মুক্তদেশ ডেস্ক: ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বাধা দেওয়ায় তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি। সীমান্তের কয়েকটি এলাকায় এখনও অনেকে শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ সোমবার শুরু হচ্ছে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী সম্মেলন, যা চলবে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। বৈঠকে পুশইন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি তুলবে বাংলাদেশ।
গতকাল রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিশেষ করে অবৈধ পুশইনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হবে।
তিনি বলেন, “সীমান্তসংক্রান্ত সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হবে। আমরা কূটনৈতিক চ্যানেলে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। সরকার সব ধরনের অবৈধ পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। তবে এসব সমস্যার সমাধান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ অব্যাহত রয়েছে এবং আসন্ন বৈঠকেও এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
বৈঠকের আলোচ্য বিষয়
বিজিবি সূত্র জানায়, সম্মেলনে বিএসএফ, ভারতীয় নাগরিক বা দুষ্কৃতকারীদের হাতে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং পুশইন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
এ ছাড়া অবৈধ অনুপ্রবেশ, ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদক, অস্ত্র ও নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান রোধ, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়াসহ অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধের বিষয়েও আলোচনা হবে।
আলোচ্যসূচিতে আরও রয়েছে চলমান সীমান্ত উন্নয়ন প্রকল্পের নিষ্পত্তি, তিন বিঘা করিডোর হয়ে পাটগ্রাম থেকে দহগ্রাম পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার কেবল স্থাপন, আগরতলা-আখাউড়া সংযোগকারী চারটি খালের বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা, মুহুরীর চর এলাকায় স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণ এবং আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর তীর সংরক্ষণ কার্যক্রম।
এ ছাড়া আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান ও তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, আকাশসীমা লঙ্ঘন করে অবৈধ ড্রোন বা হেলিকপ্টার উড্ডয়ন বন্ধের বিষয়ও আলোচনায় থাকবে।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে নেতিবাচক অপপ্রচার বন্ধ এবং উভয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
নারী-শিশুদের পুশইনের অভিযোগ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর) অভিযোগ করেছে, বিএসএফ বাংলাদেশি সন্দেহে বহু মানুষকে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের, সীমান্তে এনে জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে আগামী ১১ জুন মালদা শহরে মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।
এপিডিআরের সহসভাপতি রঞ্জিত শূর জানান, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঘোষিত ‘ডিটেক্ট, ডিপোর্ট, ডিলিট’ নীতির ফলেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, বহু মানুষ বর্তমানে দুই দেশের মধ্যবর্তী নোম্যান্স ল্যান্ডে আটকা পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এপিডিআর জানায়, বিএসএফ বিভিন্ন জেলা থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বন্দুকের মুখে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে বিজিবি তাদের প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। ফলে নারী, শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অনেকেই খাবার, পানি ও আশ্রয় ছাড়া শূন্যরেখায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংগঠনটি আরও অভিযোগ করে, বিএসএফ তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করছে এই বলে যে তারা বাংলাদেশি নাগরিক; অন্যদিকে বিজিবির দাবি, তাদের বাংলাদেশি হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই এবং তারা ভারতীয় নাগরিকও হতে পারেন। ফলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যবর্তী এলাকায় এসব মানুষ অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন।
এপিডিআর বলেছে, ভারতের ‘ডিটেক্ট, ডিপোর্ট, ডিলিট’ নীতি অসাংবিধানিক, বেআইনি ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। এই নীতিই বর্তমান সংকটের মূল কারণ।
রঞ্জিত শূর বলেন, “জিরো পয়েন্টে আটকে থাকা মানুষদের অবিলম্বে ফিরিয়ে নিতে হবে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসদৃশ এই পুশব্যাক নীতি ভারত সরকারকে বাতিল করতে হবে।” তিনি এ বিষয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের (ইউএনএইচআরসি) হস্তক্ষেপও কামনা করেন।
জাতিসংঘ ও আইওএমের হস্তক্ষেপের আহ্বান
পঞ্চগড় সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুসহ ১০ জনকে ৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আটকে রাখার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম।
গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
তিনি বলেন, “ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি অবৈধ পুশইনের এই অমানবিক প্রবণতা বন্ধের জোর আহ্বান জানাই। একই সঙ্গে পরিচয় ও দায় নির্ধারণের প্রশ্ন নিষ্পত্তির আগেই এসব মানুষের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি আশ্রয় ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।”
