সহিংসতায় রূপ নেয়। এই সহিংসতাকে বলা হয় হুলিগানিজম।
১৯৬০-এর দশক থেকে এটি বিশেষভাবে ব্রিটিশ ফুটবলে দেখা যায়। অনেক ম্যাচ বাতিল হয়েছে মাঠে দর্শক প্রবেশ, আতশবাজি নিক্ষেপ বা সহিংস সংঘর্ষের কারণে।
২০২১ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থকেরা ক্লাব মালিকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচ বন্ধ করে দিতে বাধ্য করে।
বিশ্বকাপে সহিংসতার উদাহরণ
১৯৯৮, ফ্রান্স
ইংল্যান্ড ও তিউনিসিয়ার ম্যাচকে কেন্দ্র করে মার্সেইয়ে সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত ৩২ জন আহত হন।
২০১৪, ব্রাজিল
বিশ্বকাপ আয়োজনের বিপুল সরকারি ব্যয়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। রিও ডি জেনেইরো ও সাও পাওলোসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে।
হেইসেল ও হিলসবোরো ট্র্যাজেডি
হেইসেল স্টেডিয়াম বিপর্যয় (১৯৮৫)
লিভারপুল ও জুভেন্টাসের ম্যাচের আগে সমর্থকদের সংঘর্ষে স্টেডিয়ামে ভিড়ের চাপে ৩৯ জন নিহত এবং প্রায় ৬০০ জন আহত হন।
হিলসবোরো বিপর্যয় (১৯৮৯)
লিভারপুল ও নটিংহাম ফরেস্টের ম্যাচে দর্শকচাপের কারণে ৯৭ জন নিহত হন। প্রথমে মাতাল সমর্থকদের দায়ী করা হলেও পরে তদন্তে পুলিশের ভুল ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এই ঘটনাগুলোর পর ফুটবলে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়:
- দাঁড়িয়ে খেলার টেরেসের বদলে আসন ব্যবস্থা
- মদ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা
- নিরাপত্তা কর্মী বৃদ্ধি
- প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের আলাদা বসানো
২০০০ সালের পর থেকে ব্রিটেনে হুলিগানিজমে দোষী সাব্যস্ত সমর্থকদের বিদেশে গিয়ে ম্যাচ দেখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
লাতিন আমেরিকার অনেক স্টেডিয়ামে উচ্চ বেড়া ও পরিখার মতো অ্যান্টি-হুলিগান স্থাপত্যও নির্মাণ করা হয়েছে।
