মুক্তদেশ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের এক মাসও না পেরোতেই তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ধরনের ভাঙনের দাবি উঠেছে। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে অন্তত ৫৮ জন নিজেদের পৃথক বিধানসভা দল হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই সংখ্যা দলত্যাগবিরোধী আইনে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশের সীমা অতিক্রম করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার বিদ্রোহী বিধায়কেরা বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে চিঠি দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান। চিঠিতে তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের চেয়ারপারসন হিসেবে স্বীকার করলেও তাঁকে ‘প্রধান পরামর্শদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
পরে স্পিকার রথীন্দ্র বসু বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর পর বিধানসভা সচিবালয় বিরোধী দলনেতার কক্ষের দায়িত্ব নতুন গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেয়। এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ওই কক্ষের দায়িত্ব পাননি।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে সামনে আসেন ৪৭ বছর বয়সী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময় তিনি সিপিএমের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। কয়েক দিন আগে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া ঋতব্রত এবার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন।
বিধানসভায় সংবাদ সম্মেলনে ঋতব্রত বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে থাকুন। তিনি আমাদের নেত্রী হিসেবেই থাকবেন।”
সংবাদ সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে ছিলেন জাভেদ আহমেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, শিউলি সাহা ও সন্দীপন সাহা। তাঁদের বিরোধী দলীয় উপনেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আখরুজ্জামানকে প্রধান হুইপ করা হয়।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে ঋতব্রত বলেন, “এই অষ্টাদশ বিধানসভার সঙ্গে তাঁর দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।”
দলীয় সূত্রের দাবি, গত সপ্তাহান্ত থেকেই বিদ্রোহের প্রস্তুতি চলছিল। অভিযোগ রয়েছে, দিল্লি ও কলকাতার প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের কিছু অংশ এ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেছে। এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে ঋতব্রতের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া ঘিরে। তৃণমূলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারের কাছে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব জমা দেন। তবে ঋতব্রত ও সন্দীপন ওই নথিতে বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ তোলেন।
এর পর হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর দায়ের করা হয় এবং সিআইডি তদন্ত শুরু করে। এর মধ্যেই তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হয়।
স্পিকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্নও উঠেছে। লোকসভার সাবেক মহাসচিব পি. ডি. টি. আচার্য এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, “কোন গোষ্ঠী প্রকৃত দলকে প্রতিনিধিত্ব করছে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা স্পিকারের নয়; এটি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ছাড়া স্পিকারের এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা ঠিক হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “বিধানসভা দল মূল রাজনৈতিক দলের একটি শাখা মাত্র। মূল দলের প্রধান হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনগত কর্তৃত্ব রয়েছে। দলের একাংশের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি আপত্তি জানালে স্পিকারকে তা বিবেচনায় নিতে হবে।”
এদিকে বুধবার ঋতব্রত যখন বিধানসভায় সংবাদ সম্মেলন করছিলেন, তখন কালীঘাটের বাসভবনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ ও চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কমিটি ভেঙে দেন।
পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় এসে স্পিকার রথীন্দ্র বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নবান্নে প্রশাসনিক বৈঠক শেষে তিনি সেখানে পৌঁছান। এর কিছুক্ষণ পরই বিরোধী দলনেতার কক্ষের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ঋতব্রত বলেন, “আমরা দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব। বাংলার মানুষ আমাদের বিরোধী বেঞ্চে বসিয়েছে, আমরা তা মেনে নিয়েছি। আমি কোনো ‘বস’ নই। সরকারের ভুলের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকব, তবে ভালো কাজকে সমর্থনও করব।”
তৃণমূলের এই ভাঙন এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে স্পিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে দলত্যাগবিরোধী আইন, স্পিকারের ক্ষমতা এবং প্রকৃত রাজনৈতিক দল নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
