মুক্তদেশ ডেস্ক: বাইরে থেকে ছিমছাম ও পরিপাটি পাঁচতলা ভবন। কিন্তু চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটের ভেতরের দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিটি ঘর আবর্জনায় ভর্তি, যেন একটি ভাগাড়। সেই পরিবেশেই একটি খাটে পড়ে ছিল ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মরদেহ। কয়েক দিন আগে মৃত্যু হওয়ায় মরদেহ পচে গিয়েছিল, বিছানাজুড়ে ছিল পোকামাকড়। গত রোববার রাতে রাজধানীর মিরপুরের ওই ফ্ল্যাট থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নূরজাহান বেগমের চার সন্তানই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। তিন ছেলের একজন মোংলা বন্দরের যুগ্ম সচিব, একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং আরেকজন কানাডাপ্রবাসী। একমাত্র মেয়ে মিরপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক। অথচ এমন সন্তানদের মা জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছেন অবহেলা ও নিঃসঙ্গতায়। মৃত্যুর পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি তাদের নজরে আসেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেয়ের দাবি, তিনি মায়ের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। কিন্তু প্রতিবেশীদের প্রশ্ন, একই বাসায় থেকেও কীভাবে তিনি মায়ের খোঁজ রাখলেন না এবং তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি বুঝতে এত সময় লাগল?
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা কীভাবে এমন দায়িত্বহীন হতে পারেন।
মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকের ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে তালা ঝুলছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নূরজাহানের মেয়ে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর ওই ফ্ল্যাটে একা থাকতেন। মায়ের দেখাশোনার জন্য প্রায় এক বছর আগে তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন।
পাশের ভবনের বাসিন্দা সেলিনা ইসলাম বলেন, বহু বছর এলাকায় থাকলেও ওই নারীর সঙ্গে কখনো ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়নি। তিনি কারও সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না। একই ফ্ল্যাটে থেকেও মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি বুঝতে না পারা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আরেক প্রতিবেশী তৌফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, পরে জেনেছেন মৃত নারীর চার সন্তানই প্রতিষ্ঠিত। তাঁর ভাষায়, “যে মা সন্তানদের বড় করতে নিজেকে নিঃশেষ করে দেন, তাঁর এমন পরিণতি মেনে নেওয়া কঠিন।”
যেভাবে উদ্ধার হলো মরদেহ
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় সাংবাদিক মারুফ হায়দার জানান, রোববার রাতে নূরজাহানের মেয়ে মায়ের অসুস্থতার কথা বলে একজন নার্সকে বাসায় নিয়ে যান। পরীক্ষা করে নার্স বুঝতে পারেন, কয়েক দিন আগেই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। তখন মরদেহে পচন ধরেছে।
পরে নার্স জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে বিষয়টি জানান। এর মধ্যেই পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। গোসল করানোর জন্য ডাকা হয় স্থানীয় এক নারীকে। তিনি গিয়ে মরদেহের অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যান।
মারুফ হায়দারের ভাষ্য, ফ্ল্যাটের ভেতরে মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ ছিল না। মেঝে, আসবাবপত্র, এমনকি খাটও ছিল আবর্জনায় ভরা। তাঁর দাবি, মেয়ে সেখানে থাকতেন বলে দাবি করলেও ফ্ল্যাটে নিয়মিত বসবাসের তেমন কোনো আলামত দেখা যায়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মরদেহের ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার কথা বললে নূরজাহানের মেয়ে ও বুয়েটে কর্মরত ছেলে আপত্তি জানান। পরে বিষয়টি নিয়ে পল্লবী থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
স্বজনদের ব্যাখ্যা মেলেনি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে গিয়ে নূরজাহানের সন্তানদের কাউকে পাওয়া যায়নি। মেয়ের কর্মস্থলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি কোনো মন্তব্য না করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
অন্যদিকে, মোংলা বন্দরে কর্মরত বড় ছেলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। বুয়েট শিক্ষক ও প্রবাসী ছেলের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের বক্তব্য
পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির বলেন, ঘটনাটি অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ চাঁদপুরের মতলবে দাফন করা হয়েছে।
তিনি জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। কারও অবহেলা বা দায় প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওসি আরও বলেন, দেশে থাকা দুই ছেলে দাবি করেছেন, তারা নিয়মিত মায়ের খোঁজ রাখতেন। মেয়ের দাবি, তিনিও একই ফ্ল্যাটে থেকে মায়ের দেখাশোনা করতেন। তবে নিয়মিত খোঁজ রাখা হলে মরদেহের এমন অবস্থা হওয়ার কথা নয়। ফ্ল্যাটের পরিবেশ দেখে মেয়ের মানসিক অবস্থার বিষয়েও কিছু প্রশ্ন উঠেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
